7.9 C
Toronto
বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৮, ২০২১

আশেপাশের বিড়ম্বনা

- Advertisement -
ছবি/কাজী সারওয়ার

কোথাও বেড়াতে গেছেন..আত্মীয়..বন্ধু..হৈ..চৈ। ফেরার সময় হলো। আর সব পরিবার লাফিয়ে লাফিয়ে নিজেদের গাড়ীতে উঠে চলে গেল। আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন। কেউ ডাকলো না। হেঁটে হেঁটে বাস স্ট্যান্ডে এলেন বা রিক্সা নিলেন। মলিন কাপড় পড়া রোগা রিক্সাওয়ালা। প্রানহীন ষ্ট্রীট লাইটের আলোয় বৈরী শহর।

বা কেউ একজন ডেকেই বসলো..”আরে মাসুদ…আসো আমি নামিয়ে দিচ্ছি।“ ছোটো চাচার পয়সা অনেক। চকচকে গাড়ী। চাচা মানুষ ভালো না। সংগে যেতে ইচ্ছা করছিলো না….আবার লোভও হলো। দেখি গাড়ীটা কেমন? আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন। এ আসেতো….সে আসে না…চাচাতো বোনগুলার রং ঢং দেখছেন…। হটাৎ দেখা গেলো গাড়ী ভরে গেছে। জায়গা নাই। চাচী মুখ চিকন করে বললো..”এতো চিপাচিপি করে যেতে পারবো না……মাসুদ তুমি রিক্সা নিয়ে নাও। ভাড়া লাগবে?”

- Advertisement -

আপনার তখন মাথায় আগুন ধরে গেছে। কেন..কেন… লোভ করলেন? প্রানহীন ষ্ট্রীট লাইটের আলোয় সত্যিকার বৈরী শহর।

বা ধরেন গাড়ীতে উঠেই পড়লেন। গাড়ী চলছে। এটা সেটা কথা হচ্ছে। ছোটো চাচা খুব হাসছে। নাহ্…চাচা যতোটা ভেবেছিলেন ততোটা খারাপ মানুষ না…জানি ঘুষ-টুষ খায় অনেক। তাতে কি? কে না খায় বাংলাদেশে। তার জন্যই এতো দামী একটা গাড়ীতে উঠা আজ সম্ভব হলো। বাসার সামনে পৌঁছে যখন ভাব নিয়ে গাড়ী থেকে নামবেন…..তখন মোড়ের বন্ধুরা দেখবে…..সামনের বাসার বারান্দা থেকে লতা আর তার পরিবার দেখবে। আপনার গলিতে আর কারো বাসায় এতো দামী গাড়ী আসেই না। সেই গাড়ী থেকে তাদের নামারও প্রশ্ন উঠে না।

- Advertisement -

আপনার বাসা থেকে মাইল তিনেক দূরে…যেখানে থেকে রিক্সা বা বাস পাওয়াই বিরাট ঝামেলা…ছোটো চাচা গাড়ী থামালেন। “মাসুদ এখান থেকে হেঁটে চলে যাও। কাছেই তো। তোমাদের যে গলি…ঢুকলে আর আজ বেরুতে হবে না।“ আপনি নামলেন। প্রানহীন ষ্ট্রীট লাইটের আলোয় সাপের চোখের মতো বৈরী শহর। রাস্তায় আপনার লম্বা লম্বা ছায়া।

- Advertisement -

বাংগালী মধ্যবিত্তদের অনেক না পাওয়ার বেদনার মতো ‘গাড়ী’ নিয়ে একটা দু:খের স্মৃতি থাকবেই থাকবে। আমারও একটা আছে।

আম্মার তখন শরীর ভালো না। ঘন ঘন ডাক্তারের কাছে নিতে হয়। উবার যুগের আগের ঢাকা শহর। ভট ভট করে চলা তিন ষ্ট্রোকের কুৎসিত হলুদ বেবি ট্যাক্সি আমাদের সম্বল। তাও পাওয়া বিরাট কঠিন। হাতে পায়ে ধরতে হয়। এক দিন তাও জুটলো না। হঠাৎ একটা চকচকে ইয়েলো ক্যাব চোখে পড়লো। নতুন নেমেছে তখন। যেতে চাইলাম…রাজী হয়ে গেল! আম্মা ক্যাবে উঠে আরাম করে বসলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই গাড়ীটা খুব ভালো। বসে আরাম। বেশ নিচু। বেবি ট্যাক্সি উঁচু। আমার উঠতে কষ্ট হয়।“

এই এক দিনই নিজের একটা গাড়ী না থাকার জন্য বেশ কষ্ট পেয়েছিলাম। কষ্ট আমার জন্য না। আম্মার জন্য। আম্মা মুখ ফুঁটে কিছু বলতেন না কখনো। আমাদের আম্মারা বলতেন না। শাড়ীর কথা..গয়নার কথা…টাকার কথা…আয়েশের কথা…শুনি নাই। এই যে জীবনের বড় সময় ধোঁয়া ধোঁয়া রান্না ঘরে কাঁটিয়ে দিলেন….কিছু বললেন না। এই সময়ের স্ট্যান্ডার্ডে যে কেউ বলবে….কি ভয়াবহ জীবন ছিল তাদের।

আজকে এতোগুলা বছর পরে মায়ের কবর থেকে হাজার মাইল দূরে বসে আমার এখনো বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়…..আম্মা একদিন ঠিক ঠিক চলে আসবেন! আমি তাকে গাড়ীতে আমার পাশে বসাবো।

“আম্মা…এসি ছাড়বো? না জানালা খুলে দেব?”

আম্মা হেসে দিয়ে বলবেন…”জানালাই খুলে দাও। আজ ওয়েদার ভালো। এসিতে আরাম লাগে না। তোমাদের কানাডা সুন্দর দেশ..কিন্তু ঠান্ডায় জানালাই খোলা যায় না। সাবধানে গাড়ী চালাও। ফি আমানিল্লাহ!“

আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সাবধানী ড্রাইভার…আমার মাকে নিয়ে দূর দূর রাস্তায় উঠে যাবো।

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles