20.5 C
Toronto
বুধবার, জুলাই ২৪, ২০২৪

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : পাঁচ

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : পাঁচ

কুয়েতে আসার পর বিশেষ করে ইরাক থেকে এসে জীবনটাকে অনেক সুন্দর ও আনন্দের মনে হতে লাগলো । আমার নিজেকে মনে হতো আমি অত্যান্ত সুখী একজন মানুষ । রাতে যখন ঘুমাবার আগে আয়নার সামনে বসতাম নিজেকে রাতের মুখের , চুলের পরিচরচা করতে তখন মনে হতো আমার কিসের অভাব। সৃষ্টি কর্তা আমাকে অনেক দিয়েছেন। স্বামীর ভালোবাসা , আর্থিক সচ্ছলতা, ফুটফুটে বাচ্চা । কাজের মানুষ আছে বলে বাংলাদেশের মতো আরাম আয়েসে জীবন কাটাচ্ছি ।

- Advertisement -

সে সময় কুয়েতের আমীর ছিলেন “ শেখ জাবেল আল সাবা “ । শান্ত নম্র চেহারা। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে অনেক অপবাদ বা সত্যি জানি না তবে বহুল প্রচলিত ছিলো কথাগুলো – যেমন আমীর প্রতিরাতে একটি বিয়ে করতেন একরাতের জন্য , প্রতি রাতে নতুন নতুন মেয়ের শরীর ভোগ করার জন্য। কথাগুলোর মাঝে কতোটুকু সত্যতা ছিলো সেটা আমাদের বিদেশীদের জানার কোন উপায় ছিলো না। তবে কুয়েতিদের চরিত্র খুব একটা সচ্ছ ছিলো না। তাদের নিয়ে বাতাসে অনেক গল্প ভেসে বেড়াতো । তেলের টাকার গর্বে তাদের অহংকারী করে তুলেছিলো । কিন্তু সে বাতাসের ছুঁয়া আমরা কখনো পাইনি। তবে যারা উচ্চ শিক্ষিত এবং কুয়েতের বাইরে থেকে পড়া শুনা করে এসেছিলো তাদের ব্যবহারে বিদেশের সভ্যতার কিছুটা ছোয়া বহন করে এনেছিলো । সেদিক বিবেচনা করলে ইরাকের জনগন অনেক ভদ্র সভ্য ছিলো । সব দেশেরই ভাল মন্দ মিলিয়ে মানুষ রয়েছে।

সে সময় শেখ সাদ ছিলেন প্রধান মন্ত্রী । তিনিই দেশ পরিচালনা করতেন । অত্যান্ত ভদ্র এবং বিচক্ষণ ব্যক্তি আর আমির ছিলেন দেশের অলঙ্কার । তাঁর দেশে এবং অন্য দেশে বিদেশী ডেলিকেটদের সাথে কথা বলার সময় আমির নিজে উপস্থিত থাকতেন। শেখ সাদ ছিলেন আমিরের সৎ ভাই আফ্রিকান বংশভূত । কারন আমিরের বাবা দ্বিতীয় বিবাহ করেছিলেন আফ্রিকান বংশ ভূত একজন মহিলাকে। আমিরের আপন ভাই ছিলেন পররাষ্ট মন্ত্রী নউফ আল আহমেদ আল সাবা। আমির শেখ জাবেলের মৃত্যুর পর তাঁর আপন ভাইকে আমির বলে ঘোষণা করা হয়। যদিও নিয়ম অনুযায়ী প্রধান মন্ত্রীই আমির হওয়ার কথা। শেখ সাদ অত্যান্ত বুদ্ধিমান এবং বিচক্ষণ হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে আমির করা হয়নি কারন তিনি ছিলেন আফ্রিকান বংশভুত কালো রঙের। বর্ণ বৈশ্যমতা থেকে কোন কালেই মানুষ মুক্তি পায়নি।

আমাদের কমপ্লেক্সে নানা দেশের মানুষ ছিলো । সবার সাথে মেলা মেশা বা বন্ধুত সম্ভব ছিলো না। আমাদের সাথে দুটো ভারতীয় পরিবার ছিলো , অবশ্য কেউই বাঙালি না। তাতে আমাদের কোনো সমস্যা ছিলো না।আমাদের মাঝে খুব ঘনিষ্ঠ মেলামেশা ছিলো । একে অপরের সাহায্য করতে কখনো পিছিয়ে থাকতাম না। তবে আমার সব চাইতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো সুদানের তাহিয়া নামের মহিলাটি। আমরা একজন বাঙালি একজন সুদানের। কিন্তু আমরা কখনো বুঝতেই পারতাম না আমরা দুজন দুই দেশের মানুষ । আমাদের ভাষা , সংস্কৃতি কিছুতেই মিল নেই। শুধু মিল ছিলো আমাদের আন্তিরিক বন্ধুতে। তাহিয়াদের যমজ দুই সন্তান , এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের নাম ছিলো ছুছু, আর ছেলে খাব্বাব। সুদানি নাম।ছুছু খাব্বাব ছিলো আমার মেয়ের অনেক প্রিয় । ওরা আমার মেয়ের অল্প কিছু বড় ছিলো ।তাতে তাদের কোনো অসুবিধা ছিলো না। আমার মেয়ের কানের ফুটো তাহিয়াই করে দিয়েছিলো । তাহিয়া যেহেতু আরবিতে কথা বলতো সেহেতু আমি তাহিয়াকে নিয়ে এদিক সেদিক বেড়াতে যেতাম। আমার প্রিয় বান্ধুবী কোথায় আছে জানি না। ওরও কি আমার মতো করে আমার কথা মনে আছে ? কি জানি এতো বছর আগের কথা মনে না থাকাই স্বাভাবিক । এই সময় সুদানের গৃহ যুদ্ধ চলছে খবরে শুনে তাহিয়ার কথা মনে হয়ে বুকটা কেমন যেনো খাঁ খাঁ করছে।

প্রথম সন্তানকে নিয়ে মায়েদের একটু বেশী আদিখ্যেতা থাকে। আমারও ছিলো মেয়ে তিন্নির বয়েস তখন আড়াই বছর বয়েস। আমার সখ হলো মেয়েকে প্লে স্কুলে পাঠাবো । তিন চার ঘণ্টার স্কুল । স্কুলের বাস এসে নিয়ে যাবে আবার স্কুল শেষে বাসায় পৌঁছে দেবে। বৃটিশ প্লে স্কুল। স্কুলের নাম ছিল “ কোরতবা নার্সারি স্কুল”। সেখানে গেলে ওর বয়েসি বাচ্চাদের সাথে খেলা দুলা করবে , কতো কি শিখবে। আমি স্কুলে গিয়ে সব খুঁজ খবর নিয়ে আসলাম । মেয়ের বাবা প্রচণ্ড বিরক্ত আমার উপর তার বক্তব্য
এতো টুকুন মেয়েটাকে স্কুলে পাঠাবার কি হোলো ?

কি জানি আমি জানি না কি হোলো কিন্তু আমার মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে । প্রথম মা হওয়াটা খুবই আনন্দের এবং সন্তানের একটু খানি প্রাপ্তি দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠা । আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। তিন্নির বাবার চরম কপাল কুঞ্চিত উপেক্ষা করে আমার মেয়ে আমার আগ্রহে প্লে স্কুল শুরু করলো । মিসেস পেট বৃটিস টিচার রোজ বাস থেকে নেমে তিন্নিকে কোলে করে বাসে নিয়ে বসাতেন। প্রথম দুদিন স্কুলে যাবার সময় কাঁদলো ।আমিও কাঁদলাম সারাদিন মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে । ফিরে আসার বাস আসার আধা ঘণ্টা আগে আমি আমার কাজের মেয়েটাকে নিয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। আধা ঘণ্টা পর বাস আসলো । মিসেস পেট আবারো কোলে করে মেয়েকে নামালো । মেয়ে আমার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো ।

এভাবে ছয় মাস প্লে স্কুলে যাবার পর আর মেয়েকে স্কুলে পাঠালাম না। ওর তখন তিন বছর হয়ে গেছে। ভাবলাম চার বছর হলেতো নিয়মিত স্কুলেই যেতে হবে থাক মেয়েটা এখন আমার সাথেই থাকুক খেলা ধুলা করুক। ছয় মাস পর আমার স্বামীর আবার ছুটির সময় এলো। আমাদের কাজের মেয়েটারও কন্টাক্ট শেষ করে দেশে ফিরে যাবার সময় এসে গেলো । তাকে দেশে পাঠিয়ে দিয়ে , নতুন কাজের মানুষ আনার ব্যবস্থা করে আমরাও বেড়িয়ে পরলাম দেশে বিদেশে ঘুরতে। দেশে কিছুদিন থেকে চলে গেলাম রোম , প্যারিস , লন্ডন ঘুরতে। ছোট মেয়েটাও ঘুরলো সব জায়গাতে কখনো ক্লান্ত হয়ে বাবার কোলে চড়ে , কখনো স্টলারে বসে। আমরা প্যারিসে আইফেল টাওয়ারের উচ্চতা দেখলাম অবাক বিস্মিত হয়ে। অনেক ঘুরা ঘুরি করে শরীরে ক্লান্তি ও মনে আনন্দ নিয়ে ফিরে এলাম নিজেদের জায়গাতে। যখনি নানা দেশে গেছি সংগ্রহ করেছি কিনেছি আমার পছন্দের জিনিষ ঘর সাজাবার জন্য।

সময় চলতে লাগলো সময়ের গতিতে। নতুন কাজের মেয়েটাকে মানিয়ে গুছিয়ে নিলাম। মেয়েকে ভর্তি করলাম বৃটিশ স্কুলে। স্কুলের নাম ছিলো “ গালফ ইংলিশ স্কুল “। আমার ব্যস্ততাও কিছুটা বেড়ে গেলো । স্কুল বাস আসার আগেই মেয়েকে ঘুম থেকে উঠিয়ে জোর করে কিছু খাওয়ানো , স্কুলের নির্ধারিত ড্রেস পড়িয়ে বাসে উঠিয়ে দেয়া। যদিও শ্রীলংকার মহিলা করুনা ( মহিলার নাম) সারাক্ষণই আমাকে সাহায্য করে যেতো মেয়েকে রেডি করার সময়। মহিলাটি আমার চাইতে বয়েসে অনেকটাই বড় ছিলো তাই তার বুদ্ধি বিবেচনাও অনেক ভালো ছিলো । তার ধারনা ছিলো সে আমার চাইতে অনেক বেশী জানে বাচ্চাদের ব্যাপারে । কারন তার আমার চাইতে অভিজ্ঞতা বেশী ।

আমার মেয়ের যখন সারে চার বছর বয়েস তখন আমার কোল জুরে এলো আমার পুত্রসন্তান। হসপিটাল থেকে আসার পরে করুনা ওকে কোলে তুলে নিয়েছিলো । আমার ছেলে হওয়ার, সময় আমার আব্বা আম্মা এসেছিলেন আমার দেখাশুনা নাতি নাতনীদের দেখা শুনা করতে।

আমি করুনার কোলে আমার ছেলেকে তুলে দিয়ে আমার যেনো কেমন একটা অনুভূতি এলো করুনার উপর নির্ভর করতে পারবো আমার বাচ্চার দেখা শোনার ব্যাপারে । যদিও আব্বা আম্মা ছিলেন । হসপিটাল থেকে আসার দুদিন পর আমার প্রচণ্ড জ্বর এলো। জ্বরে আমার সারা শরীর কাঁপছিলো । আমার এমন জ্বর আসাতে আমার স্বামী , আম্মা, আব্বা খূব ঘাবড়ে গেলেন । কারন তার কিছুদিন আগেই বোম্বের নায়িকা স্মিতা পাতিলের মৃত্যু হয় বাচ্চা হবার কয়েকদিনের মাঝেই প্রচণ্ড জ্বর এসে। সে চিন্তায় সবাই অস্থির হয়ে গেলো । আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হোল । আম্মাও আমার ছেলেকে নিয়ে আমাদের সাথে গেলেন ।

আমাকে সাথে সাথেই হাসপাতালে ভর্তি করে ফেলা হোলো ।বলা হোল বাচ্চা আমার সাথে রাখা যাবে না । আগে আমার নানা রকমের পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে হবে কি সমস্যা । ডাক্তার চাইলেন না আমার কোন ইনফেকসান বাচ্চাকে আক্রান্ত করুক। আমার চার দিনের বাচ্চাকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দেয়া হোল । আমি কান্না ধরে রাখতে পারলাম না। সাথে সাথে আম্মা ও আমার স্বামীর চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো । বিকেল হতে না হতে হাসপাতালে বন্ধু বান্ধবের ভিড় জমে গেলো । আমাকে নিয়ে সবার ভাবনাতে এলো আমারও হয়তো স্মীতা পাতিলের মতো কিছু একটা হয়েছে। যাহোক ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় জ্বর মুক্ত হয়ে আট দিন পরে ঘরে ফিরে আমার শিশু সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পরলাম।

ম্যাল্টন, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles