
“দোলা মাটির মোর বথুয়ারে শাক,
বথুয়া হলফল করে।”
আমার শৈশব কেটেছে গ্রামে। আব্বা চাকুরি করতেন বাইরে বাইরে। মা’র সাথে আমরা থাকতাম দাদার সংসারে। সেসময় সবজি মাছ মাংস বলতে যা বোঝায় তার সবকিছু দাদা চাষ করতেন নিজে। লবন তেল ছাড়া বাজারের মুখাপেক্ষী ছিল না দাদার সংসার। শৈশবেই দাদার হাত ধরে চিনেছিলাম পটল কাকরোল মুলা বেগুন, ঝিঙা চিচিঙ্গা করল্লা, লাউ শশা, লাল পালং, নাপা পুঁই এবং বথুয়া শাক। এসব সবজির সবকিছু চাষ হলেও বধুয়া শাক বেড়ে উঠতো অযত্ন অবহেলায় আগাছার সাথে।
সেসময় দাদী, মা’র অনুরোধে মাঝে মাঝে বধুয়া শাক তুলে আনতাম। আগাছার মধ্যে কোনটি বথুয়া শাক তা চিনে নিয়েছিলাম দাদার কাছে। বথুয়া শাকের সাথে আমার শৈশবের মধুর স্মৃতি জড়িত । সেসময়েই শুনেছিলাম বথুয়া নিয়ে উত্তোরাঞ্চলের একটি জনপ্রিয় গান-“দোলা মাটির মোর বথুয়ারে শাক, বথুয়া হলফল করে- – “!

এরপর গ্রাম ছেড়ে মফস্বল শহর, মেগাসিটি হয়ে প্রবাস, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে শৈশবে চেনা অন্যসব সবজি কিনেছি, নিজ হাতে চাষ করেছি কিন্তু বথুয়া শাক দেখিনি, খাইনি এমনকি বথুয়া শাকের কথা এবং চেহারা ভুলেই গিয়েছিলাম। শৈশবের পরিচিত একটি বিষয় জীবন থেকে নাই হয়ে গিয়েছিল।
আমাদের পাশের শহরে থাকেন মাসুদ ভাই। বুয়েট থেকে পাশ করা ইন্জিনিয়ার, শান্ত অমায়িক ভদ্র মানুষ। তাদের জীবনের সবচেয়ে পজেটিভ দিক হলো জীবনের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি নিয়ে কোন উচ্ছাস আক্ষেপ নেই। দুই মেয়ে নিয়ে আনন্দে কাটে তাদের জীবন। সেই মাসুদ ভাইয়ের শৈশব কেটেছে গ্রামে। তিনি ভুলে যাননি বথুয়া শাককে।

তিনি গিয়েছিলেন ভাবীকে তাঁর কাজ থেকে আনতে। কোন কারনে দেরী হচ্ছিল ভাবীর। পার্কিং লটের পাশে একটি কনস্ট্রাকশন এলাকায় এই প্রবাসে অযত্নে বেড়ে উঠেছে বথুয়া শাক। সেদিকে দৃষ্টি চলে যায় তার। শৈশবের স্মৃতি ভর করে। মুঠোভরে তুলে এনে রান্না করে খেয়েছেন। আমাদের জন্য বয়ে এনেছেন। রুমুকে বলে দিয়েছেন রান্নার রেসিপি।
আজ দুপুরে রুমু রান্না করেছিল সেই শাক। খেয়ে ফিরে গিয়েছিলাম শৈশবে। সেই স্বাদ সেই গন্ধ। জীবনের একটি মধুর বিষয় ফিরে পাবার জন্য কৃতজ্ঞতা মাসুদ ভাই ও ভাবীর প্রতি।
গুয়েল্ফ, কানাডা

