17.2 C
Toronto
বৃহস্পতিবার, মে ২৩, ২০২৪

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : নয়

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : নয়

আমার স্বামী আমাদের এয়ার পোর্ট থেকে বাসায় নিয়ে আসলেন। বাসাটা মোটা মুটি পছন্দ হোল । আসবার পত্র গুলির মাঝে বেশ সুরুচির পরিচয় ছিলো । আমি আমার এগারো বছরের সাজানো গুছানো সংসার পিছনে ফেলে আবার চার প্লেট , চার গ্লাস, চার কাপ দিয়ে সংসার শুরু করলাম। ধীরে ধীরে মোটা মুটি ভাবে সংসার গুছিয়ে নিলাম। মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করলাম, ছেলেকে ডে কেয়ারে ভর্তি করলাম। আমি নিজেও একটা স্কুলে চাকরি নিলাম। আবারো শ্রীলংকা থেকে কাজের মানুষ আনালাম। সব কিছুর মাঝেও সব হারিয়ে ফেলার একটা শুন্যতা কাজ করতো আমাদের দুজনের মাঝেই।

- Advertisement -

তবে আমাদের অফিসের বাসার এরিয়াটা খুবই সুন্দর ছিলো । বিভিন্ন দেশের শিক্ষকদের বাসা । বিশাল বিশাল চারটা এগারো তালা বিল্ডিং । প্রত্যেক ফ্লোরে তিনটি করে এপার্টমেন্ট । নীচে সুমিং পুল, বাচ্চাদের প্লে গ্রাউন্ড , বড়দের টেনিস কোর্ট । পুরো এলাকাটা বড় বড় গাছ আর ফুলে ভরা। সামনে বিশাল গেট । সে গেটের দিয়েই সবাইকে ঢুকতে হতো । তাছাড়া সিঙ্গাপুর হোল পরিস্কার পরিচ্ছনতার জন্য নামকরা দেশ। কোথাও এক বিন্দু ময়লা থাকার উপায় নেই। আমাদের বাচ্চারা বাইরে চকলেট বা অন্য কিছু কিনলে চকলেটের কাগজ বা কিছুর খোসা পকেটে ভর্তি করে নিয়ে আসতো । কারন সেখানে কোন ধরনের ময়লাই রাস্তায় ফেলা যাবে না। সবাই সেটা মানতে বাধ্য ছিলো।

খুব অল্প সময়ের মধ্যয়েই কম্পাউন্ডের অনেকের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেলো । অস্ট্রেলিয়ার মেমরি , আমার চাইতে দ্বিগুণ বয়েসের প্রচণ্ড মোটা মহিলাটি আমার অত্যান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিনত হয়েছিলো , তাছাড়া নিউজিলেন্ডর এ্যন, বৃটেনের নাগরিক শোভা , চায়নার এন্নি, শ্রীলংকার জয়তি, কলকাতার অদিতি, বাংলাদেশের লুতফা আমরা সবাই খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গেলাম। আমরা সবাই কাজ করি। বিকেলে সবাই কাজ কর্ম সেরে নীচে নেমে গল্প করতাম। কতো রকমের আড্ডা । সবার দেশের সব রকমের আড্ডা , গল্প চলতো । কোন কোন সময় উইক এন্ড এ আমরা কফি মর্নিং করতাম। খুব অল্প সময়ের আমি মানিয়ে নিলাম অনেক কিছু। মানিয়ে গুছিয়ে নেয়া জিনিষটা আমার ভেতরেই ছিলো । যখন যে দেশে গেছি সেখানেই নিজের মতো করে মানিয়ে নিয়েছি।

সব চাইতে আনন্দের ব্যাপার ছিলো যারা আমরা কুয়েত থেকে এক সাথে বের হয়েছিলাম তারা সবাই আমরা সিঙ্গাপুরের বাসিন্দা হয়ে গেলাম। সবাই বিভিন্ন জায়গাতে ভালো চাকুরি পেয়ে গেলেন। এতে আমাদের সব কিছু ফেলে আসার ব্যথাটা সামান্য হলেও কমেছিলো ।খুব ঘন ঘন আমাদের দেখা হতো । দাওয়াত খাওয়া দাওয়া আমাদের চলতেই থাকতো । সাথে সাথে সবাই মিলে একসাথে ঘুরাঘুরি।

সিঙ্গাপুরের ডিজাইনটা এমন ছিলো , সব এলাকাতেই একটা প্লাযা ছিলো । সেখানে খাবার দোকান , সেলুন, পার্লার , প্রয়োজনীয় জিনিষের দোকান ছিলো । এলাকার মানুষ জন সেখানে হেঁটেই যেতে পারতো । ছোট দেশ কোন কিছু তেমন দূরত্ব ছিলো না। সবচাইতে ভালো ব্যাপার যেটা ছিলো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কোন ট্যাক্সি যাবার সময় হাত তুললেই সামনে এসে দাঁড়াতো , বাংলাদেশের রিকশার মতো । বাস সার্ভিস ও অত্যান্ত ভালো ছিলো । সব এলাকা থেকেই লোক জন বাসে উঠে গন্তব্যে পৌছাতে পারতো । তাছাড়াও ছিল ট্রেন MRT. সেটা মাটির নীচ ও উপর দুই পাশেই চলতো । কাজেই চলা ফেরার কোন রকম অসুবিধা কারোই ছিলো না। তাছাড়া প্রচুর মানুষের ব্যক্তি গত গাড়িও ছিলো । গাড়ীর দামও ছিলো প্রচুর গাড়ীর কেনার পারমিশানের জন্য অ্যাপ্লাই করা হতো । প্রতিমাসে চার হাজার গাড়ী কেনার পারমিসন দেয়া হতো । কিন্তু দশ বছর পরে সে গাড়ী ডিসপোস করে দিতে হতো । সে ভাবে গাড়ির বেলেন্স রাখা হতো। আমরাও একটা গাড়ী কিনেছিলাম অনেক দাম দিয়ে সবার মতো । যদিও আমরা দশ বছর সেখানে ছিলাম না তার অনেক আগেই আমরা চলে এসেছিলাম আরেক দেশে অনেক লাভে গাড়ী বিক্রি করে।

এর মাঝে আমাদের বাসার কাছেই একটা আর্ট ক্লাস এ ভর্তি করে দিলাম আমাদের ছেলে মেয়েকে। আমাদের কম্পাউন্ড থেকে আরো কিছু বাচ্চাও যেতো । বাসার এতো কাছেই স্কুলটা ছিলো যে আমি নিজেই হেঁটে বাচ্চাদের দিয়ে আসতাম আবার ক্লাস শেষ হলে ওদের নিয়ে আসতাম। বাসার নীচের সুইমিং পুলে প্রাইভেট সুমিং টিচার রেখে মেয়েকে সুইমিং শিখাতে দিলাম। আমি আর ছেলে পুলের পাশে বসে ওর শেখা দেখতাম। সুমিং টিচারকে বাচ্চারা আঙ্কেল পুচাং বলে ডাকতো । কারন তার নাম ছিলো পুচাং। আমার মেয়ে অল্প সময়েই মোটা মোটি কিছুতা সাতার শিখে গেলো । আমার ছেলেও আঙ্কেল পুচাং এর সাথে পানিতে নামতে শুরু করলো ধীরে ধীরে । তাছাড়া মেয়েকে ছেলেকে পিয়ানো ক্লাসে ভর্তি করলাম।

এর মাঝে আমরা বন্ধুরা মিলে মালয়েসিয়ার জেন্টিং হাইল্যান্ড ঘুরে আসলাম। খুব ভালো লাগলো কতো দিন পরে আমরা আবার বেড়াতে বের হলাম। মালেয়েশিয়াটা খুব ভালো লাগলো , কোথায় যেনো অল্প সল্প দেশের ছুয়া পেলাম। জেন্টিং হাইল্যান্ড খুব ভালো লাগলো। এটা এতো উপরে ছিলো যে জানালা দিয়ে মেঘ ঢুকে যাচ্ছিলো । সেটা দেখে আমাদের যে কি আনন্দ। সেখানে পিকনিকের মতো আমরা খিচুরি মাংস রান্না করে খেলাম। কতো দিন পরে যে আনাবিল আনন্দ পেলাম।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles