
অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছিলেন উসমান তারিক। পরিবারের আর্থিক অনটন মেটাতে প্রথমে আফগানিস্তানের কাবুলে যান। সেখানে দেখা করেন কাজিন হাসিবের সঙ্গে। হাসিব তাকে একটা কাজও জুটিয়ে দেন। তবে সেখানে কাজের পরিবেশ ভালো না হওয়ায় পরবর্তীতে তিনি দুবাইয়ে পাড়ি জমান।
দুবাইয়ে থাকাকালীন উসমান সোনাপুরের লেবার অ্যাকোমোডেশনে থাকতেন এবং একটি রেস্তোরাঁর কিচেনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কখনও পেঁয়াজ কাটতেন। কখনও অন্য কোনও সবজি কাটতেন। ফলে তার পিঠে ব্যথার সমস্যাও তৈরি হয়েছিল। এছাড়া তিনি গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকানে সেলসম্যান হিসেবেও কাজ করেছেন কিছুদিন।
দুবাইয়ে কাজের ফাঁকে সময় পেলেই উসমান দেখতেন মহেন্দ্র সিং ধোনির বায়োপিক ‘এমএস ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’। যে সিনেমাটা তাকে আমূল বদলে দিয়েছিল। এই সিনেমা দেখেই তিনি প্রায় সাত বছর প্রবাস জীবন কাটানোর পর ২০১৭ সালে আবারও ক্রিকেটে ফেরার স্বপ্ন দেখার সাহস পান এবং চাকরি ছেড়ে পাকিস্তানে ফিরে নতুন করে ক্যারিয়ার শুরু করেন।
উসমানের বোলিং অ্যাকশন বেশ অদ্ভুত-বল ছোঁড়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি একবার থেমে যান। মানে এক রকম pause দেন, যা ব্যাটারদের বিভ্রান্ত করে। তিনি একে তার শরীরের জৈবিক গঠন বা ‘ডাবল এলবো’ কন্ডিশন বলে দাবি করেছেন এবং বায়োমেকানিক্স ল্যাব থেকে দুবার ক্লিয়ারেন্সও পেয়েছেন। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে পাকিস্তান জাতীয় দলে তার অভিষেক হয় গত বছর নভেম্বরে, লাহোরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। বিশ্বকাপে প্রথমবার ডাক পাওয়া উসমানকে দেখা হচ্ছে পাকিস্তানের ‘এক্স ফ্যাক্টর’ হিসেবে।
উসমান ১৯৯৫ সালের ৭ জুন পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ার নওশেরা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই এই অঞ্চলের ক্রিকেট সংস্কৃতির প্রভাবে তিনি টেপ টেনিস বলে ক্রিকেট খেলা শুরু করেন। দুবাইয়ে কাজের সন্ধানে গিয়েও তাই ক্রিকেটকে ভুলতে পারেননি। মূলত ফাস্ট বোলার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও দুবাইয়ের দেরা এলাকায় স্ট্রিট ক্রিকেট খেলার সময় স্পিন বোলিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং তার বর্তমান ‘রহস্যময়’ বোলিং অ্যাকশনটি রপ্ত করেন ।
ছবিবিতর্কের পাশ কাটিয়ে শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। কলম্বোয় উদ্বোধনী ম্যাচে মাঠে নামবে নেদারল্যান্ডস-পাকিস্তান। তবে বিশ্বকাপের শুরু আগমুহূর্তে পাকিস্তান দলে আলোচনায় এই রহস্যময় স্পিনার। বোলিং অ্যাকশন নিয়ে ওঠা প্রশ্ন, অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটার ক্যামেরন গ্রিনের ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ-সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বকাপের ঠিক আগে উসমানকে ঘিরে বাড়তি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে পাকিস্তানের সামনে চ্যালেঞ্জটা সহজ নয়। রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ‘এ’ গ্রুপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান। ফলে সুপার এইটে উঠতে হলে নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র ও নামিবিয়ার বিপক্ষে ম্যাচগুলোতে জয় পেতেই হবে বাবর আজমদের দলকে। এই প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক দুর্বল দলগুলোর বিপক্ষেও সতর্ক থাকতে হবে সালমান আঘাদের।
পেঁয়াজ কাটার ছুরি ছেড়ে যিনি আজ হাতে তুলে নিয়েছেন ক্রিকেট বল, দুবাইয়ের সেই সাধারণ হোটেল বয় উসমান তারিক এখন বিশ্ব ক্রিকেটের এক বিস্ময়কর ধাঁধা। অভাবের তাড়নায় দেশ ছাড়া, ১৭ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি, আর ধোনির সিনেমা দেখে আবারও স্বপ্ন ছোঁয়ার সেই জেদ-সবটাই যেন রূপকথাকে হার মানায়। পরিশ্রম আর প্যাশন থাকলে যে ভাগ্যকেও বদলে দেওয়া যায়, উসমান তারিক তার জলন্ত প্রমাণ। লড়াকু এই ক্রিকেটার কি পারবেন এবারের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের তুরুপের তাস হতে? উত্তরটা না হয় সময়ের হাতেই তোলা রইলো।

