
গত ৬ই অক্টোবর ছিলো বাংলাদেশের আধুনিক ফটোগ্রাফীর জনক আনোয়ার হোসেনের শুভ জন্মদিন। টরন্টোতে বসে আমার কেন যেন মনে হচ্ছিলো যদি আনোয়র ভাই আর ডলি ভাবী আজ থাকতেন আমিও ঢাকায় থাকতাম তাহলে অবধারিত ভাবে আমি ওনানাদের শেষ আবাস ঝিকাতলার মোড় পেরিয়ে ধানমুন্ডির দিকে মুড়ে কিছুটা এগিয়ে চারতলায় যেতাম। আপনার জন্মদিনে আমার পছন্দের পায়েস বানাতেন ডলি ভাবী। অনেকের আনা কেকও টুকরো হতো। আমরা ছাড়া আরো কেউ এলে যেমন চন্দন,স্বপন সাহা কিংবা অগুণতি আপনাদের ভক্ত ও প্রিয়জনদের কেউ এলে সবাই মিলে আনন্দআড্ডা জমে উঠতো। অকালে ডলি ভাবী চলে যাওয়াতে তছনছ হয়ে গেলো সব।
এর পরেও আপনি প্যারিসপর্ব শেষ করে ঢাকায় পাকাপাকি ফিরে এসে ছিলেন। ইউল্যাব ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে শিক্ষকতাও শুরু করে ছিলেন। তারা ধানমুন্ডি শংকরের দিকে আপনাকে থাকার জন্যে ফ্ল্যাট ও দিয়ে ছিলো। আপনাকে অনেকটা শান্ত লাগ ছিলো।
২০১৩ তো অনেক আগের কথা নয়! তখন সুবিরদা (চৌধুরী) ও জীবীত বেঙ্গল গ্যালারীর পরিচালক ছিলেন। আমি ঢাকায় এসেছি বেঙ্গলে নিজের আঁকা ছবির ১৫তম একক প্রদর্শনী করতে। পোস্টার এর ছবি যা নিজের মুখাবয়ব নির্ভর যথারীতি করে আসছি শুরু থেকে। আপনি ঢাকায় অবধারিত আপনাকেই বলবো ছবি তুলে দিতে। কল করতে ঠিকানা জানিয়ে বল্লেন – চলে এসো আগামীকাল দুপুরে। ছবিও তুলবো লাঞ্চ করবো এক সাথে। আমার সেই ১৫তম প্রদর্শনীর শিরোনাম ছিলো ‘Colors from the Soul’ আমার আইডিয়া ছিলো এ্যাকরিলিক টিউব থেকে রঙ বের করে নিজের মুখে মাখামাখি করে ছবি তুলবো। আনোয়ার ভাইও পছন্দ করলেন। ঘন্টা দুইয়েক ছবি তোলাতুলির পর দীর্ঘদিন পর এক সাথে বসে খেলাম,ডলি ভাবী ছাড়া।
প্রদর্শনীর জমজমাট উদ্বোধনীতে গ্যালারীতে ভিড় ঠেলে সোজা এগিয়ে এসে দুই হাত বাড়িয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন আনোয়ার ভাই।
এরপর আর যোগাযোগ নেই। আমিও ফিরে এলাম টরন্টো। বেশ ক’বছর পর দেখলাম কেউ ছবি দিয়েছে ফেসবুকে আনোয়ার ভাই ও মসিহউদ্দিন শাকের আরো কয়েকজন দাঁড়িয়ে কথা বলছেন ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ সিনেমার সম্ভবত ৫০ বছর পূর্তিতে সেমিনার, ফিল্ম প্রদর্শন আরো কিকি সব হচ্ছিলো শিল্পকলা একাডেমিতে। বুঝলাম তখন ঢাকার বাইরে থাকেন এই উপলক্ষে এসেছেন ঢাকায়। ওনার যে নম্বরটি সেভ করা ছিলো তাতে টরন্টোর মধ্যরাতে কল করলাম। রিং হলো ঠিকই ধরলেননা তিনি। ভাবলাম রিং হচ্ছে যখন আবার করি। এবার ধরলেন।কন্ঠে খুব তাড়া। জিজ্ঞেস করলেন-ঢাকায় এসেছো?
না, বলতে বল্লেন – মসি ডাকছে,ঢাকার রাতে কল করো। তখন ঢাকায় দিনের দুপুর। রাতে ফোন করতে ভুলে গিয়েছিলাম। এর মাত্র একদিন পর ঢাকার অন লাইন এডিশন দৈনিক সমকালে দেখলাম তিনি পান্থপথের একটি অতি সাধারণ হোটেলের রুমে তাকে খুবই কষ্টকর ভাবে মৃত্য অবস্থায় পাওয়া গেছে। অনেকক্ষণ সাড়াশব্দ না পেয়ে হোটেল কতৃপক্ষ অতি কষ্টে ভেতর থেকে বন্ধ করা দরজা খুলে দেখেন বেশ অনেকটা ছটফট করে অর্ধেক বিছানা অর্ধেক খাটের বাইরে খোলা চোখে এক বিষ্ময় নিয়ে বাংলাদেশের আধুনিক ফটোগ্রাফীর জনক,একজন স্থপতি, একজন জাতীয় পুরষ্কার পাওয়া সিনেমার ক্যামরাম্যান এবং বাংলাদেশ ও ফরাসী নাগরিক বাঁচার বিন্দুমাত্র শেষ চিকিৎসা ছাড়া মরে পড়ে আছেন অতি সাধারণ হোটেলে ছোট্ট রুমে। তবু বলবো তিনি ভাগ্যবান বাংলাদেশের মানুষ একজন মুক্তিযোদ্ধা একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান আলোকচিত্রীকে সাধ্যমত সন্মানের সাথে সমাহিত করে ছিলো। বিশ্ব বিখ্যাত আমেরিকান স্থপতি লুই আই কানতো নিউ ইয়র্কের এয়ারপোর্টের ওয়াশরুমে মরে পড়ে ছিলেন।কেউ আবার তার পার্স বা মানিব্যাগ পকেট থেকে চুরি করে নিয়ে যাওয়াতে তিনদিন পরিচয়হীন লাশ হিসেবে আরাম করে ছিলেন হীমঘরে।

