
কানাডার অন্টারিওতে বহুল আলোচিত টেইলর সুইফটের ‘এরাস ট্যুর’ কনসার্টের ভুয়া টিকিট বিক্রির ঘটনায় নতুন মোড় এসেছে। দীর্ঘ তদন্তের পর অভিযুক্ত ডেনিস টিসর ও তার লিভ-ইন পার্টনার ডেভিড ব্লেক আদালতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছেন। মিল্টন কোর্টে দোষ স্বীকারের পর তারা আদালত ত্যাগ করেন। তবে আদালত এখনো তাদের সাজা ঘোষণা করেনি। এই মামলাটি শুধু আর্থিক প্রতারণার ঘটনা নয়, বরং শতাধিক মানুষের বিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার এক নির্মম উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভুয়া কনসার্ট টিকিট বিক্রি করে এই দুই অভিযুক্ত প্রায় ২ লাখ ৬৫ হাজার মার্কিন ডলার (প্রতিবেদনে উল্লেখিত অঙ্ক) সংগ্রহ করেন। সেই অর্থের বড় অংশ অনলাইন জুয়ায় হারিয়ে যায় এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ নগদে উত্তোলন করা হয়।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে ছিলেন ট্যামি অ্যালেন। আদালতে অভিযুক্তদের দোষ স্বীকারের ঘটনা সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, যদিও এখনো সাজা ঘোষণা হয়নি, তবুও আদালতে তাদের মুখে অপরাধ স্বীকারের কথা শোনা তার জন্য ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অ্যালেন জানান, তিনি ২০২৩ সালের আগস্টে ডেনিস টিসরের কাছ থেকে টিকিট কিনেছিলেন। মোট ১৭০ জনের মতো মানুষ একইভাবে প্রতারণার শিকার হন। তিনি টিসরকে আগে থেকেই চিনতেন এবং স্থানীয় কমিউনিটিতে নিয়মিত দেখেছেন। এমনকি সম্প্রতি আদালতের শুনানির আগের সপ্তাহেও তাকে দেখেছেন। তাই প্রথমদিকে তার মনে কোনো সন্দেহই জাগেনি। অ্যালেনের অভিযোগ, এত কিছু ঘটার পরও অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কোনো আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখা যায়নি।
২০২৪ সালে টেইলর সুইফট টরন্টোর রজার্স সেন্টারে টানা ছয়টি ‘সোল্ড-আউট’ কনসার্ট করেন। এই সময় বিপুল সংখ্যক মানুষ টিকিট সংগ্রহের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। সেই সুযোগই কাজে লাগান টিসর ও ব্লেক। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের বড়দিনের উপহার হিসেবে এই কনসার্টের টিকিট কিনেছিলেন। কারণ, এর আগেও টিসর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি করেছিলেন এবং অনেকেই তাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করতেন। কিন্তু কনসার্টের দিন যত এগিয়ে আসে, ততই দেখা যায় প্রতিশ্রুত টিকিট আর পৌঁছাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত বহু পরিবার বুঝতে পারেন, তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। অনেক শিশুর বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্ন ভেঙে যায়, আর অভিভাবকদের সামনে তৈরি হয় বিব্রতকর পরিস্থিতি।
তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ অন্টারিওর অন্তত ১০৭ জন ব্যক্তি ডেনিস টিসরের কাছ থেকে মোট ২ লাখ ৬৫ হাজার ৩৩০ ডলারের টিকিট কিনেছিলেন। প্রথমদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে টিসর দাবি করেছিলেন, তৃতীয় একটি পক্ষ তার কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে সংবাদমাধ্যম সিটিভি নিউজের সঙ্গে কথা বলার সময়ও তিনি একই দাবি করেন। কিন্তু আদালতের নথিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, টিকিট বিক্রির সঙ্গে কোনো তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততা ছিল না। বরং টিসর ও ডেভিড ব্লেক দুজনেই জানতেন যে তারা ক্রেতাদের প্রতারণা করছেন।
তদন্তে আরও জানা যায়, ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত টিকিট বিক্রির মাধ্যমে পাওয়া অর্থের অন্তত ১ লাখ ৩৯ হাজার ১৪৪ ডলার বিভিন্ন অনলাইন গেমিং ও বেটিং প্ল্যাটফর্মে খরচ করা হয়। একই সময়ে অভিযুক্তরা প্রায় ৩৫০ বার এটিএম থেকে নগদ অর্থ উত্তোলন করেন, যার মোট পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার ডলার। তদন্তকারীদের মতে, প্রতারণার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাস ও জুয়ার পেছনে ব্যয় করা হয়েছে, যা মামলার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ডেনিস টিসর অনলাইনে “ডেনিস ব্লেকহক” নামে পরিচিত। আদালত প্রাঙ্গণে তিনি কোনো সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দেননি। তবে পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দীর্ঘ এক বিবৃতি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, “আজ আমি শুধু একটি কথাই বলতে চাই আমি দুঃখিত। দুই বছর আগে আমি ভয়াবহ জুয়া আসক্তিতে ভুগছিলাম। সেই আসক্তি আমার পুরো জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছিল।” যদিও এই ক্ষমা প্রার্থনা অনেক ভুক্তভোগীর ক্ষোভ কমাতে পারেনি। তাদের দাবি, শুধুমাত্র দুঃখ প্রকাশ নয়, ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরত দেওয়া এবং কঠোর শাস্তিই প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করতে পারে।
ডেনিস টিসর ও ডেভিড ব্লেক ইতোমধ্যেই নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছেন। তবে আদালত এখনো তাদের সাজা ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেনি। অভিযুক্তরা দোষ স্বীকার করায় বিচার প্রক্রিয়া কিছুটা সংক্ষিপ্ত হতে পারে। তবে প্রতারণার পরিমাণ, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা এবং সংগৃহীত অর্থের অপব্যবহারের বিষয়গুলো আদালতের শাস্তি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, শুধুমাত্র পরিচিত মুখ বা পূর্বের লেনদেনের ওপর নির্ভর করে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে জনপ্রিয় কনসার্ট, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বা বড় ইভেন্টের টিকিট কেনার ক্ষেত্রে প্রতারক চক্র মানুষের আবেগকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই মামলায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, অভিযুক্তরা দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করার পর সেই বিশ্বাসকেই প্রতারণার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ফলে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বহু পরিবার মানসিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভবিষ্যতে এমন প্রতারণা এড়াতে শুধুমাত্র অনুমোদিত বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম থেকে টিকিট কেনা, অর্থ পরিশোধের আগে টিকিটের সত্যতা যাচাই করা এবং সন্দেহজনক লেনদেনের ক্ষেত্রে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।

