
কানাডার স্বাস্থ্যসেবা ইতিহাসে লেখা হলো এক নতুন অধ্যায়। ইউনিভার্সিটি হেলথ নেটওয়ার্কের (ইউএইচএন) পিটার মাঙ্ক কার্ডিয়াক সেন্টারে কানাডার চিকিৎসক দল প্রথমবারের মতো মৃতদেহ (posthumous donor) থেকে হৃদপিন্ড প্রতিস্থাপন করে এক অবিশ্বাস্য সাফল্যের সাক্ষী হলো। এই ঐতিহাসিক অস্ত্রোপচারের নেতৃত্ব দেন বিশিষ্ট কার্ডিয়াক সার্জন ডা. সৈয়দ আলি রেজা রবি, যিনি ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের জটিল সার্জারিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
ডা. রবির নেতৃত্বে একদল দক্ষ সার্জন, নার্স এবং টেকনিশিয়ান প্রায় আট ঘণ্টা ধরে জটিল এই অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন করেন। তাদের এই সফলতা শুধু কানাডার চিকিৎসা ইতিহাসেই নয়, বরং বৈশ্বিক কার্ডিয়াক সার্জারির জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
এখন পর্যন্ত হৃদপিন্ড প্রতিস্থাপনের প্রচলিত ধারা ছিল এমন যখন কোনো রোগীর ব্রেন ডেথ (মস্তিষ্কের কার্যক্রম চিরতরে বন্ধ) নিশ্চিত করা হয়, তখনো হৃদপিন্ড সচল থাকে এবং সেটি দ্রুত অন্য রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়।
কিন্তু নতুন এই প্রযুক্তিতে সেই ধারণাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। ডা. রবি জানান, এই প্রক্রিয়ায় যখন কোনো রোগীর স্বজনরা লাইফ সাপোর্ট বন্ধে সম্মতি দেন এবং মৃত্যুর পর হৃদপিন্ড থেমে যায়, তখন সার্জন দল বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে সেটিকে পুনরায় সচল করে প্রতিস্থাপনের উপযোগী করেন।
“এটি সত্যিকারের একটি রূপান্তর,” বলেন ডা. সৈয়দ আলি রেজা রবি। “আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে হৃদপিন্ড প্রতিস্থাপনের ধারণাটিই বদলে যাচ্ছে। মৃতদেহ থেকেও এখন জীবন বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে এটি মানবতার জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ।”
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়া প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল হলেও প্রতিস্থাপনের ঝুঁকি প্রায় প্রচলিত হৃদপিন্ড প্রতিস্থাপনের মতোই। অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হতে সময় লাগে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা, এবং এতে প্রয়োজন হয় বিশেষ সরঞ্জাম ও অত্যন্ত দক্ষ টিমওয়ার্ক।
এই ধরণের প্রতিস্থাপন প্রথম শুরু হয় অস্ট্রেলিয়ায় ২০১৪ সালে। এরপর যুক্তরাজ্যে ২০১৫ সালে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৯ সালে সফলভাবে সম্পন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রে সেই ঐতিহাসিক সার্জারির অংশ ছিলেন স্বয়ং ডা. সৈয়দ আলি রেজা রবি। এখন তিনি সেই অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নিয়ে কানাডায় একই সাফল্য এনে দিয়েছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অর্জন ভবিষ্যতে হৃদরোগীদের জন্য আশার আলো হয়ে উঠবে। কারণ মৃতদেহ থেকে প্রতিস্থাপনের সুযোগ বাড়লে দাতা হার্টের অভাব অনেকটাই কমে আসবে যা এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
কানাডার স্বাস্থ্যনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সাফল্য শুধু চিকিৎসা ক্ষেত্রেই নয়, কানাডার গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার এক অনন্য প্রতীক। ইউএইচএন ইতিমধ্যেই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
ডা. রবি বলেন, “এটি কেবল একটি সার্জারি নয়; এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিবর্তনের অংশ। প্রতিটি জীবন বাঁচানোর পেছনে থাকে সাহস, বিজ্ঞান আর সহমর্মিতার মেলবন্ধন।”

