এক কাপ চায়ের জন্য ঝরে গেল ১০ প্রাণ, অব্যবস্থাপনার ফাঁদে পুড়ল রিসোর্ট

এক কাপ চায়ের জন্য ঝরে গেল ১০ প্রাণ, অব্যবস্থাপনার ফাঁদে পুড়ল রিসোর্ট - the Bengali Times
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে অবস্থিত বাঁশ কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পেছনে উঠে এসেছে অব্যবস্থাপনা ও অগ্নিনিরাপত্তার গুরুতর ঘাটতির চিত্র

এক কাপ চা তৈরির জন্য চুলায় বসানো পানির পাতিলের দিকে আর খেয়াল করেননি কর্মচারী। দীর্ঘ সময় আগুনে পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো রিসোর্টে। প্রাণ বাঁচাতে বের হওয়ার পথ খুঁজেও পারেননি ওপরের তলায় থাকা পর্যটকেরা। শেষ পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ১০ জন। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে অবস্থিত বাঁশ-কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পেছনে উঠে এসেছে অব্যবস্থাপনা ও অগ্নিনিরাপত্তার গুরুতর ঘাটতির চিত্র।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনতলা রিসোর্টটির একমাত্র ওঠানামার পথ ছিল কাঠের সিঁড়ি। এর এক পাশে ছিল রান্নাঘর, অন্য পাশে ডিজেলচালিত জেনারেটরের কক্ষ। রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আগুন ডিজেলের সংস্পর্শে এসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে সিঁড়িটি আগুনে অবরুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে ওপরের তলায় থাকা পর্যটকদের নিচে নামার কোনো বিকল্প পথ ছিল না।

- Advertisement -

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে এবং তারা দায় এড়াতে পারে না। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সুপারিশ করা হবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা উন্নয়নের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজাদ আনোয়ার জানান, রিসোর্টটিকে আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। গত জুনে পরিদর্শনের পর নোটিশও দেওয়া হয়। এরপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। সেখানে অগ্নিনিরাপত্তা সনদ, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম ও অগ্নিসংকেতব্যবস্থার ঘাটতি ছিল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শনিবার সকাল ৬টার দিকে রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম সুমন ওয়েটার কপিলকে চা তৈরির নির্দেশ দেন। নির্দেশনা অনুযায়ী গ্যাসের চুলায় পানি বসিয়ে বাইরে চলে যান কপিল। এভাবে কেটে যায় প্রায় এক ঘণ্টা। এর মধ্যে পানি শুকিয়ে পাতিলটি প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় যুবক মো. জালাল জানান, রান্নাঘর ও জেনারেটর কক্ষের মাঝখানেই ছিল রিসোর্টটির একমাত্র সিঁড়ি। মাত্র ১৫ থেকে ২০ ফুটের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুটি কক্ষ স্থাপন করা হয়েছিল। ফলে আগুন লাগার পর ওপরের তলায় থাকা পর্যটকদের নিচে নামার পথ বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় ওপরের তলায় ২৬ জন এবং নিচে ২৭ জন ছিলেন।

রিসোর্টের পাশের মফিজ স্টোরের মালিক মুফিজুর রহমান বলেন, জেনারেটর চালানোর জন্য সেখানে প্রচুর ডিজেল মজুত রাখা হতো। সম্প্রতি বিদ্যুৎবিভ্রাট বেড়ে যাওয়ায় মজুতের পরিমাণও বাড়ানো হয়েছিল। বিস্ফোরণের পর মাত্র চার থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আগুন পুরো রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি আরও জানান, আগুন লাগার পরপরই ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁর দাবি, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় নেন।

অগ্নিকাণ্ডের প্রথম দিকের কয়েকটি ভিডিওতেও ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শুরুতে আগুনের তীব্রতা তুলনামূলক কম থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যে তা ভয়ংকর রূপ নেয়। আকাশে ছড়িয়ে পড়ে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী। আতঙ্কিত মানুষজন রাস্তায় ছোটাছুটি করেন। কয়েকজনকে আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে শুশ্রূষা দিতেও দেখা যায়।

অন্য একটি ভিডিওতে রিসোর্টজুড়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে এবং চারপাশ ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যেতে দেখা যায়।

বাঁশ, কাঠ ও ছনের মতো দাহ্য উপকরণে তৈরি ভবনটিতে জরুরি বহির্গমন পথ না থাকা, রান্নাঘরের পাশে জেনারেটর কক্ষ এবং ডিজেল মজুতের মতো বিষয়গুলো দুর্ঘটনাটিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

এক কাপ চা তৈরির সময় অসতর্কতার অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া এই অগ্নিকাণ্ড শেষ পর্যন্ত ১০টি প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles