
ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন এমন এক চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, ফাইজার ও মডার্নার এমআরএনএ (mRNA) প্রযুক্তিনির্ভর ভ্যাকসিন শুধু সংক্রমণ প্রতিরোধেই নয়, বরং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এমনভাবে সক্রিয় করে তুলতে পারে, যা টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়ক হতে পারে।
‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা হিউস্টনের এমডি অ্যান্ডারসন ক্যানসার সেন্টার এবং ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার একদল বিজ্ঞানী। তারা দেখেছেন, ফুসফুস ও ত্বকের ক্যানসারে আক্রান্ত যেসব রোগী ইমিউনোথেরাপি নিচ্ছেন, তাদের মধ্যে যারা চিকিৎসা শুরু করার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে ফাইজার বা মডার্নার ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন, তারা তুলনামূলকভাবে দীর্ঘসময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা রাখেন।
গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী ড. অ্যাডাম গ্রিপিন বলেন, “এই এমআরএনএ ভ্যাকসিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ কোষগুলোকে সক্রিয় করার জন্য একধরনের ‘সাইরেন’ হিসেবে কাজ করে। এটি যেন ইমিউন সিস্টেমকে সতর্ক করে দেয় যাতে তারা ক্যানসার কোষগুলোকে শনাক্ত করে আক্রমণ করতে পারে।”
গবেষণায় আরও বলা হয়, এমআরএনএ ভ্যাকসিনের মূল কার্যপ্রণালী যেখানে ভ্যাকসিন শরীরে একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরির নির্দেশ দেয় তা ইমিউনোথেরাপির সাথে যুক্ত হলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করে তোলে। সাধারণত স্বাস্থ্যকর ইমিউন সিস্টেম ক্যানসার কোষগুলোকে শুরুতেই ধ্বংস করে দেয়, কিন্তু কিছু টিউমার নিজেদের এমনভাবে লুকিয়ে রাখে যে শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের চিনতে পারে না।
এক্ষেত্রে চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর নামের ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এটি ক্যানসার কোষের সেই আড়াল সরিয়ে দেয়, যাতে শরীরের প্রতিরোধ কোষগুলো সরাসরি টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। তবে গবেষকদের মতে, এমআরএনএ ভ্যাকসিন এই প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে পারে।
গবেষণা প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন এই প্রযুক্তি নিয়ে। তিনি সাম্প্রতিক বাজেটে এমআরএনএ গবেষণার জন্য বরাদ্দ তহবিল থেকে প্রায় ৫০ কোটি ডলার কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তবে বিজ্ঞানীরা তার বিপরীতে আরও জোরালোভাবে বলছেন, এই ফলাফল এতটাই আশাব্যঞ্জক যে এখনই পরবর্তী ধাপের কঠোর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
ড. গ্রিপিন বলেন, “যদি আমাদের পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতের ট্রায়ালগুলোতেও সত্য প্রমাণিত হয়, তবে একদিন হয়তো কোভিড ভ্যাকসিনের মতো এমআরএনএ প্রযুক্তিই ক্যানসার চিকিৎসার নতুন মুখ হয়ে উঠবে।”
চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এমআরএনএ প্রযুক্তি শুধু সংক্রামক রোগ প্রতিরোধেই নয়, ভবিষ্যতে ক্যানসার, অটোইমিউন ডিজঅর্ডার ও এমনকি বিরল জেনেটিক রোগের ক্ষেত্রেও বিপ্লব ঘটাতে পারে। কারণ, এই প্রযুক্তি দেহের প্রতিরোধ কোষগুলোকে নির্দিষ্ট শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে শেখায় যেভাবে কোভিড ভ্যাকসিন আমাদের দেহকে ভাইরাস শনাক্ত করতে শেখায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ক্যানসার চিকিৎসায় এক “বায়োলজিকাল টার্নিং পয়েন্ট” হতে পারে যেখানে ভ্যাকসিন শুধু প্রতিরোধ নয়, চিকিৎসার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হবে।
যদিও গবেষণাটি প্রাথমিক পর্যায়ের, তবু এর ইঙ্গিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা জগৎ এখন তাকিয়ে আছে সেই দিনের দিকে যেদিন হয়তো এমআরএনএ প্রযুক্তি ক্যানসারকে মারণব্যাধি নয়, নিয়ন্ত্রিত রোগে পরিণত করতে পারবে।

