5.6 C
Toronto
মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৬, ২০২২

ভ’তে ভালোবাসা

ভ’তে ভালোবাসা
ছবি/ মোহাম্মদ নোহাসি

আমার অসুখ হলে তোমার মন খারাপ থাকে। আশেপাশের লোকজন এসে বলে চলেন কফি খেয়ে আসি। কেউ বলে লঙ ড্রাইভে যাবেন? যশোর টু ঢাকা। তুমি সেসব কানে তোল না। তোমার মন তখন আরো বেশি খারাপ হয়ে যায় এই ভেবে যে আমি কালো কফি খেতে পারছি না। ইচ্ছে করলে গাড়ি নিয়ে বের হতে পারি না। তুমি চিমটি কাটো। কথা সত্য হয়। তুমি সারা রাত জেগে থাকো মশারীর নিচে। আমার অসুখ হলে তোমার একদিন হয়ে যায় সাতদিনের সমান। রাত দিনের খোঁজ থাকে না মন খারাপের দিনে।

তুমি থাকো যশোরে। স্কুলের বড় আপা নাম হয়েছে তোমার। আমি পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনের একজন সমাজসেবক। আমাদের দেখা হয় না চব্বিশ বছর। আফ্রিকার কোন কাজল সুন্দরী কেন আমার সঙ্গী হলো না সে কথা অনেকেই জিজ্ঞেস করে।

- Advertisement -

তোমাকেও সেই ধনী ব্যবসায়ী বিয়ে করতে পারলো না। ছাত্রী অবস্থায় তুমি টিউশনি করতে। টিউলিপ নামের তোমার ছাত্রীর বাড়িতে হঠাৎ বড়লোক হয়ে ওঠা এক আত্মীয় এসে হাজির। তোমাকে দেখলে কে না পছন্দ করবে। তুমি চুল খুলে রাখতে। লজ্জা পেলে মাটির ওপর তোমার চোখ গড়াগড়ি করতো। হাসি দিতে দু’বার করে। একবার হাসির জন্য হাসি অন্যবার হাসির রেশ ধরে রাখার জন্য আরেকটি হাসি। আমি বাঁধা হয়ে আছি জানতে পেরে টিউলিপের আত্মীয় আমার মুখে বস্তা পেঁচিয়ে নদীতে ফেলে দিয়েছিল। তোমাকে বিয়ে করবে বলে কাজী নিয়ে এসে দেখে তুমি পালিয়ে গেছ।

এসব জেনেছিলাম ঘটনার পাঁচ বছর পর। নদী থেকে উদ্ধার করে হাঁসপাতালে নিয়ে গেলেও পুনরায় কথা বলতে শুরু করি পাঁচ বছর পর। যাক, এসব কোন কথা নয়। ইচ্ছে করলে সমস্ত জীবন আমরা একসাথে থাকতে পারতাম। কিন্তু তুমি বিপ্লবী হয়ে গেলে। সামাজিক প্রথাকে ঘৃণা করতে শুরু করলে। গায়ে হাত দেওয়া আর মনে হাত দেওয়া দুটোই তোমার চোখে অশ্লীলতা। মানুষের ইচ্ছের বিরুদ্ধে অনাচারীদের জয়ী হবার সামাজিক দুর্বলতাকে সমর্থন করলে না। মনেরও বলৎকার হয় সে বোধ মানুষের মধ্যে জাগানোর জন্য আজীবন সংগ্রামে নামলে। একটা মাত্র জীবন, এমন অত্যাচার সহ্য করে কেন বাঁচতে হবে সে কারণে তুমি সখ হীন হয়ে গেলে। দীর্ঘদিন মাস্টারি করে তোমার ধারণার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তিও খুঁজে পেলে। তুমি দেখলে ইচ্ছে পূরণের পক্ষে কোন পাঠ নেই পাঠ্যপুস্তকে। ভ’তে ভালোবাসা এমন কথা পাঠ্যপুস্তকে লেখার সাহস নেই দেশের কোন লেখকের। তুমি বলতে শুরু করলে, বাংলা বর্ণমালার প্রথম অক্ষর ‘অ’ হবার কোন যুক্তি নেই। প্রথম বর্ণ হবার কথা ছিল ‘ভ’। সে কারণে শুধু অংক বিজ্ঞান ইতিহাসের ওপর গড়ে উঠেছে আমাদের সমাজ।

একবার নদীর রচনা লিখতে গিয়ে ক্লাস ফাইভের একটা মেয়ে লিখেছিল, নদী নিয়ে কিছু লেখা যায় না কাগজে। লিখতে গেলে কাগজ ভিজে যায়। তুমি সেই ছাত্রীর গালে চুমু খেয়েছিলে। বলেছিলে আমাদের দেশে কবে সেই পরীক্ষক জন্ম নেবে যে বুঝতে পারবে রচনা হলো তুমি যেভাবে যা চিন্তা করো তাই। এতে ঠিক বেঠিক বলে কিছু নেই। আর একবার বাদশাহ আকবরের যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস পাঠকে প্রশ্নবিদ্ধ করে একজন ছেলে বাদশাহ আকবরের যুদ্ধ জয় কতটা জরুরী ছিল এমন প্রশ্ন করেছিল। তখন তুমি ছেলেটিকে ধন্যবাদ দিতে গিয়ে বলেছিলে, ধন্য করলে তুমি। উপসংহারে বলেছিলে এই সমস্ত রাজা বাদশাহদের বীরত্ব পড়ে পড়ে সমাজের অনেক আকবর বাদশাহ জন্ম নিচ্ছে। কাকতালীয় ভাবে টিউলিপের ধনী আত্মীয়ের নামও ছিল আকবর।

তোমার সাথে হাঁসপাতালে যেদিন প্রথম কথা হলো তুমি সেদিন বলেছিলে মনে মনে ভালবাসতে পারবে? সেদিন বলেছিলে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ আমি পছন্দ করি না। মনে মনে ভালবাসলে আজীবন আমি তোমার। সেই থেকে সবকিছু মনে মনে চলছে। তোমার বিপ্লবে সাথী হলাম আমি। দূরে থেকেও থাকি কাছে। যাকে খুশি তাকে ভালবাসবো তা নিয়ে তত্ত্বকথা, উপদেশ থাকবে কেন। এই সিদ্ধান্তে তোমার সাথে সন্ধি করলাম। তাইতো এখনো আমার কষ্টের দিনে তুমি কষ্ট পাও। সিয়েরা লিওনের গ্রামে পুঁতে রাখা মাইনে আমার একটা পা উড়ে গেলে তুমি যশোর থেকে ঢাকায় এক শাড়িতে খালি পায়ে হেঁটে এসেছিলে। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিল এখন তো আপনার বিয়ে করে একসাথে থাকতে পারেন, সেটা করছেন না কেন? তোমার কথা পত্রিকায় ছাপা হয়ে যাবে সেটা জেনেই বলেছিলে, আমরা যে আপনাদের দেওয়া সাজা খাটছি সেটা বুঝবেন কী করে? কী করে একটা লোক আমাকে বিয়ে করার প্রস্তুতি নিয়ে হাজির হতে পারে যাকে আমি এক সপ্তাহ আগেও চিনতাম না! আপনাদের কাছে বিয়ে মানে তো শরীর শরীর খেলা। এটা মানি না বলেই বিপ্লব করে যাচ্ছি।

এবার সামান্য সর্দি-জ্বর হয়েছিল তবুও এক সপ্তাহ ভুগলাম। এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছি। ইচ্ছে করলে তুমি যেকোনো রেস্টুরেন্ট গিয়ে এক কাপ কালো কফি খেয়ে এসো। জানালাটা খুলে রেখো। একটা পাখির মুখে আদর দিয়ে পাঠিয়েছি। আর হ্যাঁ, গলায় আঁচল পেঁচিয়ে রেখো। আমার সর্দি-কাশি তোমাকে যেন ছুঁতে না পারে।

আমি জানি এবার তুমি কী করবে। এবার হয়তো যশোরের মাটিতে গজিয়ে উঠবে বিরাট আকারের এক তুলসী বাগান। নয়তো, নীম পাতা গরম জলে ভিজিয়ে প্রকৃতির মাঝে ছড়িয়ে দেবে বিচ্ছেদের ঘ্রাণ। কাঠ আর আগুনের মাঝে চলবে বিসর্জনের কান্না। মুখে বস্তা পেঁচিয়ে খুব উঁচু থেকে নদীতে ফেলে দিলে যেরকম শব্দ হয় তুমি তা বারবার শুনতে চাও। আমিও শুনি আমার পড়ে যাওয়ার শব্দ।

স্কারবোরো, অন্টারিও, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles