22 C
Toronto
শুক্রবার, জুন ২১, ২০২৪

ওয়ালমার্টে বন্ধুর খবর

ওয়ালমার্টে বন্ধুর খবর

ওয়ালমার্টের ভেতর আমাকে খুঁজে পেয়ে আমার বন্ধু স্পেনের ষাঁড়ের মতো নাক দিয়ে বাষ্প বের করে, মেঝেতে পা ঠুকে বলল- তোকে মুরগি খোঁজা খুঁজতেছি! ফোন ধরিস না ক্যা?
– সাইলেন্ট ছিল
– ফেইসবুকে এতো সাউন্ড কোত্থেকে আসে? সারা রাস্তা জামাল কদুর গান বাজাইলি। আর এইখানে তোর কী কাম?
সে মহিলা সেকশনে নজর বুলিয়ে অগ্নিদৃষ্টির বুলেট বৃষ্টি ছুড়ে বলল, ঐ মহিলা কিডা রে?
– কেউ না, বাঙালি..
– বাঙালি পাইলেই ধিতাং ধিতাং নাইচে কোলাকুলি করা লাগবে? তোকে কোথায় নিলো টানতে টানতে?
– সোয়েটার কিনবে তো, তাই আমার মাপ নিলো
– তোর মাপ ক্যা?
– ননদের জন্য কিনবে..
– আর মাপ দিলি তুই? সাব্বাস! অপারেশন করে ফেলে দিছিস নাকি!
– ধ্যাৎ.. ফিরিঙ্গি ননদ আর আমার একই হাইট..
– সত্যি করে বল তো আর কী কী পরায়ে দেখছে? [সে অশ্লীলভাবে ভুরু নাচাতে থাকে]
– ধুর দোস্ত..
.
.
সে ডিটার্জেন্ট সেকশনে ভুরু কুঁচকিয়ে, চশমা খুলে নাকের কাছে কনটেইনার ধরে মিনিট পাঁচেক ধরে গবেষণা করেই যাচ্ছে..। এই সুযোগে আমি মেন্স সেকশনের দিকে হাঁটা দিলাম।
.
অথচ, আমি ডিম কেনার সময় যখন বক্সের ঢাকনা খুলে দেখলাম ডিম ফাটা আছে কি না; ওমা, এটুকুই তার সহ্য হলো না! গালি দিয়ে বলল- অতো বাছাবাছির কি আছে? ডিমও টিপে টিপে দেখা লাগে?
ব্যাটা মারাত্মক স্বার্থপর!
.
তাকে এড়িয়ে চলতে থাকি।
আমি চলি ডালে ডালে, সে চলে উড়ে উড়ে। মেন্স ট্রায়াল রুম থেকে বের হতেই দেখি সামনে ষাঁড়টা দাঁড়িয়ে। বলল, কী ট্রায়াল দিলি এতক্ষন ধরে?
– কিছু না..
– দেখি তোর হাতে কী!
.
সে পাঁচড়াপাঁচড়ি করে আমার মুঠি জোর করে খুলে জাঙ্গিয়ার প্যাকেট ছিনিয়ে নিয়ে চোখ ছানাবড়া করে বলল, ননদের জন্য?
– ধ্যাৎ!
– শালা.. মিস্টার বিন ফেল! মাপ মিলছে?
– না
– না মিললেও তুই এইটাই নিবি! জাঙ্গিয়া পরে দেখার নিয়ম আছে? মুখ মোছ ব্যাটা উল্লুক..
– কিছু আছে?
– আয়নার সামনে দেখ সারা মুখে কী! টয়লেট টিস্যু ল্যাপটায়ে আছে !আমি দৌড়ে ওয়াশরুমে ছুটতে গিয়ে জ্যাকেটের হাতায় আটকিয়ে ঘি এর বয়ামের স্তুপ ফেলে দিলাম। তিনটা কাঁচের বয়াম ফেটে সারা মেঝে একাকার হয়ে তুখোড় বাসনা ছুটতে লাগলো।
ঘি টা নিঃসন্দেহে ভালো।
.
ওয়াশরুমে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ এগিয়ে দিলাম! এই চেহারা নিয়ে কতজনের সাথে যে কথা বলছি… ঝুমুর ভাবীও তো কিছু বলল না?
ছি ছি!
.
তাকে ইচ্ছে করে হারিয়ে ফেলি।
আমাকে খেলনা সেকশনে পেয়ে বলল, আচ্ছা সত্যি করে বলতো আমার থেকে পলায়ে বেড়াচ্ছিস নাকি?
– নাহ.. একজনকে হেল্প করতেছি
– খেলনা তুই পছন্দ করে দিচ্ছিস?
– ভদ্রমহিলা কালার ব্লাইন্ড। তার ছয়টা নাতি নাতনি। একেকজনের পছন্দ একেক রকম। তাই কোনটা কি রঙের, সেইটা বুঝায়ে বলতেছি
– মানবসেবা না! আর আমি যে বললাম শাহী জিরা খুঁজতে?
.
.
আমরা বাজার শেষে ক্যাশ কাউন্টারে বিল দেবার জন্য দাঁড়াই। চিশতী’র গ্রোসারী স্ক্যান করা হয়ে গেলে জিজ্ঞেস করলো, তুই কিছু কিনছিস?
– আমারটা আমি দিচ্ছি
– ঢং করিস না, রাখ এখানে!
আমি ডিম আর জাঙ্গিয়ার প্যাকেটটা রাখলাম। জিনিসটা যদিও এক সাইজ বড় হচ্ছে। পকেট থেকে খালি চানাচুরের প্যাকেট, একটা কোকের খালি ক্যান আর দুটা খালি কিটক্যাট চকলেটবারের প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে ক্যাশিয়ারকে বললাম, এগুলাও স্ক্যান করেন; খাইছিলাম..
.
ওয়ালমার্টের ভেতর সাধারণত ম্যাকডোনাল্ডস থাকে। বললাম, দোস্ত কফি খাই?
– আর কিছু খাবি?
– লার্জ ট্রিপল কফি, ব্লুবেরী মাফিন, বেগল-ক্রিম চিজ আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই
– চানাচুর, চকলেট খাওয়ার পরেও জায়গা আছে?
– গরম সিঙ্গাড়া আছে দোস্ত
– ঝুমুর ভাবী কিনে দিছে?
– হু।
.
আমরা কফি আর আগুন গরম সিঙ্গাড়া খেতে থাকি। আমি উঠে গিয়ে ম্যাকডোনাল্ডস এর বিশাল ক্যাচাপের ডিব্বা প্রেস করে এক গাদা সস এনে সামনে রাখি। সে দ্বিতীয় সিঙ্গাড়াটা হাতে নিয়ে চিলি সসে চুবিয়ে নিয়ে বলল, খাসা জিনিস! এখন ঠিক এইটাই দরকার ছিল। আমার থ্যাংকস পাঠায়ে দিস তোর ভাবী কে। ওয়ালমার্টে এত সুন্দর সিঙ্গাড়া পাওয়া যায় জানতামই না।
ঠিক এ সময় আমার ফোনে বেজে উঠলো জামাল কদুর রিংটোন; ঝুমুর ভাবীর ফোন। ধরেই বললাম- ভাবী, আপনার সিঙ্গাড়া তো দারুণ স্বাদের। আমার বন্ধু খুব পছন্দ করছে। আপনাকে থ্যাংকস জানাইছে।
আমি দূরে সরে গিয়ে কথা শেষ করে এসে আবার খাওয়ায় মন দেই।
.
পার্কিং লটে গাড়িতে মালামাল তুলে বললাম, দোস্ত একটু আসবি?
– কোথায়?
– ঝুমুর ভাবীর ফ্রিজটা একটু তুলে দিতে হবে গাড়িতে। ছোট সাইজ। ওয়েট করতেছে..
সে গজগজ করতে করতে আমার পিছ পিছ আসতে থাকে…
.
.
এবার আমি ড্রাইভ করতে থাকি।
তার গাড়ি বাসায় না নিয়ে চার-পাঁচ ব্লক পাশে ঝুমুর ভাবীর বাসার সামনে পার্ক করি। তারপর আমরা দু’জন ফ্রিজ ধরে বাসার বেজমেন্টে নামিয়ে দিয়ে লিভিংরুমে বসি। সারা বাড়িতে পোলাও কোর্মার গন্ধে মৌ মৌ। আজ উনার মেয়ের জামাই আসবে আমেরিকা থেকে। কোনমতেই আমাদের দুপুরে না খাইয়ে ছাড়বে না..
আহা, কতোদিন এসব খাই না! আমার বন্ধু দাঁত খিঁচিয়ে পাশ থেকে আস্তে করে উচ্চারণ করলো- সব তোর প্রি-প্ল্যান্ড! খাওয়ার গন্ধ পাইলে তুই বেহুঁশ! বাসায় আমার কত কাজ।
.
ওদিকে চিশতীর সাথে ভাবীর জমে গেলো। ভদ্রমহিলা আরেকটা বাড়ি কিনবে মেয়ের জন্য। বিরাট ক্লায়েন্ট। দুই মিলিয়ন ডলারের একটা বাড়ি সেল করতে পারলে বন্ধুর পকেট ফুলে হবে একাকার। আমার ভাগ্যেও জুটবে শাহী-কড়াই বা গরীবে-নেয়াজ রেস্তোরাঁর বিরিয়ানির প্যাকেট।
মনে মনে গালি দিয়ে বললাম, এখন তোর কাজ কোই গেলো? তোকে হাতি দিয়ে টেনেও উঠানো যাবে না ব্যাটা লোভী!
.
সে আমাকে ডেকে বাইরে নিয়ে গিয়ে বিড়ি ফুঁকে উত্তেজিত গলায় বলল- রিপন, মালদার পার্টি পাইছি রে! হাতছাড়া করা যাবে না। একটা কাজ পারবি?
– অবশ্যই!
– ভালো দেখে ছয় পাউন্ড মিষ্টি আর চার পাউন্ড দই কিনে আনতে পারবি প্রিমিয়াম সুইটস থেকে? তুইতো ভালো মিষ্টি চিনিস!
– অবশ্যই!
.
সে তার গাড়ির চাবি আর ক্রেডিট কার্ড আমার হাতে দিয়ে বলল, সময় নাই। কিছু কিনে খাস টিম হর্টন্স এ, খিদে লেগে যাবে। এসে ভাবির খাবার খাস।
.
মিষ্টি কেনার সময় চিশতীর ফোন- রিপন, আরেকটা কাজ ছিল যে..
– বল দোস্ত?
– কীভাবে যে বলি, বলতে খারাপ লাগতেছে। তোর ওপর অনেক চাপ পড়ে যাবে
– কোন সমস্যা না, বল?
– যে স্নো পড়া শুরু হইছে; এ হাতেই গাড়িটা নিয়ে ভাবীর মেয়ে জামাইকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে আসলে ভালো হতো..
– খাওয়া দাওয়া করে পরে বার হই?
– লেট হয়ে যাবে। এক কাজ কর, শাহী কড়াই থেকে বিরিয়ানি নিয় বের হ। আর ফুলের দোকান থেকে ভালো জাতের ফুল হাতে রাখিস।
.
কোথায় ভাবীর হাতের দাওয়াত আর কোথায় রেস্টুরেন্টের বিরিয়ানি! নিজে কিচ্ছু করবে না, সব কাজ আমাকে দিয়ে করায়ে পিঠ চাপড়ানো তার খুব খারাপ অভ্যাস। আর তোষামোদীরও একটা সীমা থাকে, কোন আক্কেলে জামাই কে এয়ারপোর্ট থেকে ফুলের মালা পরায়ে আনতে চাচ্ছে?
হায় রে ব্যবসা! তোর রিয়েল এস্টেট ব্যবসার খ্যাতা পুড়ি!
.
আমি প্রচন্ড খিদে নিয়ে, নাকের ডগা থেকে খাসির রোস্ট, বিরিয়ানি, হাঁসের মাংস, গরুর কাবাব, মুরগির ফ্রাই আর ইলিশের কোর্মা নামিয়ে ফেলে এয়ারপোর্টের দিকে ছুটলাম। এ জগতে এয়ারপোর্টে ঘন্টার পর ঘন্টা যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করার চাইতে খারাপ আর কিছু নাই। যাওয়া, অপেক্ষা করা, রিসিভ করে লাগেজ গাড়িতে তুলে স্নো’র মধ্যে টরন্টোর জ্যামে বসে বাসায় ফেরা মানে কমপক্ষে চার ঘন্টার মামলা।
অনলাইনে চেক করে দেখি তুষার ঝড়ের কারণে ফ্লাইট আড়াই ঘন্টা লেট।

- Advertisement -

আবার চিশতীর মেসেজ- রিপন, জামাই নাকি হোটেলে উঠবে আগে। উনাকে হোটেলে নিয়ে লাগেজগুলা রেখে আয়। রেস্ট নেয়া হলে ধীরে সুস্থে আয়, তাড়াহুড়া করিস না। আর আগেই খবরদার মিষ্টির প্যাকেটে হাত দিস না!
এই শেষ, নাক খপতা দিলাম তার কোনো কাজে আর যাবো না। বিকালেই আমার অটোয়া ফেরার কথা। কাল সকালের খুব গুরুত্বপূর্ণ মিটিংটা মিস হবে।
.
এখন সন্ধ্যা থেকে রাত গড়িয়ে আটটা বাজে।
সারা মিসিসাগা শহর বিশ সেন্টিমিটার তুষারে ঢাকা।
আমি আবার বাথরুম সারতে টিম হর্টনস এর সন্ধানে বের হই..। হাঁটু পরিমান স্নো’র মধ্যে গাড়ি কোনরকমে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে এগুতে থাকি। ওদিকে প্লেন নাকি আকাশে চক্কর খাচ্ছে, ল্যান্ড করতে পারছে না।
ব্যাটা শুধু স্বার্থপরই না, বেকায়দাজনক স্বার্থপর!

- Advertisement -
পূর্ববর্তী খবর
পরবর্তী খবর

Related Articles

Latest Articles