16.1 C
Toronto
বৃহস্পতিবার, মে ২৩, ২০২৪

মন পাখী..

মন পাখী..

 

- Advertisement -


ছোটবেলায় আমি নৌকার মাঝি হতে চেয়েছিলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি একদিন মাঝিই হবো। কেনো মাঝি হতে চাইতাম সেটা বলি। শৈশবে প্রতিবছরই মায়ের সাথে নৌকায় চড়ে ঢাপরকাঠি যেতাম। দুই তিন মাস পর আবার ঢাপরকাঠি থেকে ধান চাল,ডাল, পিঠা, নাড়ু নিয়ে বরিশালেৱ বাড়িতে ফিৱতাম। দিনভর নৌকায় থাকতাম। নৌকার মধ্যেই সব কিছু থাকত। খাওয়া, দাওয়া, বিছানা। তখনকার নদীগুলো ছিল ভর ভরন্ত। বড় বড় ঢেউ উঠত নদীতে। যখন নৌকার পাশ দিয়ে লঞ্চ যেতো অনেকক্ষন দুলত ছোট্ট নৌকা। মাঝি কৌশলী হাতে নৌকাকে ঢেউয়ের হাত থেকে রক্ষা করত। উজানের সময় মল্লারা দাড় টানত। ঝকঝকে রোদ পড়ে মাল্লাদের খালি গা চকচক করত, ঘাম ঝরত পিঠ বেয়ে। মাঝি তখন আবদুল আলীমের গান ধরত গলা ছেড়ে,..মন পাখী তুই আর কতকাল থাকবি খাঁচাতে, ও তুই উড়াল দিয়া যারে পাখী বেলা থাকিতে.. বা মেঘনার কুলে ঘর বান্ধিলাম…এইসব গান। মাঝিদের আমার খুউব স্বাধীন মনে হতো। কোথা থেকে কোথায় চলে যায়। আজ এখানে কাল ওখানে। প্রতিনিয়ত জায়গা বদল একটা নেশার মতো। আমার মধ্যে যে একটা বাহেমিয়ান মন আছে সেটা আমি তখনই টের পেয়েছিলাম। তাই শুধু ঘর থেকে বের হয়ে পড়তে চাইতাম। যেনো আমিও মাঝি।
একদিন নৌকা ছেড়ে আমরা লঞ্চে ঢাপরকাঠি আসা যাওয়া শুরু করলাম। সারেং যেখানে বসে প্রায়ই সেই ককপিঠ থেকে একটু দূৱে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে দেখতাম কিভাবে সাৱেং লঞ্চটাকে দক্ষ হাতে পরিচালনা করে। ছোট্ট লঞ্চ। দোতলায় প্রথম শ্রেনীর যাত্রীরা বসত। পিছনের জায়গাটা একটু উচুমতো ছিল, ওখানে অনেকে নামাজ আদায় করতে পারত। মা বসতেন দোতলায়। মহিলাদের জন্য ছোট্ট একটু বসার ব্যবস্থা ছিল। আমাকে বারবার বলত, জসিম বাইরে যাইসনা, পড়ে যাবি। মা খুউব ভয় পেতো। কিন্তু আমি পানি, নদী, খাল কখনও ভয় পেতাম না। আমি ছিলাম আসলে মাছ প্রজাতির। পানিতেই আমার বেশি সময় কাটত। চোখ লাল না হলে পানি থেকে উঠতাম না। কোনো সাবান ছিল না গায়ে মাখার। যখন পানি থেকে মা টেনে তুলত দেখা যেতো গা গতর কাদায় মাখামাখি। সারেং দু’হাত দিয়ে হুইল ঘুরিয়ে লঞ্চটাকে এদিক ওদিক করত আমি চেয়ে থাকতাম। ইঞ্জিনরুমে ঘন্টা বাজিয়ে লঞ্চটাকে ব্যাকগিয়ার দিয়ে পিছনে নিত। দারুণ লাগত আমার কাছে। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি মাঝি না হয়ে সারেং হবো। বড় হয়ে আমি জাহাজে চাকৱি কৱব। এক দেশ থেকে আর এক দেশে ঘুরে বেড়াবো। পারি দেবো অকুল সমুদ্র। নদী, সমুদ্র হবে আমার ঘর বাড়ি।


যখন একটু একটু বড় হতে লাগলাম আকস্মিক আমার জগতটা বদলে গেলো। আমি নিজেকে খুবই নিৰ্জণ এক মানুষ আবিস্কার করলাম। তখনও আমি কৈশোরে পা দেইনি। আমি নিজের মধ্যে আলাদা এক আমিকে খুঁজে পেলাম। যখন আমার বয়স সাত আট তখনই আমি লুকিয়ে গল্পের বই পড়া শুরু করি, স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখি। মেয়েদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকি। স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে কয়েকবার মায়ের হাতে মার খেয়েছি। তখন থেকেই আমার মধ্যে একটা স্বাধীন সত্ত্বা গড়ে উঠেছিল। আমার সাথে কেউ নেগেটিভ আচরন করলে বা নেগেটিভ কিছু বললে আমি খুব অপমানিতবোধ করতাম। আমার অপমানবোধ খুউব তীব্র। আমি কারো শাসন পছন্দ করতাম না। কেউ আমাকে কন্ট্রোল করুক এটা আমি চাইতাম না। এসব আমি ঘৃনা করতাম। আমার সবসময় মনে হতো আমি দূরে কোথায় চলে যাব যেখানে কেউ আমার ভুল ধরবে না, অভিযোগ করবে না। যেখানে মা থাকবে না, ভাইবোন থাকবে না, আত্মীয়, বন্ধু ওসব কিছু থাকবে না। আমি হবো আমার বন্ধু। আমাকে আমি ছাড়া কেউ বোঝে না।

এখনও আমার এমন মনে হয়। আমার মন সবসময় রেডি থাকে। যে কোনো সময় ঘর হতে বের হয়ে পড়ব এমন মনে হয়। সংসার অসহ্য হয়ে উঠে মাঝে মাঝে। আমার কখনও সংসারে বন্দী হওয়ার কথা ছিল না। বিয়ে, প্রেম, নারী, সন্তান এসব আমার জন্য না। এসব নিয়ে আমি কখনও ভাবিনি। কিন্তু আমি যা চাইনি তাই ঘটেছে আমার জীবনে। নিয়তিকে অনেক সময় খন্ডানো যায় না। আমার কখনও এতো দ্বায়িত্বের বোঝা মাথায় নেওয়ার কথা ছিল না। আমি এমন সম্পৰ্ক কখনও চাইনি যে সম্পৰ্ক কোনো সুখ দিতে পারে না। বেশি মানুষের সাথে মাখামাখি শেষ পৰ্যন্ত কিছুই দিতে পারে না। বেশি মানুষের সাথে সম্পৃক্ততা নিজস্বতা নষ্ট করে। এসব আমি কখনও চাইনি। আমি পৃথিবীতে কারো শাসন, কারো এডভাইস, নিয়ন্ত্রণ এসব পেতে আসিনি। আমি স্কুল থেকেই বই এবং সিনেমাপোকা হয়ে গিয়েছিলাম এই কারণেই। শিক্ষকদের শাসন আমি পছন্দ করতাম না। সিনেমা দেখার পয়সা থাকত না বলে আমি সিনেমার হলের গেটকীপার পৰ্যন্ত হতে চেয়েছিলাম। তাহলে আমি ইচ্ছামতো সিনেমা দেখতে পারব। বাস্তবের জটিল জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই অন্য এক জগতে ডুবে থাকতে চাইতাম।


ছোটবেলা থেকে এমনি অদ্ভুত অদ্ভুত সব স্বপ্ন ছিল আমার। আমার কখনও তেমন বন্ধু ছিল না। আমি সবসময় একলা ছিলাম। বস্তুত এখনও আমি একলা। প্রকৃতপক্ষে কেউ কাউকে বোঝেনা। কেউ কারো বন্ধু না। বোঝে না বলেই সম্পৰ্ক ভেঙ্গে যায় তুচ্ছ কারণে। আত্মীয়তা ভেঙ্গে যায়, বন্ধুত্ব ভেঙ্গে যায়, সংসার ভেঙ্গে যায়। মানুষ খুবই স্বাৰ্থপৱ। মানুষ খুবই নিষ্ঠুৱ। বিশ্বাসের, ভালবাসার কোনো জায়গা নেই। আমি যে রকম পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি সে রকম পৃথিবী আমি পাইনা। তাই এই পৃথিবীর একজন হয়েও আমি পৃথিবীর কেউ না। কোথায় গেলে মানুষ পাব, কোথায় গেলে ভালবাসা পাওয়া যাবে এই আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়া কঠিন। নিজের অশান্ত মনকে শান্ত করার জন্য কত জনের কাছে ছুটে গেছি কিন্তু কোথাও আত্মার তৃপ্তি ঘটেনি। নিজেকে ভুলে থাকার জন্য,পৃথিবীর নানা যন্ত্রনা আর জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য লেখালেখিও আমাকে মুক্তি দিতে পারেনি। সমস্যা আমার নিজের মধ্যেই। মানুষ নিয়ে যত সমস্যাই থাকুক, মানুষই আনন্দ দেয়, মানুষইতো ভালবাসে। সোশ্যাল মিডিয়া আরো বেশি মানুষের জীবন যন্ত্রণার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। একসময় এসব কিছুই ছিল না। ফেসটাইম ছিল না, হোয়াটসএ্যাপ, টুইটার, ফেসবুক, টিকটক ছিল না। তখনও জীবন চলেছে। জানি সহজে এসব থেকে মুক্তি মিলবে না তাই মুক্তির উপায় খুঁজি। আবদুল আলীমের গানের মতো বলতে হয় মন পাখী তুই আর কতকাল থাকবি খঁচাতে…

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles