-7.3 C
Toronto
শনিবার, ফেব্রুয়ারী ৪, ২০২৩

জল

জল
ছবিক্রিস্টোফার রোলার

আচ্ছা এই জুতোটা ঠিক আছে?
আমাকে জিজ্ঞেস করছেন!
দোকানে তো আমরা তিনজন মানুষ। উনি বিক্রি করছেন। আমি কিনছি। আর আপনি অপেক্ষা করছেন। তিনজনের মধ্যে আপনি নিরপেক্ষ। তাই আপনার মতামতটা জানতে চাচ্ছি।
খারাপ না, নিতে পারেন।
ভাই এটা প্যাক করে দেন।

আশ্চর্য ধরনের মেয়েরে বাবা। একা একা কোন মেয়ে নিউমার্কেটে আসে? একা, তারপরও চোখে মুখে রাধাপদ্ম হাসির ঝর্ণা। হঠাৎ তাকালে মনে হবে চোখের ওপর যেন প্রজাপতি বসে আছে। ইচ্ছে হলেই চোখ দুটো উড়ে যেতে পারে নীল আকাশে।
দোকানদার জুতো প্যাক করে বিল তৈরি করছে। এমন সময় ক্রেতা একটু এগিয়ে এসে অপেক্ষমাণ মেয়েটিকে বলল, আপনার নামটা কি জানতে পারি?
কোন সঙ্কোচ না করেই ও বললো, জল।

- Advertisement -

ব্যাপারটা খুব খারাপ হয়ে গেল। নিজের পরিচয় না দিয়ে অন্যের নাম জিজ্ঞেস করা অভদ্রতা। আমার নাম উপমা। আমাদের সূর্যসেন হলের এক বড় ভাই আমাকে ডাকেন উপমা ঠাকুর। নামটা আমার লম্বা চুলের সাথে যায় ভালো, তাই না!
যাইহোক, এবার আপনার পালা। আপনার জুতো কিনতে আমার মতামত চাইলে অপেক্ষা করতে পারি।
জল নামের মেয়েটি বললো, নাহ দরকার হবে না। আমি জুতো কিনতে আসিনি। ফেরত দিতে এসেছি।
স্যার এই যে আপনার বিল।

জুতোর প্যাকেট হাতে নিয়ে উপমা টাকা গুনতে লাগলো। দুই তিনবার গোনার পরও পাঁচ টাকা সর্ট। আজকাল পাঁচ টাকা কোন টাকাই না। দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়ছে। চিনি এখন ছয় টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাতে মোড়ানো অক্টোবর ১২, ১৯৭৩ সংখ্যার দৈনিক ইত্তেফাক। তাতে ‘জীবন যাত্রা ব্যয় ভার’ শিরোনামে লিখেছে বিগত দুই বৎসরে নাগরিকদের জীবন যাত্রার ব্যয় শতকরা সোয়া দুইশত ভাগ বৃদ্ধি পাইয়াছে। কিন্তু এতসব ভাবলে কি জুতো কেনা যাবে। পত্রিকা আড়াল করে জলের কাছে সরাসরি প্রশ্ন করে বসল; আপনার কাছে কি পাঁচটা টাকা হবে?
এমন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না জল। তবুও ব্যাগ খুলে এক টাকার পাঁচটা নোট দিয়ে বলল, এই নেন।

ঠিক যা ভাবা হয়েছিল তাই। টাকা পয়সা নিয়ে মেয়েটির অতো ভাব নেই। ভাবনা জগতের লোক বলেও তাকে মনে হলো না। টাকা আছে তো দিতে অসুবিধা কোথায়। হাসতে মানা নেই তাই সারাক্ষণ হাসলে দোষ কী?

উপমা হাত বাড়িয়ে টাকা নিয়ে বলল, আমি কিন্তু ধারটার নিচ্ছি না। ধার হলে ফেরত দেবার ব্যাপার-স্যাপার আছে। নাম ঠিকানা লাগবে। ইত্যাদি ইত্যাদি। আরও বলল, নাটকীয় সংলাপের মতো শোনাবে তবুও মনে করেন কিছুটা আমার টাকায় এবং কিছুটা আপনার টাকায় জুতো জোড়া কেনা হলো। আমি যত ক্রোশ পথ অতিক্রম করবো আপনার অবদান থাকবে তাতে। মনে করতে পারেন আমার চলার শক্তি হবেন আপনি।

জল এতক্ষণ বসেছিল। দাঁড়িয়ে বলল, এই যে এইমাত্র যা যা বললেন সেটাই নাটকের সংলাপের মতো শোনালো। চোখে চোখ রেখে বলল, সিকোয়েন্সটাও কিন্তু কাঁকতলীয় ভাবে নাটকের মতো। আপনি নতুন জুতো কিনলেন, আর আমি জুতো ফিরিয়ে দিতে এসেছি। দুইজন দুই মেরুর লোক বুঝলেন! দুই মেরুর লোক কখনো শক্তি হয় না। মানুষের জীবন চুম্বকের নিয়মে চলে না।

মনে হলো কথাগুলো বলা হয়েছিল পাঁচশো বছর আগে কিন্তু এখনো জল’কে ঘিরে নীরব খিলখিল একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে আছে।

উপমা বলল, আপনার হাসি দেখে মনে হয় বাড়িতে বুঝি একটা হাসিশালা আছে। ভীষণ অন্য রকম করে হাসতে পারেন আপনি। আমার হাইপারমেট্রোপিয়া আছে। তাই ছোট বেলা থেকে আমার চোখে চশমা। লক্ষ্য করে থাকবেন চশমা পরা লোকেরা খুব বেশি হাসে না। তবুও আমি হেসে হেসে কথা বলতাম। একদিন আয়নাতে দেখলাম হাসলে আমাকে খুব বিশ্রী লাগে। সেদিন থেকে হাসা বন্ধ করে দিয়েছি। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে ভালোই করেছি। সকলের হাসার অধিকার নেই।
জল বললো, আপনি একটা বাকবাকুম। সেই থেকে কিসব বলে যাচ্ছেন।

উপমা বলল, হাতে পয়সা থাকলে নভেলে গিয়ে আপনাকে একটা আইসক্রিম খাওয়াতাম। আপনি সেটা ডিজার্ভ করেন। কিন্তু হাতে পয়সা যেমন নেই, সময়ও নেই। দৈনিক ইত্তেফাকের গায়ে টোকা দিয়ে বলল, একটা ইন্টার্ভিউ দিতে যাচ্ছি। দোয়া করবেন যেন চাকরিটা হয়ে যায়। আজ চাকরি হয়ে গেলে তাতেও আপনার ভাগ থাকবে। দোয়ার অংশটুকু।

উপমা চাকরিটা পেয়েছিলো। সেই চাকরির ট্রেনিং এর সুবাদে একবার বিদেশে এসে আর ফিরে যায় নি। দেখতে দেখতে পঞ্চাশ বছর চলে গেল। বহু দেশ দেখেছে সে। বহু পথ হেঁটেছে। দেশে বিদেশে, সমুদ্র সৈকতে অহেতুক হেঁটে বেড়ায় যখন ইচ্ছে হয়। এখন ইংরেজি ফরাসি দুই ভাষাতেই বাকবাকুম। কবি হিসেবে দারুণ খ্যাতি পেয়েছে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘জল’। দেশে এলে বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসে, একবার নিউমার্কেটে আসবেই। জুতোর দোকানগুলোর কাছে তার আসা চাইই। আগামীকাল ফিরে যাচ্ছে প্যারিস। সে কারণে অতিরিক্ত দুই চক্র দিল নিউমার্কেটের ভেতর। নাহ! কোন কাজ হলো না। কেউ কি পঞ্চাশ বছর ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে? তবুও উপমা সেটাই আশা করে বসে আছে। মোড় ঘুরলে দেখা হয়ে যেতে পারে এমন সুনীল ইচ্ছে তার।

এবার সবকিছুর যোগফল বের করা দরকার। প্রথমত: মেয়েটির মুখে সারাক্ষণ হাসি লেগে ছিল। তার সাথে যোগ করা যায় সে খুব সাহসী এবং উদার মনের মানুষ। প্লাস, প্রজাপতির মতো চোখ ছিল তার। এর সাথে যোগ করা যায়, অল্প সময়ের মধ্যে সে উপমাকে সুন্দর একটা নাম দিয়ে দেয়, বাকবাকুম। তাহলে এসবের যোগফল কী দাঁড়াল। যদিও বাকী রয়ে গেল জলের মহিমান্বিত কণ্ঠ। যা পাঠক সমাজ কোনদিনই বুঝতে পারবে না। কেননা সেটা পাঠ করে জানার মতো কিছু নয়, কণ্ঠ শোনার জিনস।

অন্ধকার হয়ে গেলে আজকাল উপমা ঠাকুরের দেখতে খুব অসুবিধে হয়। বেশ ভারি কাঁচ বসানো চশমা পরে থাকে। হাঁটেও কিছুটা টেনে টেন। আশা করে না আর কোনদিন দেশে আসতে পারবে। প্যারিসের নুউই সুর সেন অভিজাত এলাকায় সে বাস করে, একা। সরু সরু পাইন গাছের নিচ দিয়ে হেঁটে চলার সময় মাঝে মাঝে উপমা ঠাকুরের পায়ের নিচ থেকে খিলখিল একটা আওয়াজ ভেসে ওঠে। যেন কেউ ওকে বলছে, এই যে বাকবাকুম, এক জুতো দিয়ে আর কতদিন চালাবেন! উপমা ঠাকুর তখন জুতোর দিকে তাকিয়ে চকচক ভাবটা আবিষ্কার করার চেষ্টা করে। আশেপাশে লোকজন থাকলে চুপচাপ হাঁটাহাঁটি করে। কেউ না থাকলে চলে যায় রবীন্দ্রশালায়।

চলে যায় দিন, যতখন আছি। পথে যেতে যদি আসি কাছাকাছি
তোমার মুখের চকিত সুখের হাসি দেখিতে যে চাই..
এর কিছুদিন পরের ঘটনা। থাক! সেই করুন দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়া ঠিক হবে না। তবে, যতটুকু বলা যায় তা হলো, তার কণ্ঠ নিঃসৃত শেষ বাণী ছিল

ফাগুনের ফুল যায় ঝরিয়া …… ফাগুনের অবসা….
পাইন গাছ সাক্ষী। উপমা ঠাকুরের চোখে সেদিন জল এসেছিল।

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles