ভালোবাসার নাটাই

ভালোবাসার নাটাই - the Bengali Times
আকতার হোসেন

বড় হয়ে আমি ভালোবাসতে চাই।

আমার গৃহশিক্ষক একদিন প্রশ্ন করেছিলেন, নীলা, বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও? উত্তরে আমি এটাই বলেছিলাম।

- Advertisement -

গৃহশিক্ষক তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বললেন, এই মেয়ে, ভালোবাসা চেয়ে পাওয়া যায় না। ও হয়ে যায়।

আমি বললাম, আমার কী করে হবে?

স্যার সাইকেলে চেপে আমাকে পড়াতে আসতেন। সেদিন তাঁর খুব তাড়া ছিল। যাবার সময় অকারণে সাইকেলের বেল বাজিয়ে চলে গেলেন।

আমার গৃহশিক্ষক নিজেও তখন ছাত্র ছিলেন। তবে ভীষণ মেধাবী ছাত্র। তিনি এলে অঙ্ক, ইংরেজি, ভূগোল শিখতাম। একদিন সুযোগ পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, স্যার, স্কুলে ভালোবাসা শেখায় না কেন?

সেদিনও বেশ তাড়া ছিল। প্রতিদিন দুটো টিউশনি করতেন। যাবার সময় বেল বাজাতে ভুললেন না। স্যারের সাইকেলটা যেন সাইকেল নয়, দুই চাকার হাওয়াই মিঠাই!

সপ্তাহে মাত্র একদিন তিনি পড়াতে আসতেন। সেই দিনটি ছিল রবিবার। পরের রবিবার তিনি ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরে এলেন। দেখতেও বেশ লাগছিল। আমি তখন ক্লাস নাইনের ছাত্রী। সাদা পাঞ্জাবির মানে কিছুটা বুঝি। আর বুঝবই বা না কেন? পাশের বাড়ির মেয়েটির কাছ থেকে ভালোবাসার শিক্ষা নিচ্ছিলাম যে! শুরুটা হয়েছিল এভাবে।

পড়ন্ত বিকেলে জানালার পর্দা উড়ে যেতেই দেখি, পাশের বাড়ির ক্লাস টেনের মেয়েটি সামনের বাড়ির জানালার দিকে ঘনঘন তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজছে। ওর অনুসন্ধানী চোখে লজ্জা মেশানো ভয়।

সামনের বাসার ছেলেটি বারান্দায় এসে হাজির। এ বাড়ি আর ও বাড়ির মধ্যে বিশ ফুট দূরত্ব। ছেলে আর মেয়েটির নাম বলতে আপত্তি নেই। কিন্তু কেন বলব না, কারণটা শেষে গিয়ে বুঝবেন।

আমাকে ওরা দেখতে পেত না। আমাদের বাসা ছিল দোতালা। ওদের সামনাসামনি একতলা। দোতালার সবচেয়ে কোনার ঘরটি ছিল আমার। সেখানে বসে ভালোবাসার ক্লাস বেশ ভালোই চলছিল। ছেলেটি যখন উপস্থিত হতো, তখন মনে হতো শীত-বসন্তের আগমন ঘটত আমাদের গলিতে। ওদের চোখে-মুখে হাসি দেখে বোঝা যেত, দুজনের মধ্যে আছে এক নির্বাক সন্ধি। উপন্যাসের পর উপন্যাস লিখে যাচ্ছে। মোনালিসার ছবি আঁকছে। শরৎচন্দ্র তো ছায়ার মতো লেগে থাকে। কিন্তু কারও মুখে কোনো শব্দ নেই।

প্রায়ই দেখতাম, সন্ধ্যা হয়ে গেলে একজন অন্যজনকে ইশারা করত ‘তুমি আগে ভেতর যাও। ভেতরে গিয়ে পড়তে বসো। এরপর আমি যাব।’

অন্যজন ইশারা দিত—‘না, না, আপনি আগে যান।’

এই ‘আপনি-তুমি’র ইশারা দেখতে দেখতে শিখে গেলাম ভালোবাসার অনুরাগ। ভালোবাসার দ্বিতীয় ভাগ। এভাবেই চলল আমার ক্লাস।

একদিন মুষলধারে বৃষ্টি এলো। এমন দিনে সব বাড়িতে যা হওয়ার, তাই হচ্ছিল অর্থাৎ মুড়িভাজা আর লুডু খেলা। দুই বারান্দা তখনও দুই দিগন্তে বিভক্ত অথচ সুনামি চলছিল অহরহ। ক্লাস টেনের মেয়েটি মুঠো ভরে বৃষ্টির পানি ছুড়ে মারল বি.কম পড়া ছেলেটির দিকে। সবাই জানে যে, বৃষ্টির সময় বাতাসের ঝাপটা থাকে। সেদিন বাতাস বইছিল মেয়েটির দিকে। তবু কী আশ্চর্য দৃশ্য! ছেলেটিকে দেখে মনে হলো, বিশাল সমুদ্রের মাঝখান থেকে এইমাত্র ডুব দিয়ে উঠলো। বিশ ফুট দূরত্ব ঠিকই ছিল কিন্তু ছিল না, নদীর পাড়। ওদের শরীর নিংড়ানো অনুভূতিগুলো কোথায় গিয়ে স্তুপ হয় জানতে পারলে শিউলি ফুলের মতো টুকিয়ে আনতাম।

এদিকে আমার স্যার শুধু শুধু সাদা পাঞ্জাবি পরে আসতেন। ওদের মতো আমাদের মধ্যে কোনো সুনামি জন্ম নিত না। স্যারের ফ্যালফ্যাল তাকানো দেখে মনে হতো আমিও বুঝি তার আর একটি সাইকেল।

আব্বা সরকারি চাকরি করতেন। হুটহাট বদলি হওয়া ছিল অতি সাধারণ ব্যাপার। সিলেট, চিটাগাং, যশোর এসব তো কোনো ব্যাপারই না। এবার তিনি করাচিতে বদলির ফরমান পেলেন। এতদিন পর আব্বার স্বপ্ন পূরণ হলো।

আমার স্যার খুব কেঁদেছিলেন শেষ রবিবারে। তাঁর অনুরোধে সেদিন আমি একটা শাড়ি পরেছিলাম। স্যারের চোখে ঢেউ জাগল। আমার কিছু হলো না।

করাচি যাওয়ার সপ্তাহ দেড়েক আগের ঘটনা। সামনের বাড়ির দেওয়ালের ওপর একটি বই রেখে মিস্টার বি.কম গলির দিকে হেঁটে গেলেন। খুব ইন্টারেস্টিং লাগল ব্যাপারটা। যেতে যেতে ফিরে তাকিয়ে তিনি নিশ্চিত হতে চেষ্টা করলেন, পড়বি তো পড়, মালির হাতে না হয়ে যায়! ওদের ভালোবাসা ছিল অঙ্ক কষা। কাজেই তেমন কিছু অঘটন হলো না। ফুলের মতো নরম পায়ে এসে মেয়েটি বুকের মাঝে আলতো করে চেপে ধরল ফেলে রাখা গল্প।

করাচি যাওয়ার ঠিক আগের দিন দেখলাম হাঁটতে হাঁটতে ছেলেটির হাত ফসকে পড়ে গেল একটি লাল গোলাপ। হাত ফসকে বলা ভুল হলো। কেননা, লুকানো অবস্থা থেকে দৌড়ে এসে মেয়েটি রাস্তার ওপর পড়ে থাকা ফুলটি তুলে নিয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিল। সাথে একটি লম্ফ। ঈশ্বর ওপর থাকেন। লম্ফ না দিলে ঈশ্বরের পা ছুঁবে কী করে। হয়তো সেদিন মেয়েটির জন্মদিন ছিল। বিকেলে বেশ ‘হ্যাপি বার্থডে’ হইহুল্লোড় হয়েছিল।

পাঁচ বছর পর যখন করাচি থেকে ঢাকায় ফিরে এলাম, তখন দেশের নাম বাংলাদেশ। আমি বড় হয়েছিলাম খুব ধীর গতিতে। পড়তে পড়তে বিশ্ববিদ্যালয়ও শেষ করেছি ভালো রেজাল্ট নিয়ে।

ঢাকায় ফিরে আসার পর স্যারের হাওয়াই মিঠাই সাইকেলটি আর দেখা হলো না। তিনি হয়তো সাইকেলে চেপে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছেন।

আব্বার এক কলিগের ছেলেকে ভালোবেসেছিলাম। ওরাও করাচির বাঙালি। আমার থেকেও ভালো ছাত্র ছিল। অনেক চেষ্টা করতাম, মিস্টার বি.কম আর মিস উঁকিঝুঁকি মেয়েটির মতো সব কাজে উষ্ণ উত্তাপ পেতে। ওদের মতো বাতাসে পা দুলিয়ে হাঁটতে। যাকে আমি  ভালোবেসেছিলাম, তাকেই বিয়ে করেছি। সে অনেকদিন হয়ে গেল তো। আমাদের একটি মাত্র মেয়ে। সে এখন নরওয়েতে থাকে। ওখানেই পড়ালেখা করছে। ওর বয়ফ্রেন্ডের মাথা ভর্তি অর্থনীতি। ওদেরও হয়ে যাবে যে কোনো দিন। কাজেই বলা যায়, আমরা প্রায় বুড়োবুড়ি।

আমার সংসারজীবনে কর্তব্য ও নিয়মনীতির নিত্যি অধিক। গোছানো জিনিসটা আমাদের বাড়িতে অনেক বেশি কাম্য। ভালোবাসার মারাত্মক কেমিস্ট্রি, অবাক হবার স্বভাব আমাদের মাঝে অনুপস্থিত।

আমাদের বলাবলির সবটাই কথা দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। কখনো যৎসামান্য পেরিয়ে অতিরিক্ত ব্যাখ্যার চর্চা। বুঝে নেবার চেষ্টা করতে হয় না আমাদের, সব কথাই বুঝিয়ে বলা হয়। মাঝে মাঝে তালগোল পাকিয়ে যায়। জীবনে যা হচ্ছে, সেটা কি পান থেকে চুন না খসার সাবধানতা? অথচ মনে করতাম, অসাবধানতাই বুঝি ভালোবাসার শিকড়। না বলা কথার অনেক ওজন।

শুনেছি, সেই দুজনের ভালোবাসা এখনো অক্ষয়। ওরা বেঁচে আছে ওদের মতো। বিশ ফুট দূরত্ব বেড়ে গেছে জ্যামিতিক হারে। কেননা, ওরা কেউ কাউকে সঙ্গে রাখেনি। আবার ছেড়ে যে দিয়েছে, তারও কোনো যতিচিহ্ন দেখা যায় না।

কী চমৎকার বুদ্ধি!

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles