ফিলিস ওয়েব: কানাডার প্রবীণতম এক কবি

- Advertisement -
বর্তমানে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বাসিন্দা ফিলিস বিমূর্ত চিত্রকলার একজন শিল্পীও বটে

২০১৭ সালে কবি ফিলিস ওয়েব (জন্ম ১৯২৭) নব্বইয়ের কোঠায় পৌঁছেছেন। ১৯৯২ সালে তিনি অর্ডার অব কানাডার অফিসার পদে ভূষিত হন। এর দশ বছর আগে ১৯৮২ সালে কবিতার জন্য পান গভর্নর জেনারেল সাহিত্য পুরস্কার। বর্তমানে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বাসিন্দা ফিলিস বিমূর্ত চিত্রকলার একজন শিল্পীও বটে। ফিলিসের প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। সব শেষটি ১৯৯৭ সালে। শেষ তিনটি যদিও কাব্য-সংকলন। সাড়ে চার দশকে ফিলিসের মোট কবিতার বই তেইশটি। এ ছাড়া আছে দুটি গদ্যগ্রন্থ।

১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘নেইকেড পেয়েমস’। সমালোচকদের বিবেচনায় এ গ্রন্থটি ছিল সমকালীন কাব্যধারার এক অসামান্য সংযোজন। কানাডার অগ্রগণ্য সাহিত্যিক মাইকেল ওনডাডজিও বলেছেন, ১৯৬০-এর দশকে এ বই অসাধারণ প্রভাবশালী একটি প্রয়াস। এবং মজার বিষয় হলো এই কাব্যগ্রন্থের পর ফিলিসকে নিশ্চুপ দেখা গেছে, প্রায় পনেরো বছর। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ‘উইলসন বাউল’। সেটিকে প্রতিষ্ঠিত কানাডীয় সাহিত্য সমালোচক নর্থরোপ ফ্রাই (১৯১২—১৯৯১) বললেন, কানাডীয় কবিতায় এটি ল্যান্ডমার্ক। অনেকের মতে ১৯৯০ সালে প্রকাশিত ফিলিসের ‘হ্যাঙ্গিং ফায়ার’ তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্যসৃজন। ২০১৪ সালে জন এফ হালকুপের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ফিলিস ওয়েবের কাব্য সংকলন ‘পিকক ব্লু’। পাঁচশ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি ফিলিসের কবিতাকে সহজসাধ্যভাবে বোঝার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। মোট আটটি কাব্যগ্রন্থ থেকে সম্পাদক কবিতাগুলো নির্বাচন করেছেন। সেগুলোর বাইরে আরও গোটা পঞ্চাশেক কবিতা আছে বইটিতে।

- Advertisement -

১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ফিলিসের কাব্যগ্রন্থ পাঁচটি। ১৯৫৪ সালে ‘ট্রায়ো’ দিয়ে শুরু। প্রথম সে কাব্যগ্রন্থে সহযাত্রী আরও দুই কবির সঙ্গে ফিলিসের কবিতা প্রকাশিত হয়। এরপর সম্পূর্ণই নিজের কবিতা নিয়ে ‘ইভেন ইওর রাইট আই’ (১৯৫৬), ‘ইন আ গার্ডেন অব দ্য পিটি প্যালেস: আ প্যাঙ কানটাটা’ (১৯৬১), ‘দি সি ইজ অলসো আ গার্ডেন’ (১৯৬২) এবং পূর্বোল্লিখিত ‘নেইকেড পেয়েমস’।
‘ট্রায়ো’ কাব্যগ্রন্থে ফিলিসের একটি অসাধারণ কবিতা আছে। শিরোনাম ‘দি সেকেন্ড হ্যান্ড’। শুরুর লাইনগুলো এমন:

Here, love, whether we love or not
involves the clock and its ignorant hands
trying our hearts in a lover’s knot

- Advertisement -

ফিলিসের এই কবিতার কথা তাঁর কবিতা নিয়ে সব আলোচনায় ফিরে ফিরে আসতে দেখা যায়। পরের গ্রন্থের ‘ল্যামেন্ট’ কবিতাটি নিয়েও সমালোচকদের উৎসাহের শেষ নেই। কল্পনাশক্তির যে উচ্চতা এবং ভাষার যে প্রকাশ একটি বোধ কাব্য হয়ে ওঠে সেটির অনন্য উদাহরণ হিসেবে ‘ল্যামেন্ট’ও বহুল উচ্চারিত।
Knowing that everything is wrong,
how can we go on giving birth
either to poems or the troublesome lie,
to children. …

- Advertisement -

শুরুর এমন সব পঙ্‌ক্তি ফিলিসের কাব্যগ্রন্থগুলোতে খুঁজে পেতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না। যেমন পরের কাব্যগ্রন্থে আছে ‘আই ক্যান কল নাথিং লাভ’ নামের কবিতাটি। পাঁচটি পঙ্‌ক্তির সে কবিতাটি এমন—
A smile shakes alphabets over my belly
and I bend down scrabbling ‘yes’ from a young Adam.
I can call nothing love that does not answer-
and I remember how Van Gogh
his own ecstatic ear cut off.

দ্যুতি ছড়ানো এমন কাব্যসৃজন এক সময় এসে দাঁড়াল ‘নেইকেড পেয়েম’-এ। মনে হলো তিনি যেন বিশাল এক বাঁক নিলেন। ছোট ছোট হাইকু জাতীয় কবিতার সংকলন সেটি। শেষটির নাম ‘সাম ফাইনাল কোয়েশচেনস’। ‘What are you sad about?’, ‘Why are you standing there staring?’, ‘Now you are sitting doubled up in pain. What’s that for?’, ‘What do you really want?’ —জাতীয় আটটি প্রশ্ন আছে এই কবিতায়। উত্তরও আছে। একটি প্রশ্ন এবং একটি উত্তর রাখা হয়েছে এক এক পৃষ্ঠায়। যেমন ছয়টি প্রশ্ন হলো: ‘But why don’t you do something?’-এর উত্তর হলো ‘I am trying to write a poem’-এর পরের প্রশ্ন ‘Why?’ উত্তর হলো ‘Listen, If I have known beauty/ let’s say I came to if/ asking’ শেষ প্রশ্নটির কোনো উত্তর নেই। ওই প্রশ্নটি ফিলিসকে পনেরো বছর ধরে নীরব করে রেখেছিল। প্রশ্নটি হলো: ‘Oh?’
ঠিক পনেরো বছরের মাথায় নতুন গ্রন্থ ‘উইনসন’স বাউল’ নিয়ে ফিলিস যেন ভেসে উঠলেন। মাঝের বছরগুলোতে গ্রন্থাকারে না হলেও মাঝে মাঝে এদিক-সেদিক লিখেছেন তিনি। সেই লেখাগুলো নিয়েই নতুন এই বই। ‘উইলসন বাউল’ কাব্যগ্রন্থে মোট পাঁচটি ভাগ। শুরুতে এক পৃষ্ঠার একটি উপক্রমণিকা দিয়েছেন ফিলিস। অসামান্য সে উপক্রমণিকায় তিনি বলেছেন, ‘My poems are born out of great struggle of silence।’ দীর্ঘ বিরতির যে-কথা আমরা আগেই বলেছি সে-বিরতির এক ধরনের ব্যাখ্যা রয়েছে এই লাইনে। এরপর কবি ফিলিপ ওয়েব দিয়েছেন একটি ভূমিকা। ভূমিকাটি আসলে সাতটি অংশে বিভক্ত একটি কবিতা। নাম ‘পোয়েমস অব ফেইলিওর’। এটির পরের ভাগের নাম ‘পোর্ট্রেটস’। এই অংশে ‘সক্রেটিস’, ‘ক্রেপোটফিন’, ‘ফর ফিওদর’, ‘এজরা পাউন্ড’, ‘রিলকে’, ‘ফাদার’, ‘ভাসারেলি’ এবং ‘লেটারস টু মার্গারেট অ্যাটউড’ নামের কবিতাগুলো অন্তর্ভুক্ত। এর পরের ভাগগুলোর নাম ‘ক্রাইমস’, ‘আর্টিফ্যাক্টস’ এবং ‘ড্রিমস অ্যান্ড কমন গুড’। ‘আর্টিফ্যাক্টস’ অংশেই রয়েছে সেই বিখ্যাত কবিতা ‘দি বাউল’ যার শুরুর পঙ্‌ক্তিগুলো এমন—

This is not a bowl you drink from not a loving
cup. –
This is meditation’s place
cold rapture’s.

এ প্রসঙ্গে বলে রাখা যেতে পারে ‘উইলসনস বাউল’ গভর্নর জেনারেল পুরস্কার তো দূরের কথা, নমিনেশেনও পাননি। সে ঘটনার প্রতিবাদে কানাডার অগ্রগণ্য সাহিত্যিকেরা ১৯৮০ সালেই দুই হাজার তিন শ ডলার চাঁদা সংগ্রহ করে ফিলিস ওয়েবকে পাঠান। সঙ্গে ছিল একটি পত্র যাতে লেখা ছিল: This gesture is a response to your whole body of work as well as to your presence as a touchstone of true good writing in Canada, which we all know is beyond awards and prizes. উদ্যোক্তা কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে ছিলেন মার্গারেট অ্যাটউড, মাইকেল ওনডাডজি এবং পি কে পেইজের মতো প্রতিষ্ঠিত কবি।

১৯৮২ সালে প্রকাশিত হলো ‘দি ভিশন ট্রি’। সমালোচকদের মতে, এই কাব্যগ্রন্থে ফিলিস যেন হয়ে উঠলেন অনেক বেশি স্বকীয়, অনেক বেশি অনেকের চেয়ে আলাদা। আর সে কারণেই গ্রন্থটি তাঁর জন্য নিয়ে এল গভর্নর জেনারেল সাহিত্য পুরস্কার। ‘দি ভিশন ট্রি’ আসলে কাব্য সংকলনের মতো। ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত ‘ট্রায়ো’ থেকে শুরু করে সবগুলো বইয়ের শ্রেষ্ঠকে এক জায়গায় করা হয়েছিল এই সংকলনে। মোট ছয়টি কাব্যগ্রন্থের নির্যাস ছাড়াও ছিল আরও কিছু এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা কবিতা। নতুন এই কাব্য সংকলনের ভূমিকা লিখেছিলেন শ্যারন থেসেন। পাণ্ডিত্যপূর্ণ এ ভূমিকা শ্যারন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ফিলিসের কবিতার শৈলী ও প্রকরণ, ভাষা ও ভঙ্গিকে। গভর্নর জেনারেল পুরস্কার পাওয়ার পরের সকালে সিবিসি রেডিওতে ফিলিসের একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। কানাডীয় সাহিত্যের অবস্থান সৃষ্টির জন্য তাঁর ব্যাকুলতা প্রকাশিত হয়েছিল সে সাক্ষাৎকারে। সিবিসির ডিজিটাল আর্কাইভে রক্ষিত সে সাক্ষাৎকারটি আগ্রহী পাঠক শুনে দেখতে পারেন। এই পর্বে ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ‘ওয়াটার অ্যান্ড লাইট: গজলস অ্যান্ড অ্যান্টি গজলস’ এবং ১৯৯০ সালে ‘হ্যাঙ্গিং ফায়ার’।

২০১৪ সালে ফিলিস ওয়েবের সারা জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। পাঁচশ পৃষ্ঠায় সে সংকলনের নাম ‘পিকক ব্লু’। জন এফ হুলকুপের সম্পাদনায় মোট সাতটি কাব্যগ্রন্থ থেকে কবিতা বাছাই করা হয়েছে। এর বাইরেও আছে পূর্বে অপ্রকাশিত বিপুলসংখ্যক কবিতা। শুরুতে একটি প্রায় ত্রিশ পৃষ্ঠার গবেষণা প্রবন্ধ দিয়েছেন সম্পাদক। কবিতায় সামগ্রিকতায় ফিলিসের অগ্রসর হওয়া এবং দর্শনকে বোঝার জন্য এই অসামান্য এক সংকলন।

‘সানডে ওয়াটার: গজলস অ্যান্ড অ্যান্টি গজলস’-এর ভূমিকায় ফিলিস জানিয়েছেন সেগুলো লেখা হয়েছিল ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১৮ তারিখ থেকে নভেম্বরের ২৯ তারিখের মধ্যে। প্রেক্ষাপট হিসেবে কবি জানিয়েছেন ঠিক আগের বসন্তেই তিনি আনানসি প্রকাশনার ‘স্টিলট জ্যাক’ (১৯৭৮) শিরোনামের গজল সংকলনটি দেখতে পান। অকালপ্রয়াত কবি জন টমসন (১৯৩৮—১৯৭৯) রচিত সে গজলগুলো ফিলিসকে প্রভাবিত করেছিল নতুন আঙ্গিকের এমন কবিতা রচনা করতে। যদিও বইটির উৎসর্গ দেখে বোঝা যায়, গজল-প্রকৃতির কবিতার সঙ্গে ফিলিসের প্রথম সংযোগ ঘটিয়েছিলেন মাইকেল ওনানডজি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে সে জন টমসনই প্রথম কবি যিনি ইংরেজিতে লেখা গজলকে পরিচিতি দেন। আরও জানিয়ে রাখা যেতে পারে যে কানাডীয় গজল লিখে অন্য আরও যে কবিরা খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের মধ্যে কুলদীপ গিল (১৯৩৪—২০০৯) এবং মলি পিকক (জন্ম. ১৯৪৭) অগ্রগণ্য।

যেমনটি ফিলিসের অন্য কাব্যগ্রন্থেও দেখা যায়, ‘ওয়াটার অ্যান্ড লাইট’-এও দেখছি পর্বভাগ রয়েছে। প্রথমটিতে তিনি অন্তর্ভুক্ত করেছেন ১৩টি অ্যান্টি গজল। কেন এমন শব্দ প্রয়োগ? ফিলিসের মতে, যেহেতু গজলের সাধারণ ধারা হচ্ছে প্রেম। যে প্রেম কোনো বিশেষ নারীর জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক এক বোধের নাম। আবার সে নারীও কোনো বিশেষ নারী নয়, যেন শাশ্বত এক নারীজন। কিন্তু নিজের কবিতায় ফিলিস কেন্দ্র করেছেন বিশেষ জনকে। কখনো কখনো রয়েছে সামান্য কৌতুকও। আর তাই ‘অ্যান্টি গজল’ অভিধা ব্যবহার করেছেন তিনি। অন্য অংশগুলোর শিরোনাম ‘দি বার্ডস’, ‘আই ড্যানিয়েল’, ‘ফ্রিভলিটিস”, ‘মিডল ডিসট্যান্স’ ও ‘লিনিং’। আর এভাবেই কানাডীয় সাহিত্যের অগ্রগণ্য জ্যেষ্ঠ কবি ফিলিস কানাডীয় গজল ধারার এক অসামান্য স্রষ্টাও বটে।
ইস্টইয়র্ক, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles