পদ্ধতিগত বর্ণবাদের সাক্ষী অর্ধেক কানাডিয়ান

পদ্ধতিগত বর্ণবাদের সাক্ষী অর্ধেক কানাডিয়ান - the Bengali Times
কানাডার সামাজিক কাঠামোতে বর্ণবাদের ছায়া যে এখনো গভীরভাবে প্রোথিত তার এক স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে নতুন এক জনমত সমীক্ষায়

কানাডার সামাজিক কাঠামোতে বর্ণবাদের ছায়া যে এখনো গভীরভাবে প্রোথিত, তার এক স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে নতুন এক জনমত সমীক্ষায়। অ্যাসোসিয়েশন ফর কানাডিয়ান স্টাডিজ (ACS)-এর জন্য পরিচালিত লেজার পোলের সাম্প্রতিক ফলাফল অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক কানাডিয়ান (৪৯ শতাংশ) বলেছেন যে তারা নিজ নিজ প্রদেশে পদ্ধতিগত বর্ণবাদের প্রমাণ প্রত্যক্ষ করেছেন।

সমীক্ষাটি ২০২৫ সালের ২৯ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনে পরিচালিত হয় এবং এতে ১,৬২৭ জন কানাডিয়ান অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অনেকেই জানিয়েছেন, বর্ণবাদ কেবল ব্যক্তিগত আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি কানাডার সরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক কাঠামো ও আইনি ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত।

- Advertisement -

সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৭ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা নিজেদের প্রদেশে কোনো ধরনের বর্ণবাদের উদাহরণ দেখেননি। অপরদিকে ১৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বিষয়টি সম্পর্কে অনিশ্চিত বা মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

অ্যাসোসিয়েশন ফর কানাডিয়ান স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জ্যাক জেডওয়াব বলেন, “ফলাফলটি আমার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। আমি জানতাম কানাডিয়ানরা বর্ণবাদের বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন, তবে এত মানুষ পদ্ধতিগত বর্ণবাদের উপস্থিতি স্বীকার করবেন তা ভাবিনি।” গবেষণায় একটি স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে নারী ও তরুণরা পুরুষদের তুলনায় বেশি বর্ণবাদ প্রত্যক্ষ করছেন। ৫৬ শতাংশ নারী জানিয়েছেন যে তারা পদ্ধতিগত বর্ণবাদের প্রমাণ দেখেছেন। অন্যদিকে পুরুষদের মধ্যে এ হার মাত্র ৪২ শতাংশ।

১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৫৭ শতাংশ বলেছেন তারা বর্ণবাদ প্রত্যক্ষ করেছেন। ৩৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এ হার ৫০ শতাংশ। আর ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে এ সংখ্যা নেমে এসেছে ৪৪ শতাংশে।

বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ প্রজন্ম সামাজিক মাধ্যম, কর্মক্ষেত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বৈচিত্র্যের চর্চা বেশি করায় তারা বর্ণবাদের সূক্ষ্ম রূপগুলো সহজে ধরতে পারেন।

সমীক্ষায় প্রদেশভেদেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। কুইবেকের ৫৩ শতাংশ বাসিন্দা বলেছেন, তাদের প্রদেশে বর্ণবাদ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিদ্যমান। অন্টারিওর বাসিন্দাদের মধ্যেও প্রায় একই হার (৫২ শতাংশ)। অন্যদিকে আলবার্টায় ৪১ শতাংশ ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় ৪২ শতাংশ বাসিন্দা এ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এ থেকে বোঝা যায়, কানাডার পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে বর্ণবাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হচ্ছে।

সমীক্ষায় সবচেয়ে গভীর বৈষম্য দেখা গেছে জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে। কৃষ্ণাঙ্গ কানাডিয়ানদের মধ্যে ৭৩ শতাংশ বলেছেন তারা পদ্ধতিগত বর্ণবাদ প্রত্যক্ষ করেছেন। অশ্বেতাঙ্গ অন্যান্য গোষ্ঠী (যেমন দক্ষিণ এশীয়, চীনা, মধ্যপ্রাচ্যের বংশোদ্ভূত)দের মধ্যে এ হার ৪৯ শতাংশ। বিপরীতে, শ্বেতাঙ্গ কানাডিয়ানদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ এ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এ তথ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডার সমাজে ‘অদৃশ্য প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য’ এখনো গভীরভাবে বিদ্যমান যা অনেক সময় শ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের চোখে ধরা পড়ে না।

কানাডার বাইরে জন্মগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫২ শতাংশ বলেছেন তারা পদ্ধতিগত বর্ণবাদের প্রমাণ দেখেছেন। অন্যদিকে দেশে জন্ম নেওয়া কানাডিয়ানদের মধ্যে এ হার কিছুটা কম, ৪৯ শতাংশ।

এটি ইঙ্গিত দেয় যে, নতুন অভিবাসীরা সমাজে প্রবেশের পর সাংস্কৃতিক ও পেশাগত ক্ষেত্রে বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা তাদের কাছে বর্ণবাদের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

কানাডা দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে বহুসাংস্কৃতিক ও সমতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক এই সমীক্ষা সেই ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, “পদ্ধতিগত বর্ণবাদ” কেবল প্রকাশ্য ঘৃণার আচরণ নয় বরং এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও বিচার ব্যবস্থায় এমনভাবে গেঁথে আছে, যা অনেক সময় অদৃশ্য রূপে বৈষম্য সৃষ্টি করে। সমীক্ষাটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে, কানাডা এখনও বৈষম্য ও সমতার মধ্যে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের পথে রয়েছে।

লেজার পোলের এই ফলাফল কানাডিয়ান সমাজের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে সমতার দেশ হিসেবে পরিচিত কানাডা কি সত্যিই সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পেরেছে? উত্তর খুঁজতে হলে, হয়তো আরও গভীরে তাকাতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই অদৃশ্য বর্ণবাদের দিকে, যা আজও অনেকের জীবনে নিত্য বাস্তবতা হয়ে আছে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles