অভিবাসন পরামর্শকদের জন্য আইন কঠোর করছে কানাডা

অভিবাসন পরামর্শকদের জন্য আইন কঠোর করছে কানাডা - the Bengali Times
অভিবাসন পরামর্শকদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে ফেডারেল সরকার

কানাডায় অভিবাসন পরামর্শকদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে ফেডারেল সরকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও নতুন অভিবাসীদের লক্ষ্য করে প্রতারণার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সরকার নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবে অভিবাসীদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারবে, তা নিয়ে আইনজীবী, ভুক্তভোগী এবং অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। গত মে মাসে অটোয়া সরকার অভিবাসন পরামর্শকদের তদারকি আরও কঠোর করার ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে কলেজ অব ইমিগ্রেশন অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কনসালট্যান্টস-এর ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে অসাধু পরামর্শকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রতারণা কমানো সম্ভব হবে।

নতুন নীতিমালার পেছনে অন্যতম কারণ হলো সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা একাধিক প্রতারণার ঘটনা। বিশেষ করে অন্টারিওতে নিবন্ধিত কিছু অভিবাসন পরামর্শকের সম্পৃক্ততায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত প্রতারণার অভিযোগ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এসব ঘটনায় দেখা যায়, অনেক পরামর্শক অভিবাসন আইন সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার পরিবর্তে বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবি করছেন অথবা অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিয়ে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করছেন।

- Advertisement -

বাংলাদেশি নাগরিক শুভজিত, যিনি ২০২৩ সালে কানাডায় আসেন, এমনই এক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তার ভাষায়, একজন অভিবাসন পরামর্শক তাকে কানাডায় বৈধভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রায় এক লাখ ডলার দাবি করেন। অভিষেকের অভিযোগ, অনেক পরামর্শক মানুষের সংকটকে ব্যবসার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন। তার কথায়, “তাদের কাজ হওয়া উচিত মানুষকে সঠিক পথ দেখানো। কিন্তু অনেকেই সেটা না করে নিজেদের সেবা বা পণ্য বিক্রির দিকেই বেশি মনোযোগ দেন।” তিনি আরও জানান, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক অভিবাসী বাধ্য হয়ে এমন অন্যায্য দাবিও মেনে নিতে রাজি হন।

একজন আইনজীবি যিনি বহু ভুক্তভোগীর হয়ে কাজ করছেন, জানান অভিযোগ করার ক্ষেত্রেও অনেক অভিবাসী ভয় পান। তার মতে, অধিকাংশ ভুক্তভোগী আশঙ্কা করেন যে অভিযোগ করলে তাদের অভিবাসন প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কিংবা ভবিষ্যতে ভিসা বা স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ নষ্ট হতে পারে। তিনি এমন একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে এক অভিবাসী নিজের পরামর্শকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার পর সেই পরামর্শক পাল্টা তারই বিরুদ্ধে কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির  কাছে প্রতারণার অভিযোগ পাঠান। এই ধরনের ঘটনা অভিবাসীদের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক তৈরি করছে বলে মনে করেন তিনি।

তার মতে, নতুন নীতিমালা ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে যেসব ক্ষমতা ইতোমধ্যেই সিআইসিসির হাতে ছিল, সেগুলো এতদিন কেন কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়নি? তার মতে, অভিযোগ দায়ের হওয়ার আগেই সন্দেহভাজন পরামর্শকদের ওপর নিরীক্ষা চালানোর ক্ষমতা কলেজের ছিল। কিন্তু সেই ক্ষমতা খুব কম ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বছরে প্রায় ২৪ মিলিয়ন ডলারের বাজেট থাকা সত্ত্বেও কেন যথাযথ নজরদারি হয়নি? জনবল সংকট কি এর কারণ? নাকি প্রয়োজনীয় তদন্ত পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানের আগ্রহের অভাব রয়েছে? তার মতে, কেবল নতুন নিয়ম তৈরি করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সিআইসিসির প্রকাশিত পরিসংখ্যানও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে কলেজের কাছে মোট ১,২১১টি অভিযোগ জমা পড়ে। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক অভিযোগের বিপরীতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে মাত্র ১৫টি ক্ষেত্রে। এর আগের বছরও পরিস্থিতি খুব একটা ভিন্ন ছিল না। তখনও মাত্র ১১টি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ অভিযোগের তুলনায় শাস্তির হার অত্যন্ত কম, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

কানাডায় অভিবাসনের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। পাশাপাশি অভিবাসন নীতির জটিলতা ও নিয়মের ঘনঘন পরিবর্তনের কারণে অনেক আবেদনকারী ব্যক্তিগত পরামর্শকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসাধু কিছু পরামর্শক বিপুল অর্থ আদায় করছেন অথবা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মানুষের স্বপ্ন নিয়ে ব্যবসা করছেন। আইনজীবীদের মতে, শুধু কঠোর আইন করলেই হবে না; অভিযোগ দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপদভাবে অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

কানাডা সরকারের নতুন নীতিমালা অভিবাসন খাতে জবাবদিহি বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের ওপর। যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা সক্রিয়ভাবে তদন্ত পরিচালনা করে, নিয়মিত অডিট চালায় এবং প্রতারণাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও নতুন অভিবাসীরা উপকৃত হবেন। অন্যদিকে, যদি আগের মতো অভিযোগের পাহাড় জমলেও শাস্তির সংখ্যা সীমিত থাকে, তাহলে নতুন নীতিমালাও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে হাজারো অভিবাসীর প্রত্যাশা একটাই কঠোর নিয়মের পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে যেন কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আস্থা ফিরে আসে।

সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles