টরন্টোয় কাজের মেয়ে

টরন্টোয় কাজের মেয়ে - the Bengali Times
টরন্টোয় কাজের মেয়ে

কাজের মেয়েকে নিয়ে পূর্বের লেখাতে যারা আপনাদের অবস্থান ও মতামত শেয়ার করেছেন তাদের সকলকে ধন্যবাদ। আপনাদের অনেকের কথা জানি বলেই এই পোস্টটা দিয়েছিলাম। সুমনা ও তার মায়ের কথাও পড়েছি। অনেককে দেখেছি কাজের মেয়েকে নিয়ে একই বিছানায় ঘুমাতে। শিশু পার্কের দোলনাতে ওদের দোল খেতে দেখেছি। আমার মেঝ বোনের বাসার কাজের ছেলেদেরও দেখেছি ইস্ত্রি করা কাপড় পড়তে। এবার ঢাকায় গিয়ে দেখলাম ছোট শ্যালকের কন্যাকে যে মেয়েটা দেখাশুনা করছে সে মেয়েটাও চমৎকার হাসিখুশি এবং সুন্দর করে নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। ছোট বোনের কাজ কন্যাকে দেখলাম ইচ্ছেমত আমার বোনকে নির্দেশনা দিচ্ছে, টেলিভিশন থাকে তার দখলে। কদিন আগে লিখেছিলাম অস্ট্রেলিয়া নিবাসী আমার এক ফুফাতো ভাই একটি ছোট্ট মেয়কে অন্যের বাড়িতে যেন কাজ করতে না হয় সেজন্য তার বাবাকে আজীবন পড়ালেখার খরচ যুগিয়ে গেছে। সেই মেয়ে যে অস্ট্রেলিয়া নিবাসী আমার এই ভাইয়ের পাঠানো পয়সায় ডাক্তারি পাশ করে বেরিয়েছে তা সে জানে না। দেশে যাবার সময় আমার গিন্নি সব বাসার কাজের মেয়েদের জন্য গিফট কিংবা প্রসাধনী নিয়ে যায়। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে ওরা এক সময় আমাকে ভীষণ ভয় পেতে। আমি ডাক দিলে নাকি ওদের কাঁপন উঠে যেত। কিন্তু নিজের ভুলের জন্য এখন অনেক কষ্ট পাই। এখন ওদের সাথে আমি ছবি তুলি। সময় বের করে একদিন ওদের সাথে রান্নাঘরে কাটিয়ে দেই। ওরাও মামার সাথে রান্নার যোগান দিয়ে খুব খুশি থাকে। ভিডিওতে হেসে হেসে কথা বলে।

ছোট বেলায় এক ফুপার বাসায় দেখেছি অল্প বয়সের একটি কাজের মেয়েকে। সে বড় হলে ফুপা-ফুপুই ওর বিয়েও দিয়ে দেয়। নতুন জামাইয়ের জন্য চাকুরীও যোগার করে দিয়েছিল ফুপা। একবার দেশে যেয়ে শুনি বুয়ার ছেলে তিতুমীর কলেজে পড়ছে। তখনও ছেলেটির মা ফুপার বাসাতেই কাজ করতো। এমন অনেক গল্প বা ঘটনা আমাদের জানা আছে। কেউ শুনেছি, কেউ চোখে দেখেছি কিংবা কেউ এমন মানবিক কাজে সচেতন ভাবেই অংশ নিয়েছি। কিন্তু যারা জিনিসটা বুঝতে চায় না তারা যেন বুঝতে পারে তাই আপনাদের কথা আরো শুনতে চাই। এই অধিকারটুকু দিলে যে কারোর কোন ক্ষতি হয় না। এমনকি নিজের সম্মানও কমে যায় না সেটা কেন লেখাপড়া জানা মানুষ বুঝবে না। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা বিশ পঁচিশ ত্রিশ বছরের লোককে এখনো ‘তুই’ করে ডাকেন কেননা ওরা বাঁচার জন্য অন্যের বাড়িতে কাজ করে বলে। অথচ নিজেদের সাত আট বছরের বাচ্চাদের সাথে ‘তুমি’ এবং মিষ্টি করে কথা বলেন। কয়দিন আগে দেখলাম একটা কাজের মেয়েকে গাড়ির পেছনে সিএনজি’র সিলিন্ডারের ওপর বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এমন একটা ছবি এসেছে ফেসবুকে। আগে যেমন দেখতাম রিক্সাতে পায়ের কাছে বসিয়ে রাখা হতো।

- Advertisement -

অনেকে ভুল অবস্থান থেকে সরে এসেছেন, অনেকে এগিয়ে এসে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অনেকে আটকে আছেন এক অন্ধ চিন্তার জগতে। আবার কারোর কাছে কাজের মানুষদের সাথে ভালো ব্যবহার করা উদারতা নয় স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু কাজের ছেলে-মেয়ের সাথে প্রেম বা বিয়ে নিয়ে হয়তো এখনো অনেকেই ভিন্ন মত পোষণ করবেন। আমি অন্তত দুটি গল্পে (“কাজ রাণী” ও “বাবা তোমার বেতন কত”) সে সুযোগ করে দিয়েছি। আপনাদের গল্প উপন্যাসে কবিতায় ভাবনায় কিংবা কর্মে, অন্যের বাড়িতে কাজ করা মানুষগুলো যেন বড় হয়ে আসে সে প্রত্যাশা করছি। আগের যুগে একই পরিবারের সদস্য যেমন, দাদা-বাবা-ছেলে হয়তো অন্যের বাড়িতে কাজ করত নিজেকে নিচু স্তরের মানুষ মনে করে অথবা ওদের অনেকেই মানুষ মনে করতো না, সেই সামন্ত সমাজ এখন নেই। আমাদের আচার ব্যবহারে যেন যুগের ছায়া ফুটে থাকে তাই আশা করবো।

চাই না দেখতে আর খুন্তি সেঁকা ছবি। তাহলে পদ্মা মেঘনা যমুনা ভিন্ন ভিন্ন নদী। ওগুলো আমাদের ঠিকানা নয়।

 

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -
পূর্ববর্তী খবর
পরবর্তী খবর

Related Articles

Latest Articles