চিত্রনাট্যে ছিল না সেই নগ্ন দৃশ্য, শুটিংয়ে কেঁদেছিলেন সালমা হায়েক

চিত্রনাট্যে ছিল না সেই নগ্ন দৃশ্য, শুটিংয়ে কেঁদেছিলেন সালমা হায়েক - the Bengali Times
অভিনেত্রী সালমা হায়েক

হলিউডের অন্যতম পরিচিত লাতিনা অভিনেত্রী সালমা হায়েক। অভিনয়, প্রযোজনা ও পরিচালনায় নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করা এই তারকার পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। ভাষা, পরিচয়, বয়স, চেহারা ও হলিউডের ক্ষমতাবানদের চাপ—বিভিন্ন বাধা পেরিয়েই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।

আজ ২ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন। ১৯৬৬ সালের এই দিনে মেক্সিকোতে জন্ম নেওয়া সালমা হায়েক ৬০ বছরে পা দিয়েছেন।

- Advertisement -

অভিনয়ে আসার পথও ছিল কঠিন

কৈশোর থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল সালমার। তবে বিষয়টি পরিবারকে জানাতেই দ্বিধায় ছিলেন তিনি। মেক্সিকোতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়াশোনাও শুরু করেছিলেন। একসময় তাঁর ইচ্ছা ছিল কূটনীতিক হওয়ার।

কিন্তু ১৮ বছর বয়সে বাবাকে নিজের অভিনয়ের ইচ্ছার কথা জানান। শুরুতে বাবার আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত অভিনয়ের ক্লাসে ভর্তি হন সালমা। এরপর ধীরে ধীরে একাডেমিক পড়াশোনার বদলে অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নেন।

মেক্সিকোর টেলিভিশনে অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি পান তিনি। ‘তেরেসা’ ধারাবাহিকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পরে সিনেমা ও মঞ্চেও কাজ শুরু করেন। যদিও মঞ্চভীতির কারণেও তাঁকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল।

মেক্সিকো থেকে হলিউড

১৯৯১ সালে সালমা পাড়ি জমান লস অ্যাঞ্জেলেসে। লক্ষ্য ছিল ইংরেজি শেখা এবং হলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করা। কিন্তু বিদেশি, বিশেষ করে লাতিনা অভিনেত্রী হিসেবে প্রধান চরিত্র পাওয়া তখন বেশ কঠিন ছিল।

অনেকেই তাঁর স্বপ্ন নিয়ে হাসাহাসি করতেন। তবু থেমে যাননি সালমা। ১৯৯৫ সালে ‘ডেসপেরাদো’ সিনেমায় অ্যান্টোনিও বান্দেরাসের বিপরীতে অভিনয় করে যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকদের নজরে আসেন। এরপর ‘ফ্রম ডাস্ক টিল ডন’, ‘ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েস্ট’ ও ‘ডগমা’র মতো সিনেমায় অভিনয় করে পরিচিতি আরও বাড়ান।

তবে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তাঁর অভিনয়ের চেয়ে সৌন্দর্য ও শারীরিক আকর্ষণ নিয়েই বেশি আলোচনা হতো। সালমা চেয়েছিলেন, দর্শক তাঁকে শুধু চেহারার জন্য নয়, অভিনয় ও মেধার জন্যও মূল্যায়ন করুক।

‘ফ্রিদা’ বদলে দেয় ক্যারিয়ার

সালমা হায়েকের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০০২ সালের ‘ফ্রিদা’ সিনেমায়। মেক্সিকান চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলোর চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি সিনেমাটি প্রযোজনাও করেন তিনি।

ছবিটি ছয়টি অস্কার মনোনয়ন পায়। সালমা পান সেরা অভিনেত্রীর মনোনয়ন। এর মাধ্যমে তিনি এই বিভাগে মনোনয়ন পাওয়া প্রথম মেক্সিকান অভিনেত্রী হন।

তবে সিনেমাটি নির্মাণের পথ ছিল অত্যন্ত কঠিন। ২০১৭ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক লেখায় সালমা অভিযোগ করেন, ছবিটির প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত হার্ভি ওয়াইনস্টিন তাঁর ওপর যৌন হয়রানি, চাপ ও হুমকি প্রয়োগ করেছিলেন।

সালমার দাবি, সিনেমাটি শেষ করার জন্য তাঁকে এমন একটি নগ্ন যৌন দৃশ্যে অভিনয়ের চাপ দেওয়া হয়েছিল, যা মূল চিত্রনাট্যে ছিল না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেই দৃশ্যের শুটিংয়ের দিন তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। শরীর কাঁপছিল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল এবং তিনি কাঁদছিলেন।

অন্যদিকে ওয়াইনস্টিন তাঁর অভিযোগের বেশ কিছু অংশ অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, সিনেমার প্রয়োজনেই কিছু দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল। পরে ‘ফ্রিদা’ সালমার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যে পরিণত হয়।

৩০ বছর বয়সে নিজেকে ব্যর্থ মনে হয়েছিল

সালমার জীবনে আরেকটি কঠিন সময় আসে ৩০ বছর বয়সে। ২০১৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ৩০ বছরে পা দেওয়ার সময় তিনি কেঁদেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, এই বয়সে এসে আরও বেশি সাফল্য অর্জন করার কথা ছিল।

নিজেকে তখন ব্যর্থ, একাকী, পথহারা ও ভীত মনে হয়েছিল তাঁর। নিজের উচ্চতা নিয়েও দুশ্চিন্তা ছিল। আশঙ্কা করতেন, হয়তো আর ভালো কাজ পাবেন না।

তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে বদলে যায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। জীবনের ৪০-এর দশকে এসে তিনি উপলব্ধি করেন, জীবন সব সময় নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয় না। আর সেটি মেনে নেওয়ার মধ্যেও শান্তি রয়েছে।

অভিনেত্রীর পাশাপাশি প্রযোজক ও পরিচালক

শুধু অভিনয়ের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি সালমা। গড়ে তুলেছেন নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। সেখানে নারী ও লাতিনা জনগোষ্ঠীর গল্পকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

‘ফ্রিদা’র পাশাপাশি ‘আগলি বেটি’র মতো প্রকল্পেও প্রযোজক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। পরে পরিচালনাতেও নিজের দক্ষতা দেখান। ২০০২ সালের টেলিভিশন চলচ্চিত্র ‘দ্য মালদোনাদো মিরাকল’ পরিচালনা করে এমি পুরস্কারও পান তিনি।

কত সম্পদের মালিক সালমা?

সালমা হায়েকের বার্ষিক আয় বা পারিশ্রমিকের নির্ভুল হিসাব প্রকাশ্যে নেই। তবে বিভিন্ন সেলিব্রিটি সম্পদবিষয়ক ওয়েবসাইটের হিসাবে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ২০০ মিলিয়ন ডলার বলে দাবি করা হয়। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা ও ব্যবসা থেকেও তাঁর আয় রয়েছে।

মেক্সিকোর টেলিভিশনের তরুণ অভিনেত্রী থেকে হলিউডের তারকা, অস্কার মনোনীত অভিনেত্রী, প্রযোজক ও পরিচালক—সালমা হায়েকের ক্যারিয়ার তাই শুধু সাফল্যের গল্প নয়। এটি নিজের পরিচয় ও যোগ্যতা দিয়ে প্রতিকূলতার মধ্যেও জায়গা করে নেওয়ার গল্প।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ‘না’ বলার গুরুত্বও বারবার তুলে ধরেছেন সালমা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, “না” শব্দটির চেয়ে আর কিছু বেশি অপছন্দ করি না।’

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles