
জন্মদিন নিয়ে আমার কখনোই কোন উচ্ছাস-আগ্রহ ছিল না। আমার কাছে জন্মদিন মানে জীবন থেকে একটি বছর হারানোর বেদনার দিন। আইনস্টাইন বলেছিলেন, “জন্মদিন সব সময় সুখী হওয়ার দিন নয়, বরং এটি মনে করিয়ে দেয় যে আমরা এক বছর কম বাঁচবো, আর এক বছর বয়সী হয়ে উঠেছি।” সেই অস্বস্তিকে ভুলে থাকতেই হয়তো কেক কেটে বেলুন উড়ানোর প্রয়োজন হয়? কিন্তু সেই আনুষ্ঠানিকতার কাছে কখনো যায়নি, আমার ভাল লাগেনি।
জন্মদিনে বরং নিজেকে নিয়ে ভাবি, আমি কী অর্জন করেছি? আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? জীবনের মানে আমার কাছে কী? এই আত্মসমীক্ষা, আত্মদর্শন আমাকে গভীরভাবে আন্দোলিত করে। পিকাসো বলেছিলেন, “আপনার জন্মদিনে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করুন। জীবন একটা আর্ট, আর আপনিই তার শিল্পী।” কিন্তু আমার মনে হয়েছে আমি তা করতে পারিনি, এই ক্ষরণ আমাকে অস্থির করে।
আমি কখনো আমার জন্মদিন পালন করিনি। আমার মা’ও কখনো আমাদের জন্মদিন পালন করেনি, বাবা খুন হবার পর বদলে যাওয়া বাস্তবতায় সেই আদিক্ষেতার পরিবেশ আমাদের পরিবারে ছিল না। তাই ঘটা করে ভাইবোনরাও আমরা একেঅন্যকে কখনো শুভ জন্মদিন বলিনি।
জন্মদিনকে কেন্দ্র করে মানুষ অন্যের প্রতি তাদের শুভেচ্ছা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা প্রকাশ করে। এটা একটা স্বীকৃতি ও স্বীকৃত মাদ্যমও। দার্শনিক দৃষ্টিতে, এটি আমাদের সামাজিক অস্তিত্ব এবং পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্বকে তুলে ধরে। সার্ত্র বিশ্বাস করতেন, মানুষ প্রথমে অস্তিত্ব লাভ করে, এরপর নিজের অর্থ বা পরিচয় নিজেই নির্মাণ করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে জন্মদিন কেবলমাত্র জীবনের আরেকটি বছর পার হওয়া নয়, বরং এটি একটি ’স্ব-নির্মাণের’ ধারাবাহিক যাত্রার স্মারক।
জন্মদিন কেবল সময়ের একটি চিহ্ন — জীবনের শূন্যতার মাঝে মানুষের অর্থ খোঁজার এক ক্ষণিক উৎসব। আমরা বেঁচে আছি, সংগ্রাম, মায়ায়, ভালবাসায় সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ”কামু’র ভাবনায়, জন্মদিন অস্তিত্ববাদীদের জন্য কোনো আনন্দময়, বাইরের উৎসবের দিন নয় — বরং এটি নিজ অস্তিত্ব, স্বাধীনতা, ও দায়বদ্ধতার এক নীরব স্মরণদিবস।
তবু, ’হৃদয়ও প্রসারি’ চাহি ’ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ’ জানি ভুলে গেলে বা যেতে পারলে মিটে যেতো অনেক গ্লানি, বেদনা কিন্তু পারি না.. পারিনি। আমার মন আরো অভিলাষি ও স্বপ্নবান হয়ে ওঠে। ঘাসফুল, মেঠোপথ, নদী, জোনাকি, নীলিমা, কুয়াশাকে আজো তেমনি ভালবাসি। রমনীয় রয়ে যায় এই হৃদয়, তাই একুশে কিভাবে একাশি ভাবি? জন লেননের কথায়, “Count your age by friends, not years. Count your life by smiles, not tears.”
কথাগুলো শুনে হয়তো অনেকের আতলামি মনে হবে কিন্তু আমার জন্মদিন ভাবনা এমনই বিক্ষিপ্ত। সে জন্যই দিনটিকে আড়াল করতে চাই কিন্তু ফেসবুকের যুগে তাকে লুকিয়ে রাখার সুযোগ নেই, পরিচিত ও সতীর্থরা জেনেই যায়। দেখি উপচে পড়া ভার্চ্যুয়াল শুভেচ্ছা টাইমলাইনের উঠান ভরে ওঠে। মানুষের ভালবাসায় বিনয় ও দায় বোধ করি। ভাবি তত্ত্বের বাইরেও ভাবনার জগৎ আছে। হেলেন কেলারের সেই বিখ্যাত উক্তির কথা মনে পড়ে, ’The best and most beautiful things in the world you cannot be seen or even touched; they must be felt with the heart.’
আমার জন্মদিনে যাঁরা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।
৩রা জুলাই ২০২৫
টরন্টো, কানাডা

