
উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কানাডা-ইউনাইটেড স্টেটস-মেক্সিকো এগ্রিমেন্ট (CUSMA) আগামী বছর নির্ধারিত পর্যালোচনার আগে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, কারণ এই চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনার ওপর।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (USTR) বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ৪৫ দিনব্যাপী জনমত সংগ্রহ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এই সময়ের মধ্যে জনগণ ও সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা চুক্তি নিয়ে তাদের মতামত জানাতে পারবেন। পাশাপাশি ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে একটি গণশুনানি, যেখানে ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য শোনা হবে। এই প্রক্রিয়া আগামী জুলাইয়ে নির্ধারিত সিইউএসএমএ পর্যালোচনার প্রস্তুতিমূলক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কানাডার বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লাবোয়ার কার্যালয় জানিয়েছে, অটোয়াও খুব শিগগির নিজেদের জনমত সংগ্রহ প্রক্রিয়া শুরু করবে। কানাডা ও মেক্সিকো উভয় দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পণ্য শুল্কমুক্তভাবে রপ্তানি করে থাকে। বিশেষ করে গাড়ি, কৃষিপণ্য ও জ্বালানি খাতে এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সিইউএসএমএ মূলত ২০২০ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে কার্যকর হয়, যা নাফটা (NAFTA)-এর জায়গা নেয়। ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির অধীনে এই নতুন চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি, বিশেষ করে বৈশ্বিক শুল্ক যুদ্ধ, বিশ্ব অর্থনীতিতে তখন ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন বা যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে চুক্তি সংশোধনের দাবি তোলে, তবে উত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক ভারসাম্য আবারও নড়বড়ে হয়ে উঠতে পারে।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ ফেলো গ্যারি হাফবাউয়ার বলেন, “আমরা বড় কোনো পরিবর্তন নাও দেখতে পারি, তবে কিছু সমন্বয় অবশ্যই হতে পারে। আর সেই সমন্বয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুবিধাজনক হবে মেক্সিকো ও কানাডার তুলনায়।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো শ্রমবাজার, বৌদ্ধিক সম্পত্তি অধিকার, এবং কৃষিখাতে কিছু নীতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ থেকে উদ্ভূত হতে পারে।
চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শুরু হলেও এর প্রভাব ইতিমধ্যেই বাজারে অনুভূত হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা নতুন শুল্ক নীতি বা রপ্তানির বিধিনিষেধ আসতে পারে এই আশঙ্কায় সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে আসে বা কঠোর পরিবর্তন আনে, তাহলে উত্তর আমেরিকার সরবরাহ শৃঙ্খল ও বাণিজ্য ভারসাম্য গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইউএসটিআর-এর ঘোষিত সময়সীমা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর পর্যন্ত জনগণের মন্তব্য জমা দেওয়া যাবে। এরপর ১৭ নভেম্বরের গণশুনানিতে অংশগ্রহণের জন্যও একই সময়সীমার মধ্যে আবেদন করতে হবে। এই প্রাথমিক ধাপ শেষে আগামী বছরের জুলাইয়ে চুক্তির আনুষ্ঠানিক রিভিউ বা পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
ততদিনে তিন দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার গতি নির্ধারণ করবে সিইউএসএমএ কি টিকে থাকবে, নাকি নতুন করে আলোচনার টেবিলে ফিরবে উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্ক।

