6.1 C
Toronto
সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৪

কথা কন্যা

কথা কন্যা
ছবি ময়ূর দেশপান্ডে

পুঁটি, আব্বা তোরে বোলায়। জলদি ঘরে আয়।

খেলাধুলার বারোটা বেজে গেল। পুঁটির খেলার সাথীরা সবাই বয়সে ওর থেকে ছোট। বিরামহীন কথা বলে পুঁটি। বয়সে ছোট বলে নয়, ওর কথার সাথে তাল মিলিয়ে কথা বলতে পারে না কেউ। সংগত কারণে খেলার মাঠে সে সবার জ্বী হুজুর। অর্থাৎ পুঁটি হলো ছোটদের নেতা।
পুঁটি বললো, আর খেলা হবে না। তোরা সব বাড়ি যা। আমি পুকুরে একটা ডুব দিয়া বাড়ি যাই। আজ আমারে দেখতে আসবে। পছন্দ হইলে বিয়া কইরা নিয়া যাবে দক্ষিণ কান্দি।

- Advertisement -

ঠিক তাই হলো। পুঁটিকে দেখে ওদের পছন্দ হলো। পাত্রের সাথে চারজন লোক এসেছিল। সবাই পুঁটিদের বাড়িতে থেকে গেল রাতে। পুঁটির বাসর হলো অপরিচিত একটি লোকের সাথে। বিয়ের কয়েক ঘণ্টা যা একটু চুপ ছিল। ভোর হতেই তার কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ল উঠানে।
কেডা কোহানে গেলি! হাঁস মুরগী ধইরা আন। গোস্ত ছালুন রানতে হবে।

বিকেলে পুঁটি রওনা দিল শ্বশুর বাড়ি। ওর খেলার সাথীরা লাইনে দাঁড়িয়ে পুঁটিকে বিদায় জানালো। পাল্কিতে ওঠার আগে পুঁটি বললো তোরা মন দিয়া খেলবি। চোরামী করবি না। ছি-বুড়ি খেলতে দম লাগে। ভালো কইরা দম নিয়া দৌড়াইবি।

এক সপ্তাহের মধ্যে পুঁটি নতুন বাড়ির হালচাল সব বুঝে গেল। নতুন বাড়ির সবার নাম মুখস্থ হয়ে গেল দুদিনের মধ্যে। কেউ একটা প্রশ্ন করলে পুঁটি তাদের প্রশ্ন করে দুইটা। সব প্রশ্নের উত্তর দেয় ঠাসঠাস। বেছে বেছে তিন চারজনের সাথে ভাব করে নিলো সে। ওরাই হবে পুঁটির নতুন খেলার সাথী।
পুঁটির শাশুড়ি বউকে শাসন করার সুযোগ পায় না। শাশুড়ির মাথার উকুন বাছা। তার চুলে জবা কুসুম তেল দেওয়া। সুপারি কেটে শ্বশুরকে পান বানিয়ে দেওয়া সবই প্রয়োজনের আগে মিটিয়ে ফেলে পুঁটি। রাতের বেলায় ওর স্বামী শুতে বললে সাথে সাথে শুয়ে পড়ে। পুঁটির নামে শুধু একটাই অভিযোগ। পশুপাখি গরু ছাগলের সাথে যেন সে কথা না বলে।

পুঁটির শ্বশুর এবং স্বামী সরকারী দলের লাঠিয়াল। আদতে এই বাড়ির সব পুরুষ ভাড়াটে সন্ত্রাসী। গুম খুন সবই করে পয়সার বিনিময়। সারাদিন চলে ফুসফাস ঈশফিস কথাবার্তা। পুঁটি যতোটুকু শুনতে পায় তা নিয়ে সে বিচলিত থাকে। একদিন ওর স্বামী ছাত্রদের মাথা ফাটিয়ে জামায় রক্তের দাগ নিয়ে এলো। পুঁটি জানতে চাইলো কী অপরাধে ওদের মাথায় আঘাত করতে হলো। উত্তরে ওর স্বামী বললো ঐ ছেলেগুলা সরকার বিরোধী। দেশের শত্রু। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কথা কয়। জুতা স্যান্ডেল খুইলা খালি পায়ে গান গায়- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো। এইবার বুঝবো রক্ত কারে কয়।

পুঁটির বাবা বাড়ির ঢালুতে বসে বেগুন গাছের পরিচর্যা করছিলো। পুঁটি একলা আসেনি। সাথে একটা যুবক মালপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে দেখে পুঁটি বললো। আব্বা ও আমার চাচাতো দেবর। না না দেবর না, দেবর ছিল। কালকে ওরা আমারে তালাক দিছে। তুমি বিরোধী দল করো তারা সেটা জানতো না। আমিও নাকি তোমার মতো হইছি। তাই আমারে ওদের সংসারে আর রাখবে না। ঐ ছেলের পকেটে চেয়ারম্যানের সই করা তালাক পত্র আছে। তুমি আমার মালপত্র ভিতরে নিয়া যাও। আমি দেখি আমিনা সখিনা সালেহা ওরা সব কোথায়।

চৌদ্দ বছরের মেয়ে পুঁটি এক মাস সাত দিনের মধ্যে বিয়ে এবং তালাক উভয় অভিজ্ঞতা পেয়ে গেল। ঘটনা ঘটেছিল ইয়াহিয়া খান যখন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। কথা বেশি বলা খারাপ অভ্যাস পুঁটি সেটা জানতো। কিন্তু ও চাইতো কেউ একজন এমন করে বলুক যার কথার জালে আটকে গিয়ে সে অতিরিক্ত কথা বলা ছেড়ে দেবে। আজ পর্যন্ত যতজন এই অভ্যাস ত্যাগ করতে বলেছে তারা সবাই বেশি বেশি শাসন করে বারণ করেছে। কিন্তু পুঁটি কারোর শাসন চায় না। সে চায় মায়। পুঁটি মনে করে পৃথিবীর সব ভালো কাজ শুরু হয় মায়া দিয়ে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সম্বন্ধে যতোটুকু সে শুনেছিল তাতে ওর আশা ছিল স্বামী ওর কাছে এসে বলবে এখন থেকে আমরা দুজন দুজনের জন্য কথা বলবো। আমি তোমার জন্য। তুমি আমার জন্য। কিন্তু বিয়ের পর এমন কোন কথা ওদের মধ্যে হয়নি। সে শুনেছিল প্রথম রাতে মালা বদল হয়। তাও হয়নি ওদের। একটি মাত্র কথা ওর স্বামী প্রথম রাতে বলেছিল, হারিকেন নিভাই দাও।

কথা বেশি হোক আর কম, ছেড়ে দেওয়ার কোন কারণ খুঁজে পেলে না পুঁটি। তাই কথাকে কাজে লাগিয়ে সে এগিয়ে যেতে থাকে। লোকজন দাঁড়িয়ে পুঁটির কথা শুনতে শুরু করে। পুঁটি কথার সাথে সাথে তর্জনী উঁচু করার কৌশল রপ্ত করে ফেলে। পাকিস্তানের পরিবর্তে বাংলা ও বাঙালি শব্দগুলো বেশি ব্যবহার করতে থাকে। এক পর্যায়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে বিপুল ভোটে পুঁটি মেম্বর নিযুক্ত হয়ে যায়। গ্রাম-গঞ্জে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে ‘কথা কন্যা’ নামে।

দ্বিতীয় সংসারে পুঁটির একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। পুঁটি নিজ দায়িত্বে সন্তানকে কথা বলার তামিল দেয়। কণ্ঠস্বর উঁচু নিচু করা থেকে শুরু করে কথার শুদ্ধ তাল শেখায়। কখন বিরতি কোথায় যতিচিহ্ন দিতে হয় কোনকিছু বাদ দেয় না। অবশ্য এসব অনেক বছর আগের কথা। এবার নির্বাচনে পুঁটির ছেলে এম পি ক্যান্ডিডেট। পুঁটি তার ছেলের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিচ্ছে। হাট বাজার খেলার মাঠে ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে সেও বক্তৃতা দেয়। আগের মতো জোর নেই তবুও উঁচু গলায় বলে, আমি ছিলাম ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বর। আমার ছেলে এম পি পদে দাঁড়ইছে। ওর শরীরে খাঁটি কথার মধু আছে। কথার রাজা আমার ছেলে। ওকে আপনারা ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন সেই আশায় হাত জোর কইরা অনুরোধ করতেছি। ওর বিপক্ষে যিনি প্রার্থী, তার বাপ-চাচারা আইয়ুব খানের পার্টি করতো। সারা জীবন জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ করছে। ছোট বেলায় আমি কলাগাছের শহীদ মিনারে কালা পতাকা উড়াইছিলাম সেইটা জানতে পাইরা আমার প্রথম স্বামী আমাকে তালাক দিছিল। এখন সেই লোকের মেঝ পুত্র আমার কথার রাজার বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড়ইছে। কলেজ ইউনিভার্সিটিতে আমার ছেলে ডিবেটে ফাস্ট হইছে। আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারবে না আমার ছেলে বাজার থেকে ক্রয় করা পতাকা নিয়া মিছিল মিটিং এ গেছে। নিজ হাতে সে প্রতিবছর পতাকা বানায়। সবুজ জমিনে নিজ হাতে সুঁই সুতা দিয়া লাল সূর্যকে গেঁথে দেয়। যতদিন নীরবতার মূল্য কেউ না বুঝবে। আর- যতদিন এক মানুষ অন্য মানুষের মনের ভাষা বুঝতে না পারবে ততদিন কথা বলার দরকার অবশ্যই আছে।

তাই বর্তমান কথার যুগে আমার সন্তান হইলো যোগ্য প্রার্থী। আপনাদের ন্যায্য রায় আমরা মা-ছেলে মাথা পেতে নিবো। সিদ্ধান্ত এখন আপনাদের হাতে। আপনার ভোট আপনি দিবেন, যাকে খুশি তাকে দিবেন।

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles