7.8 C
Toronto
বুধবার, এপ্রিল ১৭, ২০২৪

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : ছয়

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : ছয়

রাতের পর দিন দিনের পর রাত এসে দ্রুত গতিতে সময় চলতে লাগলো । জীবনে কতো ঘটনা ঘটে যায় , কিছু ভৌতিক কিছু অলৌকিক । আমরা বুঝতে পারিনা অনেক কিছুই। রোজ বিকেলে কমপ্লেক্সের ছোট ছোট বাচ্চারা বের হয়ে আসতো বিল্ডিঙের নীচে প্লে গ্রাউন্ডে খেলতে। সাথে সবার মা, বাবা, বা নেনি মোট কথা বড় কেউ সাথে থাকতো । আমার মেয়েকে করুনার সাথে পাঠাতাম । মাঝে মাঝে আমিও নেমে আসতাম আমার ছেলেকে নিয়ে দেখতে বাচ্চারা কে কি করছে । মাঝে মাঝে ওদের খেলার ছবি তুলতাম। বেশ কিছুদিন লক্ষ্য করছিলাম একটা নতুন ছেলেও খেলতে আসে। বারো তেরো বছর বয়েস হবে। টকটকে গায়ের রঙ। কি মিষ্টি চেহারা। দেখলে চোখ ফেরানো যায় না। ভেবে নিলাম নতুন কেউ এসেছে হয়তো এই কমপ্লেক্সে । ছেলেটা প্রতিদিন আসতো না মাঝে মাঝে আসতো , থাকতো ও না বেশী সময়। মিনিট দশেক বাচ্চাদের সাথে ছুটা ছুটি করে চলে যেতো । আমি মাঝে মাঝে ক্যামেরা নিয়ে বের হতাম । আমার ছেলে মেয়ের ছবি তুলতাম । কয়েকটাতে নতুন ছেলেটার ছবিও তুলেছি । এতো সুন্দর ছেলেটা আমি ছবি তোলার লোভ সামলাতে পাড়লাম না । আমি ছেলেটার নাম জিগ্যেস করলাম । ছেলেটা হেসে এড়িয়ে গেলো কিন্তু বললো না। আমি বিস্মিত হোলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম “ তোমার সাথে আমার বাচ্চাদের সাথে কয়েকটা ছবি ক্লিক করি “? ছেলেটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো । শুধু ঐ ছেলেটার সাথে না অন্যান্য আমাদের কমপ্লেক্সের বন্ধুদের ছেলে মেয়েদের ছবিও ঊঠালাম।

- Advertisement -

তখনতো এখনকার মতো সাথে সাথে দেখা যাবার মতো ডিজিটেল ক্যামেরা ছিলো না। আমরা ফিল্ম কিনে ছবি তুলতাম তারপর স্টুডিওতে পাঠাতাম ছবি ওয়াশ করার জন্য। তারপর কয়েকদিন পর সে ছবি পেতাম। আমার সাথে সাথে ছেলে মেয়েদের বাবা মায়েরাও বাচ্চাদের খেলার ছবি তুললো । সবাই ছবি ওয়াস করতে পাঠালো । একেকজন একেক সময় ছবি সংগ্রহ করলেন তাদের সুবিধা মতো । আমিও করলাম। কিন্তু কি অদ্ভুত ব্যাপার সবার সব ছবি সুন্দর করে আসলো কিন্তু ছেলেটার ছবি এলো না কেনো ? ছেলেটা যেখানে ছিলো সেখানটা একটা কালো শেড ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সব গুলো ছবির একই অবস্থা। আমি কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে আমার স্বামীকে ছবিগুলো দেখালাম। সেও একটু চিন্তিত হোল । পরদিন বিকেলে আমি একাই নীচে গেলাম বাচ্চাদের ঘরে রেখে, অন্যদের সাথে কথা বলতে যারা বাচ্চাদের ছবি তুলেছিলো । আমি নীচে নামতেই অন্যরা এগিয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো , বাচ্চাদের ছবিগুলো এনেছো স্টুডিও থেকে? আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম। আমি ওদের পাল্টা প্রশ্ন করলাম কেনো বলো তো ? ওরা একে অপরের মুখ চাওয়া চায়ি করে অদের ছবিগুলো আমাকে দেখালো । আমি বিস্মিত হয়ে দেখলাম আমার ছবির মতোই ওদের ছবিতেও ছেলেটির জায়গাতে একটা শেড । ভীষণ রকম একটা আলোড়ন সৃষ্টি হোল সবার মাঝে ছেলেটি তাহলে কি? খুব আশ্চর্য ছবি আমাদের হাতে পাওয়ার পর আমরা আর কখনো ছেলেটিকে দেখতে পাইনি। এতো বছর পর এখনো আমার মনে প্রশ্ন আসে ছেলেটি কে ছিলো ? মাঝে মাঝে এসে বাচ্চাদের সাথে কিছুক্ষন খেলে যেতো ? যার ছবি কখনো আসেনি এসেছে একটা শেড । সেটা এমনই একটা ঘটনা লোকে শুনলে চিন্তা করবে এটা একটা ভৌতিক গল্প। আসলেই ব্যাপারটা সে রকমই ছিলো ।

দেখতে দেখতে আমার মেয়েটার সাত বছর আর ছেলেটার আড়াই বছর হয়ে গেলো । ওদের বাবারও বছরের ছুটির সময় এগিয়ে এলো । ছেলে মেয়ে দুজন কে নিয়ে এবার আমাদের বেড়াতে যাবার প্লেন।

জানি দুই বাচ্চা নিয়ে বেড়ানোটা খুব বেশী আরাম দায়ক হবে না। কেনো যেনো মনটাও টানছিলো না। যাবার আগের দিন বসার রুমের ওয়াল থেকে একটা বড় পেইন্টিং নিজে নিজে খুলে পড়ে গেলো । মনটা আমার বিষন্ন হয়ে গেলো । আমার বর আমাকে সান্তনা দিয়ে বললো , আরে এটা কিছু না ,ওয়ালের পিনটা মনে হয় লুজ হয়ে পেইন্টিংটা পরে গেছে ফিরে এসে মজবুত করে লাগিয়ে দেবো । আমি ভাবলাম হয়তো তাই। আমরা করুনাকে এক বন্ধু পরিবারে রেখে আমরা রওয়ানা হয়ে গেলাম প্রথম সাইপ্রাস ও পরে টার্কি যাবো সে ভাবেই টিকেট করা হয়েছে।

কুয়েতে বসেই আমরা সাইপ্রাসে থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে হোটেলে থাকাটা খুব একটা আরাম দায়ক হবে না বলে আমরা একটা এপার্টমেন্ট ভাড়া করে ফেলেছিলাম সর্ট টাইমের জন্য। সেখানে টুরিষ্টদের জন্য এরকম অল্প দিনের ভাড়া পাওয়া যেতো । আমরা দুই সাপ্তাহ থাকলাম সাইপ্রাসে । সেখানে গিয়ে একটা ট্যাক্সি ঠিক করে নিয়েছিলাম। আমাদের সময় মতো সে ট্যাক্সি চালক আমাদের ঘুরতে নিয়ে যেতো । সে ট্যাক্সি চালক ভীষণ আন্তরিক ভাবে আমাদের পুরো সাইপ্রাস ঘুরে দেখিয়েছিলো । খুব আরাম করে বাচ্চাদের নিয়ে সাইপ্রাস ঘুরতে পেরেছিলাম।

সাইপ্রাস থেকে আমরা চলে গেলাম টার্কি । খুব ভালো লাগলো টার্কি । প্রচুর দর্শনীয় জিনিষ আছে টার্কিতে । যদিও বাচ্চাদের নিয়ে আমাদের অনেক ব্যস্ত থাকতে হয়েছিলো । সেখানে আমাদের যে টুরিষ্ট গাইড ছিলো অসাধারন সুন্দর একজন যুবক । ব্যবহার ছিলো অতুলনীয় । আমাদের বাচ্চাদের অনেক আদর যত্ন করেছিলো । সে যুবকের সাথে আমার বাচ্চাদের ছবি এখনো আছে। টার্কিতে প্রচুর কেনা কাটা করলাম। যা দেখছিলাম তাই ভালো লাগছিলো । অবশ্য শপিং করাটা আমার একটা অসুস্থতা। কোথাও গিয়ে কিছু কিনবো না সেটা কি করে হয়। এই অভ্যাস এখনো আমি যত্নের সাথে লালন করে যাচ্ছি ।

বেড়ানো শেষ । ফিরে এলাম নিজেদের জায়গাতে। করুনাকেও আমাদের বন্ধুর বাড়ী থেকে আনিয়ে নিলাম। কিন্তু আমরা কল্পনাও করতে পারিনি কয়েকদিন পরেই আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে। আমাদের ফিরে আসার চারদিন পর, হঠাৎ করে রাত দুইটা কি আড়াই টা প্রচণ্ড ভাবে গুলাগুলির আওয়াজ । মাঝে মাঝে বম্বিং এর আওয়াজ। আমরা সবাই লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠে গেলাম কি হচ্ছে এসব? আমার ছেলে ঘুম থেকে উঠে ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো । মেয়েটা ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখলো । আমরাতো কোন কিছুই বুঝতে পারছি না। সে দিনটা ছিল ১৯৯০ সালের অগাস্ট এর দুই তারিখ। আমরা তাড়াতাড়ি টেলিভিশন ছাড়লাম । না টি ভি তে কিছুই হচ্ছে না। তখন আমার স্বামী BBC রেডিও খুললো । B B C তে সারাক্ষণ বলে যাচ্ছে ইরাক কুয়েত আক্রমণ করেছে । ইরাকি সৈন্যরা কুয়েতের মাটিতে ঢূকে পড়েছে কিন্তু কুয়েতের সৈন্যরা তাদের প্রতিরোধ করতে সক্ষম হচ্ছে না।

কারণ কুয়েত এই আকর্ষিক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলো না। আমরা তো ভয়ে অস্থির , ভাবতে লাগলাম আমরা কি আবার ৭১এর ২৫শে মার্চের অবস্থাতে পড়েছি ? লাইট বন্ধ করে বাচ্চাদের ঘূম পারাবার চেষ্টা করতে লাগলাম । কিছু করার নেই আমাদের সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া।

সকাল হতে হতে গোলা গুলি অনেকটা কমে আসলো । B B C থেকে ঘোষনা দেয়া হোল ইরাক কুয়েত দখল করে নিয়েছে । কুয়েতের ক্ষমতায় যারা ছিলেন আমীর , ক্রাউন প্রন্স , মন্ত্রী সবাই মিলে আক্রমনের আভাস পেয়েই স্পেশাল ফ্লাইট নিয়ে সৌদী আরব পালিয়ে গেলেন। পরে থাকলো ক্ষমতা হীন কুয়েতিরা আর আমরা বিদেশীরা । সকালে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি ইরাকি সৈন্যরা আমাদের কমপ্লেক্স বিল্ডিঙের সামনে দিয়ে স্টেন গান হাতে নিয়ে হাটাহাটি করছে। কি সর্বনাশ ! কি হবে এখন। আমাদের এটা ছিলো সরকারী বিল্ডিং । আমার স্বামী কড়া আদেশ করলেন আমরা কেউ যেনো জানালার পাশে না দাড়াই । ওরা যেনো কোন ভাবেই বুঝতে না পারে এই বাসায় কোনো মহিলা আছে। এভাবে আমরা ঘরে বসে দরজা জানালা বন্ধ করে খবর শুনে কাটিয়ে দিলাম কিন্তু আমাদের এ জায়গাটা আমাদের মোটেও নিরাপদ মনে হচ্ছিলো না।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles