-2.1 C
Toronto
রবিবার, ফেব্রুয়ারী ৫, ২০২৩

টেসলা ভ্রমণ !!!

টেসলা ভ্রমণ !!!
ফাইল ছবি

ছেলেটাকে বললাম, কি রে টেসলায় উঠলি?
সে শুধু মিষ্টি হাসলো।
বল তো অটো একবার চার্জ করলে কত কিলো যায়?
– জানি না
– দেড়শো!

আমরা ভেড়ামারা থেকে অটোতে করে কুষ্টিয়া যেতে থাকি। মানে ওর নানি বাড়ি থেকে দাদি বাড়ি। মেইন রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ বিধায় অটো কিংবা বিকল্প পন্থায় লোকাল রাস্তায় আসা যাওয়া করি।

- Advertisement -

সাপের মতো এঁকে-বেঁকে চলতে থাকি। আশপাশের প্রায় প্রতিটা বাড়িতেই গরু কিংবা ছাগল পালা হয়। গোবরের কাঠি শুকাতে দেওয়া। আবার রসিকতা করে বললাম, দেখ কত কাবাব! এগুলা দিয়ে কী করে জানিস?
– কী করে?
– আগুন জ্বালায়ে রান্না করে। দারুন আগুন জ্বলে। বল তো কেন ভাল জ্বলে?
– কাউ ডাং এ মিথেন আছে তাই?
– ইয়েস!

বিস্তীর্ণ মাঠের মধ্যে সরু রাস্তা দিয়ে এগুতে থাকি। চারিদিকে হলুদ চোখ জুড়ানো সর্ষে ক্ষেত। খেজুর গাছে মাটির হাঁড়ি ঝুলানো। এসবের মধ্যে দিয়েই আমি বড় হয়েছি। বিকাল বেলায় গ্রামে সুন্দর গন্ধ ছোটে। পাটখড়ি পোড়ানো, গোবর জ্বালানি, ভাত রান্না, ধান শুকানো, গোয়াল ঘরের চোনা, খড়ের গাদা, কিম্বা মাঠে আগুন দিয়ে খড় পোড়ানোর গন্ধ..। সব আমাদের রক্তে মেশানো। পৃথিবীর যেখানেই যাই না কেন, সেগুলো ঠিকই আমাকে নক করে বলবে- ওহে বৎস, মনে রেখো তুমি বাঙালি। তুমি যেরকম, সেভাবেই চলার চেষ্টা করো; নিজেকে বুঝ দিয়ে ঠকিয়ো না!
.
সূর্য ডুবু ডুবু।
ছেলেটা মাথার হূডি টেনে দিলো। বেশ ঠান্ডা বাতাস আসছে। হঠাৎ নিরবতা ভেঙে বলে উঠলো, আব্বু!
– বল
– নেক্সবার কিন্তু তাড়াতাড়ি আসবা
– ওকে বাবা
– দেখো তো কত ভালো লাগে আসলে? দাদি-নানী, কাজিন, মামা-চাচা; সবাই এখানে। তুমি দাদিকে কানাডায় নিচ্ছ না কেন?
– নিবো বাবু।

এখন আমাদের ফিরবার পালা।
আমরা দুজন ঠিক একই চিন্তা করছিলাম। আমার মেয়েটা প্রথম প্রথম অটোয়া ফেরার জন্য পাগল হলেও ইদানিং তার মাঝেও ব্যাপক পরিবর্তন। এর প্রধান কারণ মানুষের ভালোবাসা, সম্পর্কের টান। এদেশের মানুষ ভালোবাসতে জানে। এদেশের রক্তের সম্পর্কে এখনো ফুল ফুটে, এখনো আশ্রয় পাওয়া যায়, সুখ দুঃখের ভাগিদার হওয়া যায়।

সূর্যটা টুপ্ করে ডুবে গেলো।
দিন যত ঘনিয়ে আসছে, আমাদের মন খারাপ তত বেড়ে যাচ্ছে। আর মাত্র ক’টা দিন, তারপর আবার উড়াল দিয়ে চলে যাবো আমাদের ছোট্ট বাড়িটায়। যেখানে থাকবে না মায়ের আনাগোনা, ভাই বোনের চলাফেরা, পরিচিত সহজ সরল মানুষের কথাবার্তা, বাজার, ব্যস্ততা। সেখানে শুধু আমরা চার জনের সময় কাটানো। আমরা কখনো বাংলাদেশকে ভুলে থাকতে পারি না। একটা মুহূর্তের জন্যও না।

কি অপূর্ব পারিবারিক বন্ধন এদেশে।
সুখ দুঃখ, হাসি কান্না সবকিছুর মেলাবন্ধন। অটুট থাকে আমাদের ভালোবাসা। প্রতিবার আবার আসার মধ্যে বেশ কিছু পরিচিত মুখ হারিয়ে যায়। এবারও তাই ঘটবে। অবসম্ভাবী কিছু নিয়তি; যেগুলো থেকে কারও নিস্তার নেই। সবার জন্য প্রযোজ্য।
বিদায়ের যন্ত্রনা শুধু বেড়েই চলে।
বাড়তে থাকে মায়ের অস্থিরতা।
.
.
আব্বু দেখো কত সুন্দর!- বলে বিত্ত সূর্যাস্তের পর আকাশের বাকি ছিটেফোটা লালচে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে।
– তাইতো!
– আব্বু
– বাবা?
– নাথিং… নেভার মাইন্ড..
.
সে কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। কারন সে জানে ওটা আমার সাধ্যের বাইরে।
আমরা আবারও চুপ মেরে যাই।
আমরা দুজনেই জানি কী ভাবছি।
অন্ধকার নেমে গেছে।
সময় খুব নিষ্ঠুর।
আর হাতে গোনা মাত্র ক’টা দিন..

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles