
১৯৯১ সালের জানুয়ারির শেষ কিংবা ফেব্রুয়ারির শুরু—দেশজুড়ে তখন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আমেজ। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করার তোড়জোড় চলছে। গোয়ালন্দ–রাজবাড়ী আসনে বিএনপির প্রার্থীতার জন্য গোয়ালন্দের এক নেতার অনুরোধে আমি তাকে নিয়ে গেলাম তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন ও জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাতে।
সেই সময় বেগম জিয়া গুলশানে কর্নেল (অব.) ও পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমানের বাসায় লোকজনকে সাক্ষাৎ দিতেন। পৌঁছানোর পর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। মুসাদ্দেক আলী ফালু সাহেব এসে ম্যাডামের রুমে ঢোকার নির্দেশ দিলেন। ছোট্ট এক ঘর—ম্যাডাম বিনয়ী ভঙ্গিতে কুশল জিজ্ঞেস করলেন। সুযোগে আমি বললাম, বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে হলে এমন নেতৃত্বকে মনোনয়ন দেওয়া জরুরি, যাদের এলাকায় জনপ্রিয়তা যেমন আছে, তেমনি আছে প্রভাব এবং নির্বাচন পরিচালনার আর্থিক সামর্থ্য। আমার প্রার্থী সদ্য বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন—তাঁর পক্ষে যুক্তিগুলো তুলে ধরলাম।
এই সময় হঠাৎ করে ঢুকে পড়লেন তৎকালীন এক জনপ্রিয় ছাত্রনেতা—আমাদেরই এক বন্ধু। তিনি উত্তেজিতভাবে কয়েকজনকে মনোনয়ন দেওয়ার অনুরোধ করলেন। তখন তাঁর বিরুদ্ধে ‘নমিনেশন বাণিজ্য’ নিয়ে নানা আলোচনা বাজারে ছিল, সম্ভবত যা ম্যাডামের কানে পৌঁছেছিল। তিনি কোনো ভণিতা না করে সোজাসুজি বলে দিলেন—
“তোমার কথায় আমি কাউকে নমিনেশন দেব না।”
বন্ধুটি বিব্রত মুখে বেরিয়ে গেলেন।
ম্যাডাম তখন আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি যার জন্য বলছ, যা বলছ—সব লিখে দাও।” আমি তাঁর বিজনেস কার্ডে লিখলাম—আমি উপজেলা চেয়ারম্যান, আমার সঙ্গে দশজন ইউপি চেয়ারম্যান আছেন; তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলে আমরা তাঁকে বিজয়ী করে আনব ইনশাআল্লাহ। দু’দিন পরই আমার সুপারিশ করা প্রার্থী তৎকালীন মহাসচিব আব্দুস সালাম তালুকদারের বনানী অফিসে ডেকে পাঠানো হলো এবং তাঁকে বিএনপির মনোনয়নপত্র প্রদান করা হলো।
সেটাই ছিল বেগম জিয়ার সঙ্গে আমার প্রথম ও একমাত্র সাক্ষাৎ। উল্লেখযোগ্য হলো—ম্যাডাম আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করেননি আমি বিএনপির কোনো পদে আছি কি না, কিংবা আদৌ দল করি কি না। তিনি আমাকে একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবেই সেদিন গুরুত্ব দিয়েছিলেন—এই স্মৃতিটুকুই আজো আমাকে অনুপ্রাণিত করে।
আজ এই স্মৃতি মনে পড়ছে এমন এক সময়ে, যখন দেশের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, সম্মানিত ও অভিজ্ঞ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। সত্যি বলতে, দেশের আগামী কয়েক মাসের রাজনৈতিক উত্তরণ—অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল ট্রানজিশন—এ সময়ে তাঁর মতো একজন রাষ্ট্রনেত্রীর অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও উপস্থিতি দেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।
দেশবাসীর মতো আমিও মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি—
তিনি যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে মানুষের মাঝে ফিরে আসেন,
দেশ ও জাতিকে তাঁর অভিভাবকসুলভ দায়িত্ব পালনের শক্তি আবারও দান করেন।
স্কারবোরো, কানাডা

