
কানাডায় বসবাসরত স্থায়ী বাসিন্দা ও নাগরিকদের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির ফেডারেল সরকার। বাবা-মা এবং দাদা-দাদী/নানা-নানীদের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে কানাডায় আনার জন্য যে প্যারেন্টস অ্যান্ড গ্রান্ডপ্যারেন্টস প্রোগ্রাম চালু রয়েছে, সেই কর্মসূচির আওতায় নতুন আবেদন গ্রহণ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ফেডারেল সরকারের অভিবাসন বিভাগ জানিয়েছে, কর্মসূচির প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ, বিপুল সংখ্যক জমে থাকা আবেদন এবং দীর্ঘ অপেক্ষার সময় কমানোর লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, এটি কোনো স্থায়ী বন্ধ নয়; বরং বিদ্যমান আবেদনগুলোর চাপ সামাল দিয়ে পুরো ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনার উদ্যোগ।
অভিবাসন বিভাগের প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, বর্তমানে ৬০ হাজার ৫০০টিরও বেশি আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এত বিপুল আবেদন একসঙ্গে নিষ্পত্তি করতে গিয়ে অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। বর্তমানে কানাডার অধিকাংশ অঞ্চলে এই কর্মসূচির আবেদন নিষ্পত্তিতে গড়ে ৩৩ মাস পর্যন্ত সময় লাগছে। তবে কুইবেক প্রদেশে পরিস্থিতি আরও জটিল। সেখানে একই ধরনের আবেদন নিষ্পত্তিতে ৬৬ মাস, অর্থাৎ সাড়ে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সরকারের মতে, নতুন আবেদন গ্রহণ অব্যাহত থাকলে অপেক্ষার সময় আরও বেড়ে যাবে এবং আবেদনকারীদের ভোগান্তিও বৃদ্ধি পাবে। তাই আপাতত নতুন আবেদন বন্ধ রেখে বিদ্যমান ফাইলগুলোর নিষ্পত্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্যারেন্টস অ্যান্ড গ্রান্ডপ্যারেন্টস প্রোগ্রাম নতুন নয়। ২০২০ সালে এই কর্মসূচি চালু হওয়ার পরই এর প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। সেই সময় দুই লক্ষেরও বেশি স্থায়ী বাসিন্দা ও কানাডিয়ান নাগরিক তাদের বাবা-মা বা দাদা-দাদী/নানা-নানীদের স্পন্সর করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সীমিত সংখ্যক আসনের কারণে প্রতি বছর লটারির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সংখ্যক আবেদনকারীকে পূর্ণাঙ্গ আবেদন জমা দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই সীমিত কোটা এবং ক্রমবর্ধমান আবেদনই বর্তমানে দীর্ঘ অপেক্ষার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিবাসন বিভাগের এক কর্মকর্তা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, নতুন আবেদন গ্রহণ সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও ইতোমধ্যে জমা পড়া আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াকরণ চলবে। একই সঙ্গে সরকারের অভিবাসন পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ ও ২০২৭ সালে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মানুষকে এই কর্মসূচির আওতায় স্থায়ী বাসিন্দার অনুমোদন দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রাও অপরিবর্তিত থাকবে। অর্থাৎ, বর্তমানে যাদের আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই স্থগিতাদেশ সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।
এই সিদ্ধান্ত কানাডার সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতির একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন। গত শরতে প্রকাশিত সরকারের নতুন অভিবাসন পরিকল্পনায় ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৩ লাখ ৮০ হাজার স্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অতীতের তুলনায় এটি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত অভিবাসন নীতির ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া সরকার ২০২৬ সালে অস্থায়ী কর্মসংস্থান ভিসা এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্টাডি পারমিটের সংখ্যাও ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কানাডা এখন অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও ভারসাম্যপূর্ণ করার দিকে এগোচ্ছে।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে প্যারেন্টস অ্যান্ড গ্রান্ডপ্যারেন্টস প্রোগ্রাম-এর মাধ্যমে পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের কানাডায় স্থায়ীভাবে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে আসছেন। নতুন আবেদন সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ায় যারা এখনও আবেদন জমা দিতে পারেননি, তাদের অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করতে হবে। তবে যাদের আবেদন ইতোমধ্যে জমা পড়েছে, তাদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। এই সময়ে অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে Super Visa-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি ভিজিটর ভিসার সুযোগ বিবেচনা করতে পারেন, যদিও সেটি স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেয় না।
কানাডা সরকার নতুন আবেদন স্থগিতের মাধ্যমে মূলত বিদ্যমান আবেদন জট কমানো এবং অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা করছে। তবে এই সিদ্ধান্ত হাজারো পরিবারের পারিবারিক পুনর্মিলনের পরিকল্পনাকে সাময়িকভাবে পিছিয়ে দিতে পারে। আগামীতে আবেদন গ্রহণ আবার কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি জানানো হয়নি। ফলে নতুন আবেদনকারীদের সরকারের পরবর্তী ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

