
আব্বু, তুমি দিনদিন আরও বোকা হচ্ছো..
– কেন রে বুড়ি?
– তোমার যখন খিদে লাগে তখন আমাকে জিজ্ঞেস করো যে বুড়ি তোর খিদে লাগছে? তুমি খেতে চাও বললেই হয়?
– আর?
– আর কালকে তোমার হাত ঘড়ির কাঁচ পালিশ করতে গিয়ে আরও নষ্ট করছো। তারপর তোমার চা খেতে ইচ্ছা হলে আমাকে বলো যে কফি বানায়ে খাইতে। তোমার ঘুম লাগলে আমাকে বলো ঘুমাতে। তুমি আরও ফানি হচ্ছো। পরশুদিন এক বালতি আইস্ক্রিম কিনে আনছো! তোমার সিলি কাজের কোনো শেষ নাই! আমার ভাল্লাগে আব্বু! আই লাভ ইউ!
– লাভ ইউ ঠু!
– বাবা, তুমি কি তোমার আব্বু আম্মুকে “লাভ ইউ” বলতা?
– ধ্যাৎ! তাই বলা যায়? আব্বাকে লাভ ইউ বললে নিশ্চিত বলে বসতো- “মশকরার জায়গা পাস না?” তারপর শিওর লাঠি হাতে তেড়ে এসে পাছার ছাল তুলে ফেলতো, নয়তো মেরে তক্তা বানায়ে দিতো

– হি হি। তক্তা কী আব্বু?
– কাঠ
– আর ছাল?
– খোশা, চামড়া
– তোমার আম্মুকে বলতা?
– আম্মাকে অবশ্য বলা যেতো, কিন্তু বলিনি..
– ইট’স ওকে, কালকে বলবা
– দেখি.. লজ্জা করে
– আর তোমার ব্রাদার্সদের বলতা?
– এ ছি ছি..
– হি হি! কেন, তাদের লাভ করো না?
– অনেক লাভ করি। কিন্তু লাভ করলে ‘লাভ ইউ’ না বললেও হয়
– তোমার সিস্টারকে?
– তোর ফুপুকে মনে হয় মাঝে মাঝে বলতাম..
– ফুপুকে খুব লাভ করতা?
– ওরেব্বাবা, খুব! তোর ফুপু আমাদের জানের জান। আগে সারাক্ষন ওয়েট করতাম কখন স্কুল থেকে আসবে, কখন ইউনিভার্সিটি থেকে আসবে আর আদর করবো..
– হাগ করতা?
– কতো! সে অবশ্য করতে চাইতো না। জোর করে হাগ করতাম
– তোমার ব্রাদার্সদেরও হাগ করতা?
– ছি ছি ছি..
– হি হি! তোমার আম্মুকে?
– রাজশাহী যাবার সময়, ঢাকা যাবার সময় মাঝে মাঝে হাগ করতাম..
– আর তোমার আব্বুকে?
– বছরে দুইবার। ঈদের দিন যখন কোলাকুলি করতাম, তখন। উনার যে রাগ ছিল.. পালায়ে থাকতাম। এমনি এমনি হাগ করার প্রশ্নই আসে না! বাঘকে কে হাগ করতে চায়?
– দাদা দাদীকে কিসি দিতা না?
– দিতাম ঈদের দিন। আব্বাকে ভয়ে ভয়ে কপালে চুমু দিতাম। শুধু আমি, আর কেউ দিতো না ভয়ে
– রাগ করতো?
– নাহ.. আরও খুশি হতো। কিন্তু বুঝতে দিতো না
– কেন?
– ওরকমই ছিল আগেকার বাবারা। তাই তাদের বাচ্চারা মনে করতো তাদের ভালবাসে না
– আসলে?
– আসলে খুব ভালবাসতো
– তুমি আমাকে যতো ভালবাসো ঠিক ততো?
– হা মা, ঠিক ততো। তবে এক্সপ্রেশন ছিল ডিফারেন্ট। বুঝতে দিতো না। দুনিয়ায় সব বাবা মা-ই তার সন্তানদের ভালবাসে। এবার বল দেখি, ‘আই লাভ ইউ’ না বললেও কীভাবে বুঝবি যে কেউ তোকে ভালবাসে?
– কীভাবে?
– তোর সাকসেস বা হ্যাপিনেস দেখে যারা সত্যি সত্যি খুশি হয়, তারাই তোকে প্রকৃত ভালবাসে। সে যেই হোক না কেন
– ও
– বলতো, তোর সাকসেস আর হ্যাপিনেস দেখে কে সবচেয়ে খুশি হবে?
– তুমি, আম্মু
– আর?
– বিত্ত
– হইছে। আর তোর দাদী-নানী, মামা-চাচা, ফুপু এরা
– তোমার আব্বু তোমাকে লাভ করতো সেটা কখন বুঝতে পারছিলা?
– অনেক পরে
– কীভাবে?
– আমার অনার্সের রেজাল্টের দিন। রাজশাহী ইউনিভার্সিটি গেছিলাম রেজাল্ট দিবে বলে। হঠাৎ দেখি সকালে আব্বাও রাজশাহী হাজির
– তারপর!
– তারপর রেজাল্ট শুনে মনে হলো আব্বা আমার থেকেও বেশি খুশি হইছে। বাসায় কেউ বেড়াতে আসলে আমার প্রাইজটা বের করে দেখাতো
– ঐটা কোই বাবা? কানাডায় আছে?
– হা মা, তোর দাদি জোর করে আমার সাথে দিয়ে দিয়েছিল; যখন প্রথম কানাডা আসি
– দেখাবা?
– ব্যাংকের লকারে রাখা আছে যে? একদিন নিয়ে আসবো
– আর কখনও খুশি হয়নি?
– তা হইছে, সব তো মনে নাই। হয়তো বুঝতামও না। তবে যখন প্রথম চাকরি পাই, তখন আমার এপয়েন্টমেন্ট লেটারটা তোর দাদা তাঁর বুক পকেটে ভরে মোটরসাইকেল স্টার্ট দিয়ে বাইরে বের হয়ে গেল; আত্মীয়/বন্ধুদের দেখাবে বলে..
আমার বাচ্চা দুটার বিরাট আফসোস তারা তাদের দাদাকে দেখতে পারেনি। মাঝেমধ্যেই আব্বার কথা শুনতে চায়।
দখিনা আমার কোলের মধ্যে শুয়ে এসব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে কী জানি ভাবলো। তারপর বলল- আব্বু, দাদা বেঁচে থাকলে কি আমাদের সাথেও রাগ করতো?
– নাহ, নাতি নাতনীদের সাথে অন্যরকম বিহেভ করতো; কখনোই রাগ করতো না
– আমাদের খুব আদর করতো, তাই না?
– হু।
সে আবারো কিছুক্ষন চুপ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বলে উঠে- আচ্ছা আব্বু, ফুপুকে কিসি দিতা না?
– হা দিতাম, অনেক!
– আর তোমার ভাইদের?
– ইরিচ্ছি.. !
– আব্বু!
অটোয়া, কানাডা

