টরন্টোর ডাউনটাউনে রিমেম্বারস ডে

টরন্টোর ডাউনটাউনে রিমেম্বারস ডে - the Bengali Times
সেদিন ১১ই নভেম্বর রিমেম্বারস ডে কাজ করছিলাম ডাউনটাউনে

সেদিন ১১ই নভেম্বর রিমেম্বারস ডে, কাজ করছিলাম ডাউনটাউনে। টিভির একটা সিরিজের কাজ চলছিল। সকাল থেকেই হালকা তুষারপাত হচ্ছিল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে যখন বাইরে তাকাচ্ছিলাম, সময় যত বাড় ছিল তুষারপাতের পরিমাণও বাড়ছিল । দেখে অস্বস্তি লাগছিল । ঠিকঠাক মত বাড়ি ফিরতে পারবো তো! মাথার ভেতরে এই ভাবনা কাজ করছিল।  সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ার পরও আমাদের কাজ চলল ।

একটি বড় ঘড়ির সামনে সময় থমকে ছিল। বিভিন্ন সময়ের মৃত মানুষরা জমা হয়েছে সেই ঘড়ির সামনে।

- Advertisement -

গৃহবধূ, ডাক্তার, উকিল, বাচ্চা, কে নেই এখানে। আমি ছিলাম আঠারোশ শতাব্দীর একজন নার্স। আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল বর্তমান সময়ের একজন স্ট্রিপার, বেশি পয়সা পাওয়া লোভে যে কাস্টমারের সাথে গিয়েছিল। কিন্তু শরীর ভোগ করে পয়সা না দিয়ে হত্যা করেছে তাকে।  ছিল জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী, মুদির দোকানদার, খেলোয়াড়।  একটি বাচ্চা খেলোয়ার যে এখনো জানেনা সে মারা গেছে। টিমের সাথে যাচ্ছিল খেলতে অথচ গাড়ি এক্সিডেন্টে তার মৃত্যু হয়েছে । সে এখনো বিশ্বাস করে সে খেলতে যাচ্ছে । পৃথিবীর সমস্ত পেশার মানুষ বিভিন্ন সময়ের মানুষ থমকে গেছে একটি ঘড়ির সামনে। এবং সবারই লক্ষ্য একটাই সিংহাসনে বসা যখনই কেউ বসে পড়ছে, সেটা দখল করার জন্য সবাই ছুটে যাচ্ছে। দুর্ঘটনা এবং স্বাভাবিকভাবে মৃত্যু হওয়া বিভিন্ন সময়ের অনেক অনেক মানুষের ভিড় ।

একটি দৃশ্য ধারণের জন্য কয়েকটা দিন ব্যয় হয়ে যায় একই রকম মেকাপে দিনের পর দিন কাজ করতে হয় । মৃত মানুষের ভিড়ের এই কাজটি ছিল সে বছরের শেষ কাজ।

পরের বছর বিশ সাল করোনার জন্য, মৃত্যুর মিছিল লেগে যাবে এমনটা ভাবিনি সে বছর আমাদের কাজগুলো একদমই কম হয়েছে ।

কাজ শেষ হলো রাত তখন সাড়ে এগরেটার বেশি বাজে। বাইরে তখন বরফের সমারোহ। ভাগ্য ভালো রাস্তায় না রেখে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ে সেদিন গাড়ি রেখেছিলাম। গাড়িটা পরিচ্ছন্ন ছিল, গাড়ি বরফে ঢাকা পড়ে নাই। পরিষ্কার করার সময় ব্যয় করতে হলো না, গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে এলাম পথে ।

রাস্তায় নেমে দেখলাম বরফ ভর্তি ডাউনটাউন । সারাদিন বরফ পরছে অথচ রাস্তা পরিস্কার হয়নি এমনটা সাধারনত হয় না। অথচ আজ তেমনই দৃশ্য পেলাম। বরফ সাফের কর্মিরা অক্লান্ত কাজ করছে।  কিন্তু সাফ করার সাথে সাথে বরফেে ঢেকে যাচ্ছে সব কিছু। শীত শুরু হওয়ার আগে এমন বরফপাত শুরু হয়েছিল সেবার।

টরন্টোর ডাউনটাউনে রিমেম্বারস ডে - the Bengali Times

হাইওয়েতে উঠে আর চলতে পারছিলাম না । প্রচুর গাড়ি রাস্তার উপর। সাথে জমে আছে এক হাঁটু পরিমাণ বরফের স্তুপ। গাড়ি এক দিক থেকে অন্যদিকে পিছলে চলে যাচ্ছে সেই বরফের উপর দিয়ে চলতে। দেখলাম অনেক গাড়ি রাস্তার উপরে, বরফের গাদায় আটকে আছে রাস্তার মাঝে। তাদের কাটাতে অন্য লেইনে যাওয়ার জন্যও খুব সাবধান থাকতে হচ্ছে। যে কোন সময় চাকা পিছলে গেলে দূর্ঘটনা ঘটে যাবে। নিজে সাবধানে চলছি। আমি সাবধান থাকলেও হবে না পিছন থেকে কেউ না, ধাক্কা দিয়ে দেয়। সেজন্য পেছনে দেখছি কেউ খুব কাছে চলে এসেছে কিনা।

নিজে সর্তক থাকার পরও সেটাই ছিল আতঙ্ক বেশি। এমন পরিস্থিতিতে কাউকে দোষ দেয়া যাবে না।  কারোরই কন্ট্রোল করার ক্ষমতা নেই গাড়ি বরফে পিছলে গেলে ।

সমস্ত স্নায়ু সজাগ রেখে সেদিনের পথ চলা ছিল।  আবার কোন কোন গাড়ি কিছুই পাত্তা না দিয়ে, জোড়ে ছুটে চলেছে সবাইকে পাশ কাটিয়ে।    স্নো টায়ার,তাদের গাড়ির চাকায় লাগানো আছে। ক্ষমতার দাপটও বটে। আজ রাতে আর বাড়ি ফেরা সম্ভব হবে না । সামনের পথ নিশ্চয়ই আরো খারাপ তাই এক্সিট নিয়ে শহরের বাড়িতে চলে গেলাম। সেখানে যেতেও অনেকটা সময় লাগলো।  পনের মিনিটের ড্রাইভ প্রায় এক ঘন্টা খানেক লাগলো। শেষমেষ ঠিকঠাক ভাবে বাড়িতে পৌঁছাতে পারলাম এটাই শান্তির। আমার পরে আরো গাড়ি এসে থামল।  মেয়ের বন্ধুও বাড়ি যেতে পারছে না বলে আজ রাত সেইফলি থাকার জন্য আমাদের বাসায় চলে এসেছে।  মাঝরাতে সেইফ থাকা জরুরী দূরের রাস্তা পাড়ি দেয়ার চেয়ে।

গত শীতে প্রচুর বরফ পড়লেও এত তাড়াতাড়ি বরফ পড়া শুরু হয়নি ।

গত তিনদিন ধরে খুব খারাপ ভাবে বরফ পড়ছে।  কাল দুবার গাড়ি পরিস্কার করলাম। গাড়ির দরজা খুলতে পারলাম না ফ্রোজেন হয়ে যাওয়ার জন্য।   বাতাসের তীব্রতায় বরফের পাহাড় জমে যাচ্ছে বাড়ির সামনে। যা পরিস্কার করার জন্য আর সময় দিলাম না। একদিন পর উত্তাপ বাড়বে। তখন ঠিক হয়ে যাবে। তবে আজকের কাজ গুলো ঘরে বসেই করতে হবে। বারেবারে আবহাওয়া সতর্কবার্তা ঘরে থাকার নির্দেশ দিচ্ছে।

প্রথম দিনের বরফপাত এতটা বরফ সাধারনত হয় না। বরফ পড়ার সাথে যখন বাতাস হয় তখন আরো ভয়াবহ রূপ নেয় খোলা প্রন্তর গুলো। গত বছর এমন ঝড়ো বাতাস খুব হয়েছিল। ঝড়ো বাতাসে এক জায়গার বরফ উড়ে অন্য জায়গায় বরফের ডিবি তৈরি করে রাখছিল। রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।  গাড়ি চলাচল করা অসম্ভব ছিল। কয়েকবার রাস্তার উপর আমার গাড়ি আটকে গিয়েছিল গত বছর । অপেক্ষা করতে হয়েছিল রাস্তা পরিষ্কার করে বেরিয়ে আসার। এবার শীতকাল না আসার আগেই তুষারপাত বেশ কঠিন ভাবেই পড়ছে যেন। পুরোটা শীতকাল তো সামনে রয়ে গেল, দেখা যাক কেমন হয় এবারের অভিজ্ঞতা।

নভেম্বর ১১ /১১ টার সময় রিমেম্বার্স ডে তে বিশ্ব শান্তির জন্য প্রার্থনা করা হয় । কিন্তু বিশ্বে শান্তি কোথায়! বিশ্ব শান্তি দিনটি ঠিক করা হয়ে ছিল কোথাও যুদ্ধ যেন না হয় সেজন্য।  একশত বছর পেরিয়ে গেল মানুষ যুদ্ধ থামায়নি।   যুদ্ধ চলছে, হিংসা হানাহানি চলছে তবু পৃথিবীতে শান্তি আসুক এই প্রার্থনা।

- Advertisement -
পূর্ববর্তী খবর
পরবর্তী খবর

Related Articles

Latest Articles