26.4 C
Toronto
মঙ্গলবার, মে ২১, ২০২৪

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : বারো

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : বারো

এর মাঝে ইরাক কুয়েতের যুদ্ধ থেমে গিয়েছিলো । ইরাকি সৈন্যরা কুয়েত ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলো আমেরিকার হস্তক্ষেপে । ধুয়ায় অন্ধকারময় কুয়েত কিছুটা আকাশ দেখার মতো পরিস্থিতি হলে সবাই আবার কুয়েতে ফিরে যায়, যার যার কাজে। আমরা রয়ে গেলাম সিঙ্গাপুরে। আমার স্বামী একবার কুয়েত গেলেন আমাদের বাসাটা দেখতে আমাদের মূল্য বান জিনিষ পত্র গুলো নিয়ে আসতে । আমার স্বামী আমাদের বন্ধুর বাসায় উঠেছিলো ।কিন্তু দুঃখ জনক ঘটনা এটাই ছিলো আমাদের বাসায় ঢুকে দেখলো বাড়ীতে কিচ্ছু নেই। সব লুট তারাজ হয়ে গেছে। প্রতিটি যুদ্ধের পর যেমন ঘটে । সে ঝড়টা আমাদের কম্পাউন্ডের বাড়ি গুলোর উপর দিয়ে গেছে। আমাদের সব মূল্য বান জিনিষ তো গেছেই সাথে সারা বাড়ির ওয়াল টু ওয়াল কার্পেট টেনে তুলে নিয়ে গেছে , বাড়ির দামি পর্দা গুলোও নেই। সব চাইতে অবাক কাণ্ড ছিলো আমাদের প্রচুর মূল্যবান বাংলা বই ছিলো সে বইগুলোও নেই।

- Advertisement -

তার সাথে নেই আমার স্মৃতি জড়িত বহু শাড়ী কাপড় , আমার পান চিনির শাড়ী , হলুদের শাড়ী , বিয়ের শাড়ী , বউভাতের শাড়ী আরো কতো কতো শাড়ী । বাংলা বই, বাঙ্গালীদের শাড়ী বাঙালী লুটেরা ছাড়া কে নিতে পারে? আমাদের সমস্থ ফার্নিচার , আমাদের ওয়ালে টানানো পারিবারিক ছবি, বাচ্চাদের ভিডিও কিচ্ছু নেই। মোট কথা পুরোটা বাড়ি এলো মেলো শুন্য । গাড়ীটাও ছিলো না। আমাদের উল্টো দিকে আমাদের এক কুয়েতি বন্ধু ছিলেম। তিনি যখন দেখেছিলেন সবাই মহা আনন্দে আমাদের বাড়ি গুলো লুট তরাজ করছে এমন কি আমাদের এ্যালবাম গুলো ও নিয়ে যাচ্ছে তখন সে কুয়েতের ভদ্রলোক তাদের হাত থেকে কয়েকটি এ্যালবাম রেখে দিয়েছিলো , বলেছিলো তোমরা ওদের ছবির এ্যালবাম নিয়ে কি করবে ফেলেইতো দেবে।

এগুলো আমার কাছে রেখে যাও । আমার স্বামীকে দেখে তিনি চার পাঁচ টা এ্যালবাম ওর হাতে দিয়েছিলেন। কি ভাবে আমাদের এমন সাজানো গুছানো বাড়ীটি লুট করা হয়েছে সেটা জানিয়েছিলেন আমাদের প্রতিবেশী কুয়েতের বন্ধু। তখন আইন শৃঙ্খলা বলে কিছুই ছিলো না। যা ঘটেছিলো আমাদের ৭১ এর যুদ্ধের পর এবং সব দেশেই যা ঘটে থাকে।
কিন্তু খুব আশ্চর্য জনক ব্যাপার ছিলো আমাদের বড় বড় বাসাগুলো লুট তরাজ হলেও বাঙালি এলাকাতে একটা বাড়িও লুট হয় নি। যে ,যে ভাবে বাসা রেখে গিয়েছিলো সে ভাবেই পেয়েছিলো । পুরুষ মানুষরা সবাই মোটা মোটি তাদের কাজে ফিরে আসলেও তাদের ফ্যামিলি বেশ পরে আনতে হয়েছিল কারন কুয়েতের বারুদের আবোহাওয়া অন্ধকার ময় আকাশ তখনো ঠিক হয়নি।

আমরা যে কুয়েত থেকে বেরিয়েছি তারপর কুয়েতে কখনো বেড়াতে যেতেও আমাদের ইচ্ছে হয়নি। যদিও আমাদের সব বন্ধুরা ফিরে গেছিলো । আমার এগারো বছরের সংসার যেখানে নিমিষে লুটেরাদের হাতে চলে গেছে, যেখান থেকে এতো কষ্ট করে বেরিয়ে এসেছি। তারপরও হয়তো যেতাম আমার স্বামীর যদি চাকুরি না থাকতো ।কি করা যাবে আমাদের ফিরে যেতেই হতো ,যেখানে আমরা এমন শুশৃক্ষল সভ্য দেশে নিশ্চিন্তে বাস করছি তাই কুয়েত ফিরে যাবার কথা আমরা কখনো মাথায়ও আনিনি।

এভাবে সে ভাবে সিঙ্গাপুরে তিন বছর কাটিয়ে দিলাম। আবার একটা চিন্তা এসে মাথায় পড়লো । আমরা যখন কুয়েত ছিলাম তখন আমরা ক্যানাডার ইমিগ্রেসানের জন্য অ্যাপ্লাই করেছিলাম। সে ফাইল তিন বছর পর সিঙ্গাপর এসে পৌঁছালো ।কানেডিয়ান এমব্যাসি থেকে আমাদের ইন্টারভিওর ডাক আসলো ।ইন্টারভিও হয়ে গেলো , ইন্টারভিওর লোক জনকে সন্তুষ্ট করে আমরা চলে এলাম। মেডিকেল হোল । কোন কিছুতেই আমরা আটকালাম না। আমাদের ক্যানাডার ইমিগ্রেসান হয়ে গেলো ।

কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো আমার স্বামী । সে কিছুতেই আবার আরেক দেশে গিয়ে স্থায়ী হতে চাচ্ছে না। আবার চাকুরি খুঁজা আবার নতুন করে সংসার সাজানো । অসম্ভব এসব আর সে কিছুতেই করতে রাজী না। ভালো চাকুরী , ভালো বেতন , ভালো ফ্রি বাসা , নিরাপদ সুশৃঙ্খল দেশ, যে দেশে থাকার জন্য মানুষ অতি আগ্রহী সে দেশ ছেড়ে কেনো আমরা যাবো ? তাছাড়া ছয় মাস পরেই আমরা হয়ে যাবো সিঙ্গাপুরের নাগরিক। তাঁর কথায় যুক্তি ছিলো নিঃসন্দেহে কিন্তু আমার যুক্তি ছিলো অন্য রকম। দেশ ভালো অন্য সব কিছু ভালো ঠিক আছে কিন্তু যে দেশে বাড়ীর দাম আকাশ চুম্বী , হাত দিলে হাত পুড়ে যাবার অবস্থা সেখানে অনেক বছর থেকেও আমি আমার মনের মতো একটা বাড়ি কিনতে পারবো না। গাড়ির দাম অন্য দেশের তুলনায় অকল্পনীয় বেশী , সেক্ষেত্রেও আমি আমার মনের মতো আমার পছন্দের একটা গাড়ি কিনতে পারবো না। এবার আসি ছেলে মেয়ের পড়া শুনায় সেখানেই প্রচণ্ড কঠিন এবং প্রতিযোগীটা মুলুক পড়াশুনা । চাইনিজদের পড়াশুনাই হোল জীবনের আদর্শ ও উদ্দেশ্য ।

তাদের সাথে প্রতিযোগীটায় টিকে থাকাটা চাট্টি খানি কথা না। অবশেষে দেখা যাবে ছেলে মেয়েদের পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করাতে হলে আমাদের ক্যানাডা আমেরিকাতে ওদের পাঠাতে হবে। তখন আমাদের জীবন নিঃসঙ্গতায় ভরে যাবে এবং ওদের বাবা মায়ের সাথে বন্ধনটাও কিছুটা হালকা হয়ে যাবে।

ওদেরকে আমাদের ছেড়ে দিতে হবে ওদের মতো করে। এমন অল্প বয়েসের ছেলে মেয়েদের এতো দূর দেশে পাঠাতে আমি একেবারেই রাজী না। সব চাইতে কঠোর আপত্তি আমার যেখানে ছিলো সেটা হোল , সিঙ্গাপুরের নাগরিক সব ছেলেকেই তিন বছর করে বাধ্যতা মুলুক মিলিটারি ট্রেনিং নিতে হবে। এই ব্যাপারটা কোন ভাবেই আমি মেনে নিতে রাজী ছিলাম না। আমার ছেলের জীবন থেকে কেনো আমি তিনটা বছর নষ্ট হতে দেবো ?

এই কারণটাতে অবশ্য আমার স্বামী আমার সাথে সহমত পোষণ করেছিলেন। তাছাড়া ক্যানাডার ইমিগ্রেসান পাবার সপ্ন মানুষ দেখে আর আমরা ইমিগ্রেসান পেয়েও ছেড়ে দেবো , এটা কি করে হয় ? দুজনের যুক্তি তর্কে আমরা দুজনই অটল থাকলাম। যার ফলে প্রতিদিনই চলতে থাকে আমাদের ঝগড়া বিবাদ। তারপর একটা সিধান্তে আমরা আসলাম সময় মতো আমরা ক্যানাডাতে ল্যান্ড করবো একমাসের জন্য এখান থেকে ছুটি নিয়ে এই একমাসে যদি ক্যানাডাতে শিক্ষকতার কোন চাকুরী পাওয়া যায় তাহলে সিঙ্গাপুর ফিরে এসে এখানকার চাকুরী ছেড়ে আমরা ক্যানাডা চলে যাবো । আর তেমন ভালো চাকুরী না পেলে আমরা ক্যানাডার ইমিগ্রেসান ক্যানসেল করে দেবো । এই চুক্তিতে আমাদের ঝগড়ার মিমাংসা হোল ।

ম্যাল্টন, কানাডা

- Advertisement -
পূর্ববর্তী খবর
পরবর্তী খবর

Related Articles

Latest Articles