কয়েক দশকের বন্ধু, ডিএনএ টেস্টে জানলেন তারা আপন দুই বোন!

কয়েক দশকের বন্ধু, ডিএনএ টেস্টে জানলেন তারা আপন দুই বোন! - the Bengali Times

শৈশবেই আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন তারা বড় হয়েছেন নেদারল্যান্ডসের দুই ভিন্ন পরিবারের কাছে

শৈশবেই আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন তারা। বড় হয়েছেন নেদারল্যান্ডসের দুই ভিন্ন পরিবারের কাছে। অথচ কৈশোরে এসে তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল গভীর বন্ধুত্ব। একে অপরের চেহারায় মিল দেখে বিস্মিত হলেও তখন কেউ জানতেন না, এই বন্ধুত্বের আড়ালে রয়েছে আরও গভীর এক সম্পর্ক। কয়েক দশক পর ডিএনএ পরীক্ষায় জানা গেল, তারা আসলে আপন দুই বোন।

মীনা গেলটিঙ্ক ও মিনাল টাইসেনের জন্ম ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে ভারতের মুম্বাইয়ে। জন্মের কয়েক মাস পর তাদের নেদারল্যান্ডসের দুটি ভিন্ন পরিবার দত্তক নেয়। দুই পরিবারেই আলাদাভাবে বেড়ে ওঠেন তারা।

- Advertisement -

কৈশোরে দত্তক সংস্থার একটি অনুষ্ঠানে প্রথম দেখা হয় মীনা ও মিনালের। সেদিন তাদের বন্ধুরাই প্রথম দুজনের চেহারার অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করেন। মীনার ভাষায়, মিনালের নাক ও হাসির ধরন তার নিজের মতোই ছিল। প্রথম দেখাতেই তাই দুজনের মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত টান তৈরি হয়।

এরপর ঠিকানা ও ফোন নম্বর বিনিময় করে নিয়মিত চিঠি লিখতে শুরু করেন তারা। রক্তের সম্পর্কের কথা না জানলেও একে অপরকে চিঠিতে ‘সিস’ অর্থাৎ বোন বলে সম্বোধন করতেন। স্কুল, বন্ধু, প্রেম, ঘোরাঘুরি, নাচ—জীবনের নানা গল্পই তারা ভাগ করে নিতেন। এমনকি দুজনেরই একটি জনপ্রিয় ব্যান্ডের গান পছন্দ—সেটিও চিঠির মাধ্যমে জানতে পারেন।

কিন্তু প্রায় ১৫ বছর আগে হঠাৎ তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। মিনাল ফ্রান্সে চলে যান। অন্যদিকে মীনা নিজের সংসার ও সন্তান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

নিজের শেকড়ের সন্ধানে ২০০৩ সালে ১৯ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের সেই এতিমখানায় গিয়েছিলেন মীনা। দত্তক নেওয়া মা-বাবা ও ভাইকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ খোঁজ করেও জন্মদাতা মা-বাবার কোনো তথ্য পাননি।

পরে ২০১৭ সালে দত্তক নেওয়া সন্তানদের একটি অনুষ্ঠানে ডিএনএ পরীক্ষা করান তিনি। তবে তখন কোনো স্বজনের সঙ্গে তার ডিএনএ মিল পাওয়া যায়নি। একসময় সেই পরীক্ষার সংক্রান্ত মুঠোফোনের প্রয়োগটিও মুছে ফেলেন তিনি।

ঘটনার মোড় ঘোরে চলতি বছরের এপ্রিলে। মিনাল নেদারল্যান্ডসে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসে ডিএনএ পরীক্ষা করান। ফলাফল দেখে তিনি জানতে পারেন, এক নারীর সঙ্গে তার ডিএনএ শতভাগ মিলে গেছে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেখে বুঝতে পারেন, সেই নারী আর কেউ নন—তার কৈশোরের হারিয়ে যাওয়া বন্ধু মীনা।

গত ২০ মে মীনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তাবাক্সে আসে একটি বার্তা—‘আমাকে মনে আছে?’ সঙ্গে ছিল মিনালের ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের ছবি।

বার্তা পাওয়ার পর মীনা আবার ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োগটি মুঠোফোনে স্থাপন করেন। উত্তেজনায় কয়েকবার ভুল পাসওয়ার্ড দেওয়ার পর অবশেষে প্রবেশ করে দেখেন, মিনালের সঙ্গে তার ডিএনএ শতভাগ মিলে গেছে। অর্থাৎ, তারা শুধু বহু বছরের বন্ধু নন—তারা জন্মসূত্রে আপন দুই বোন।

এই সত্য জানার পর আবেগে কেঁদে ফেলেন মীনা। তার কাছে মিনাল যেন জীবনের হারিয়ে যাওয়া একটি অংশ, যার সন্ধান তিনি এতদিন ধরে করছিলেন।

গত আগস্টে অবশেষে মুখোমুখি দেখা হয় দুই বোনের। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর সেই পুনর্মিলন ছিল কান্না, হাসি ও আলিঙ্গনে ভরা। প্রথমবার বোন হিসেবে একসঙ্গে ছবিও তোলেন তারা।

বর্তমানে মিনাল ফ্রান্সে সঙ্গী ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন। মীনা তিন সন্তানের মা। গত মে মাস থেকে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং এরই মধ্যে একে অপরের পরিবার ও আত্মীয়দের সঙ্গেও পরিচিত হয়েছেন।

দুই বোনের কথা বলার ধরন, মাথা নাড়ানো ও হাঁটার ভঙ্গিতেও রয়েছে আশ্চর্য মিল। কখনো কখনো ফোনে টানা দুই ঘণ্টা কথা বললেও সময়ের কথা ভুলে যান তারা।

তবে হারিয়ে যাওয়া সময়ের জন্য আক্ষেপও রয়েছে দুজনের। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে একে অপরের পাশে থাকতে না পারার কষ্টের কথা জানিয়েছেন মীনা।

এখন সেই হারানো সময় পুষিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন দুই বোন। তাদের সবচেয়ে বড় ইচ্ছা, একদিন একসঙ্গে ভারতে গিয়ে মুম্বাইয়ের সেই রাস্তাগুলোতে হাঁটা—যেখান থেকে কয়েক দশক আগে তাদের জীবনের গল্পের শুরু হয়েছিল।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles