
দিনভর গোছগাছ চলছে।
কাল সকালে যাত্রা। রাতে সবকিছু গুছায়ে রাখবা সবাই, সকাল সাতটার মধ্যে রওনা দিতেই হবে।- কঠোর গলায় বলে সবার হাতে একটা করে প্রিন্ট করা কাগজে যাবতীয় জিনিসপত্রের লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে বললাম, পড়ে দেখ কিছু বাদ গেলো কিনা।
সবার মাঝে উত্তেজনা।
বাসা থেকে সাড়ে পাঁচশো কিলোমিটার দূরে; সাডবুরি শহর ছেড়ে আরো উত্তর পশ্চিমে উইন্ডি লেকের ধারে এবারের ক্যাম্পিং। রাস্তার গতি কম; তিনবার ব্রেক নিয়ে প্রায় নয় ঘন্টার মামলা।
লম্বা জার্নি জেনে বাচ্চারা বেজায় খুশি। তারা কাছের কোথাও গিয়ে আনন্দ পায় না; তাদের দরকার ঘন্টার পর ঘন্টা গাড়িতে বসে থাকা, নাক ডেকে ঘুমানো। সারা রাস্তা চিপ্স, বার্গার, চুইংগাম চিবাবে। ভাই বোনের অনেক গল্প, ঝগড়া, মারামারি। হঠাৎ কখনও সিটবেল্ট ঠেলে দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরবে। গিন্নীর আনন্দ আরও বেশি। চলন্ত অবস্থায় আমার হাতে খাবার-কফি-পানি তুলে দেবে। রাস্তায় হাজারটা ছবি তুলবে। বরাবরের মতই তার মূখ্য দায়িত্ব আমাকে জাগিয়ে রাখা। ড্রাইভার ঘুমালে সর্বনাশ। মুড়ি-চানাচুর চিবাবে, অনলাইনে গল্প পড়বে, রান্নার রেসিপি দেখবে।
দুপুরে খাবার টেবিলে তিনজনকে উদ্দেশ্য করে বললাম- ক্যাম্পিং সাইটে কিন্তু ভাল্লুক, কায়োটি আছে; তাই রাতের বেলার জন্য পোর্টেবল কমোডের ব্যবস্থা হচ্ছে
– খাবার টেবিলে টয়লেটের কথা কেন? পরে বললে কি হতো? তা কোথায় তোমার কমোড?- গিন্নি জিজ্ঞেস করে।
– আসতেছে..
– রাখবা কোথায়?
– ইয়ার্টের ভিতর
– মানে?
– তাতে কী? আমরা ফ্যামিলি না?
তিনজনই প্রতিবাদ করে বলে উঠলো, “না!”
গিন্নি খাওয়া বন্ধ করে হতভম্ব হয়ে অপলক আমার দিকে চেয়ে থাকলো।
খাবারের মাঝেই দরজার বাইরে কিছু একটা পড়ার আওয়াজ হলো।
বললাম, ঐ যে আসছে!
বিত্ত দৌড়ে পার্সেল নিয়ে এসে দাঁত বের করে বলল, রিয়েলী টয়লেট!
বিকালে বাইরের ঘরের মাঝখানে ওটা সেট করে সবাইকে ডাক দিয়ে বললাম, দখিনা তুই আগে বসে টেস্ট কর। সত্যি সত্যি আবার ওয়াশ্রুম শুরু করে দিস না, ট্রায়াল।
তার ছোট শুকনা পাতলা শরীরটা কমোডে বলল, ওকে।
বিত্তকে ইশারা করতেই সে দুষ্ট দুষ্ট হেসে কমোডে বসে তার পাছা সেট করার ব্যার্থ চেষ্টা করে বলল, একটু ছোট..। বাট সামথিং ইজ বেটার দেন নাথিং। থ্যান্ক ইউ ড্যাড!
এবার গিন্নির দিকে চাইতেই সে বলল, আমিও?
– ওমা, লজ্জা কি? সেট না হলো ফেরত দিতে হবে।
সে লাজুক ভঙ্গিমায় নাকে ওড়না গুঁজে ওটার কাছে গিয়ে হাত দিয়ে ভালোমতো প্রেস করে আগে দেখে নিলো জিনিসটা মজবুত কি না…
বাবা, আই হাভ আ কোয়েশ্চান [বিত্ত বলল]
– বল, বাট রিমেম্বার, নো ব্যাড কোয়েশ্চান!
– পানি কি ইউজ করা যাবে?
– ছোট কাজে হাফ লিটার মাক্সিমাম
– গন্ধ লাগবে না?
তার প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই বাইরে আবার কিছু একটা পড়ার আওয়াজ আসলো। বিত্ত নিয়ে আসতেই বললাম- এই যে, তোর উত্তর এসে গেছে। পু জেল। টয়লেট ইউজ করার পর একটা মিনিপ্যাক ঢেলে দিবি। হাগু-পিসু জেলি হয়ে সুগন্ধ ছড়াবে। মনে হবে এক্ষুনি পাউরুটি টোস্ট করে..
গিন্নি বলল, তারমানে বাথরুম সারার সময় অন্য সবাই বাইরে বের হয়ে যাবে?
– নাহ.. ঘরেই থাকবে, আমরা আমরাই তো..
– কক্ষনও না!
– আরে বাবা ব্যবস্থা হচ্ছে; পাঁচটা মিনিট সবুর
করো- বলে আমি ইমেইল চেক করতে থাকি।
ঠিক পাচঁ মিনিট পর আরেকটা পার্সেল পড়ার শব্দ বাইরে। ওটা খুলতেই পপ আপ স্প্রিং এর মতো শাট হয়ে একটা লম্বা ছোটখাটো তিন ফিট বাই তিন ফিটের ঘর হয়ে গেলো। লম্বা চেইন লাগানো। কমোডটা ভেতরে রেখে বললাম, তবে কিছু রেস্ট্রিকশনস আছে; পায়খানা করা যাবে না, শুধু হিসু
– রাতে যদি আর্জেন্ট লাগে?- বিত্ত জিজ্ঞেস করে।
আমি কোনো উত্তর না গিন্নির বানানো গরম পিঁয়াজু চিবিয়ে নিয়ে বললাম, লাইট এক্সারসাইজ। দল আরামে দাঁড়াও!
সবাই নির্দেশমতো আমার পেছনে দাঁড়িয়ে গেল।
সোজা হও!
দশবার সামনে হাত টানটান করে উঠবস করো।
এবার দশবার বুকডন.. ওয়ান, টু..
গিন্নি নাকে ওড়না ঠেসে নিঃশব্দে হেসেই চলেছে..
ছোটকালে ঈদের নামাজ পড়ার সময় ঠিক এভাবেই হাসতাম..
আমি নামাজে দাঁড়ানো সেই মুরুব্বীদের মতো বিস্ফোরক চোখে কটমট করে তাকাই..
অটোয়া থেকে বের হয়ে আমরা হাইওয়ে সতেরো ধরে উত্তর পশ্চিমে এগিয়ে যাই। গাড়ি ভর্তি খাবার, নাস্তা, কাঁচা মাংস, ছোট ফ্রিজ, কম্বল, বালিশ, চাদর, চুলা, থালাবাসন নিয়ে ছুটতে থাকি।
যাত্রা শুরুর প্রায় দুই ঘন্টা পর ঘটলো বিপত্তি। টিম হর্টন্স কফি শপে বিরতি নিয়ে গাড়িতে উঠতেই মেয়েটা বলল, বাবা আমার ছোট বালিশ দেখছো?
– ভালো করে খুঁজে দেখ
– গাড়িতে তো নাই!
গাড়ির তলা, আশপাশটা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখি সত্যি ওটা হাওয়া। তার মা আর সে নিশ্চিত ওটা নিয়ে গাড়িতে উঠেছিল, বিত্তও নাকি দেখেছে ওটা গাড়িতে তুলতে। সে সবকিছু ভুললেও তার ছোট বালিশ নিতে কখনোই ভুলে না। বারো বছর ধরে ওটা আগলিয়ে রেখেছে কোলের মধ্যে। তার দু’চোখ বেয়ে টলটলে পানির ধারা নেমে আসতে থাকে।
বললাম, তোকে আরেকটা কিনে দিবো
– ওটার ভ্যালু কতো জানো? আমার বদলে তোমাকে আরেকটা মেয়ে দিলে তুমি মেনে নিবা?- বলে সে এমনভাবে চেয়ে থাকলো; যেন এমন নিষ্ঠুর বাবা জীবনে দেখেনি।
কীভাবে গাড়ি থেকে ওটা পড়ে গেল সে এক বিরাট রহস্য।
.
কানাডার সৌন্দর্য্য বুঝতে হলে ড্রাইভ করে দূরে যেতে হবে। বিল্ডিং, স্ট্রাকচার, বিরাট অট্রালিকা আমাকে আকর্ষণ করে না। দেশটা যে কত বড় আর কত সুন্দর! উঁচু-নিচু রাস্তা, রাস্তার চারপাশে বন আর বন, বিস্তীর্ন ফসলের ক্ষেত, গরু-ঘোড়ার খামার, ছোট-বড় শহর, গ্রাম, শত শত গুছানো পার্ক। নতুন মানুষ, নানা রকমের যানবাহন, সাইনবোর্ড, রেস্তোরা, পানশালা। কিছু গ্রাম আছে ঝকঝকে, ফুলে ভরা। আর হাজার হাজার লেক। সবুজ বনরাশির পাশে হঠাৎ উদয় হবে ছোট বড় সব ধরণের লেক। কোনোটা সমুদ্রের মতো, কোনোটা বা বড় পুকুরের মতো, পানি ঝলকানি আর সবুজের সখ্যতা দেখতে দেখতে চলে কতো কথা,গল্প!
হঠাৎ স্পিড একশো থেকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে ষাট এ নামিয়ে আনতে হয়; যখন ছোট গ্রাম কিংবা শহরের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। পুলিশ ওঁৎ পেতে থাকে শিকার ধরবার জন্য। ভ্যাকেশনে গিয়ে ধরা খেলে সব মাঠে মারা যাবে। মনোকষ্ট নিয়ে ক্যাম্পিং, লং ড্রাইভ জমে না।
ওদিকে মেয়েটা কিছুক্ষন পরপর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছে।
তার যাবতীয় অভিমান বাবার উপর। আমি কেন ভালো করে তার ছোট বালিশ খুঁজি নাই? এরকম মহা মূল্যবান জিনিস আমার হারালে কেমন লাগতো; ইত্যাদি নানা তার যুক্তি। কিছুক্ষন পরপর সরি বলে পেছন থেকে আমার গায়ে হাত ছোঁয়াবে।
তারপর সাড়াশব্দ না পেয়ে মাথা উঁচু-নিচু করে মিররে দেখি তিনজনই ঘুম। সজাগ হই; তাদের যেন ঝাঁকুনি কম লাগে, আরো কিছুক্ষন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। গানের ভলিউম অনেক কমিয়ে দেই।
সাপের মতো আঁকা-বাঁকা পথ বেয়ে, শত শত কিলোমিটার পেছন ফেলে ছুটতে থাকি। ঘুম লাগলেও চোখ বুজা মানা..
অটোয়া, কানাডা

