সেই ঐশীর নতুন পৃথিবী, বই আর ফুলেই কাটে বন্দিজীবন

সেই ঐশীর নতুন পৃথিবী, বই আর ফুলেই কাটে বন্দিজীবন - the Bengali Times
ঐশী

এক যুগেরও বেশি সময় আগে আলোচিত এক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন ঐশী রহমান। ঢাকার চামেলীবাগের একটি ফ্ল্যাটে নিজের বাবা পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও মা স্বপ্না রহমান হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তাদের মেয়ে ঐশী। তখন তিনি ছিলেন মাত্র ১৯ বছরের তরুণী।

সেই ঘটনার পর কেটে গেছে প্রায় ১৩ বছর। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে ঐশীর জীবনও। একসময় যে নামটি ছিল দেশের অন্যতম আলোচিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত, আজ সেই ঐশী কাশিমপুর মহিলা কারাগারের ভেতরে বই আর ফুলের পরিচর্যায় কাটাচ্ছেন দিন।

- Advertisement -

কারাগারের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে থাকা ঐশী এখন বন্দিদের কাছে পরিচিত একজন বইপ্রেমী মানুষ হিসেবে। কারা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কারাগারের লাইব্রেরিতে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দুই ধাপে লাইব্রেরির বই নিবন্ধনের কাজ করেন।

কোন বন্দি কোন বই নিয়েছেন, কখন বই ফেরত দিয়েছেন—এসব তথ্য নিয়ম করে খাতায় লিখে রাখেন ঐশী। কারা কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে তিনি খুবই মিতভাষী। প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে বেশি কথা বলেন না। অবসর সময়ে ইংরেজি গল্প ও উপন্যাস পড়েই সময় কাটান।

শেক্সপিয়র থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্য—বইয়ের পাতায় ডুবে থেকে যেন নিজের অতীতকে ভুলে থাকার চেষ্টা করেন তিনি। কারাগারের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও বই এখন তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী।

বইয়ের পাশাপাশি ফুলের বাগানও ঐশীর সময় কাটানোর অন্যতম জায়গা। কারাগারের আঙিনায় থাকা বিভিন্ন ফুলগাছের পরিচর্যা করেন তিনি। অবসরে নিজের আগ্রহেই বাগানে যান, গাছের যত্ন নেন এবং ফুল ফোটানোর চেষ্টা করেন।

তবে বই ও ফুলে ঘেরা এই জীবনেও রয়েছে গভীর একাকীত্ব। কারা সূত্র জানিয়েছে, মাঝে মধ্যে নানার বাড়ির দু-একজন স্বজন তাকে দেখতে আসেন। তবে গত ১৩ বছরে দাদার বাড়ির পক্ষ থেকে কেউ তার খোঁজ নিতে আসেননি বলে জানা গেছে। পরিবার ও সমাজ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে কারাগারের ভেতরেই নিজের আলাদা একটি জগৎ তৈরি করেছেন ঐশী।

ঐশীর জীবনে এখনো রয়েছে দীর্ঘ বন্দিজীবনের বাস্তবতা। এই মামলায় নিম্ন আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। পরে ২০১৭ সালে উচ্চ আদালত তার মানসিক অবস্থা ও পারিপার্শ্বিক বিষয় বিবেচনা করে সেই সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণে তার পারিবারিক পরিবেশ ও বাবা-মায়ের ব্যস্ততার বিষয়টিও উঠে আসে। দীর্ঘ সময় ধরে পারিবারিক দূরত্ব ও যথাযথ যত্নের অভাব তার জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল বলে আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।

কারাগারে এরই মধ্যে প্রায় ১৩ বছর কাটিয়েছেন ঐশী। কারাবিধি অনুযায়ী ভালো আচরণের কারণে সাজা কিছুটা কমার সুযোগ থাকলেও সামনে রয়েছে আরও দীর্ঘ সময়।

একসময় বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল মেয়েকে চিকিৎসক হিসেবে দেখা। মানুষের সেবা করার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। জীবনের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের পর আজ ঐশীর পৃথিবী সীমাবদ্ধ কাশিমপুর মহিলা কারাগারের চার দেয়ালে।

তবু সেই সীমাবদ্ধ পৃথিবীতেই বইয়ের পাতায়, ফুলের বাগানে এবং অন্য বন্দিদের জন্য লাইব্রেরির দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে নিজের জীবনের একটি নতুন অর্থ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles