5.6 C
Toronto
মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৬, ২০২৪

‘শয়তান’ দেহ পাবে কিন্তু মন পাবে না যে কারণে

‘শয়তান’ দেহ পাবে কিন্তু মন পাবে না যে কারণে
একটি বাংলা সিনেমার দৃশ্য

অধুনা ওয়েব কনটেন্ট, টেলিভিশন নাটক বা বাংলা সিনেমার অনেক সংলাপকে জনপরিসরে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এর একটি ‘শয়তান দেহ পাবি তবে মন পাবি না’। সিনেমায় ধর্ষণোদ্যত, যৌন আগ্রাসী খলনায়কের বিরুদ্ধে নায়িকা শেষ বাণ ছুড়ে মারে এ সংলাপের মধ্য দিয়ে। আশির দশক এবং নব্বইয়ের শুরু পর্যন্ত এ সংলাপ পাড়া-মহল্লায় ঘুরে বেড়াত।

সম্প্রতি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের মিডটার্ম পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ‘শয়তান দেহ পাবি, মন পাবি না’ বা ‘শয়তান দেহ পাবি, চিন্তা পাবি না’ উদ্ধৃতি উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের একটি প্রশ্ন করা হয়। ব্রিটিশ হেজিমনির আলোকে সেটির বিস্তারিত বর্ণনা করতে বলা হয় প্রশ্নে। সেই প্রশ্ন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনা।

- Advertisement -

বিষয়টিকে কেউ কেউ অশ্লীল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন প্রশ্ন অনাকাঙ্ক্ষিত বলে অভিযোগ করেছেন। কেউ অবশ্য একে সৃজনশীল প্রশ্ন হিসেবে খুব প্রশংসা করেছেন।

ভারতবর্ষে ইংরেজদের শাসনামলে লর্ড ম্যাকলে যে বলেছিলেন, ভারতীয় জনগোষ্ঠী তৈরি হবে ‘যারা রক্তে ও বর্ণে হবে ভারতীয়, কিন্তু রুচি, মত, নৈতিকতা এবং বুদ্ধিমত্তায় হবে ইংরেজ’-তারই একটি পাল্টা জবাব বলে মনে হতে পারে এ প্রশ্নকে।

বিশ্বজুড়েই বিভিন্ন উপনিবেশী দেশ ভারতবর্ষসহ বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দাদের শোষণ-শাসন করেছে। তাদের চিন্তাকে দখল করতে চেয়েছে। তবে উপনিবেশী শাসনের বিরুদ্ধে চিন্তা-তৎপরতাও চালু ছিল। ব্রিটিশরা যে রুচি, মত বুদ্ধিমত্তায় ইংরেজ চাষ করতে চেয়েছিল, যার ধারাবাহিকতার ভেতর আমরা এখনো আছি; তাকে অস্বীকৃতি জানাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন প্রশ্ন করা হয়ে থাকতে পারে।

যাই হোক, এ বাক্যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘শয়তান’ শব্দটাকে। শয়তান জোর করে দেহ দখলে নিতে পারলেও মন বা চিন্তাকে কবজা করতে পারবে না। যারা আপত্তি তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ বাক্য ব্যবহারে তাদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে ‘দেহ’ শব্দটি। দেহকে যৌনতা হিসেবে ভাবার ট্যাবু বেশ চালু আছে আমাদের সমাজে। এই দেহ অবশ্যই আবার নারীদেহ। যেহেতু সিনেমায় নায়িকাদেরই বলতে শোনা যেত এই কথা, ফলে এটা ভাবতে অনেকে অভ্যস্ত যে এই বাক্যে দেহমাত্রে নারী। অর্থাৎ নারীর যৌনতাকে আবশ্যিকভাবে ধরে নেয়া হয়।

কোনো বাক্য বা শব্দের অর্থ যে শুধু একটাই হয় না, স্থান-কাল ও পাত্র ভেদে একই শব্দ ও বাক্যের অর্থ ভিন্ন হতে পারে তা অনেকে সহজে বুঝতে পারেন না। এটাকে চিন্তার অভ্যস্ততা। একটি শব্দ বা বাক্যের একটাই অর্থ থাকতে হবে; এতে স্থির থাকাটা এক ধরনের গোঁড়ামি।

শব্দ বা বাক্যের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ থাকবেই। যেমন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রশ্ন। যেহেতু বলা হচ্ছে, ‘ব্রিটিশ হেজিমনির’ আলোকে ব্যাখ্যা করতে; তার মানে হলো এর অর্থ ওই সিনেমায় বলা কথার চেয়ে ভিন্ন।

ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কী উত্তর লিখেছেন জানা নাই। তবে আমি সিনেমায় বলা সংলাপের ব্যাখ্যা কী হতে পারে তা নিয়ে ভেবেছি।

আমাদের সিনেমার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার নানা অভিযোগ থাকলেও শুরুর দিকে তা ছিল না। ওই সংলাপ মূলত তখনকারই। বাঙালি ভাবধারায় প্রেমিকা বা স্ত্রীর যে সততা, নিষ্ঠা, নৈতিকতা-এগুলো সব সময় উপজীব্য ছিল অশ্লীলতা যুগের আগের সিনেমাগুলোয়। সেসব সিনেমায় ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য, অনুশাসন মেনে চলার চেষ্টা হতো। সেই চেতনা বা অনুভূতি থেকে সিনেমার খলনায়ককে ‘শয়তান’ বলা হচ্ছে। শয়তান বিষয়ে কম-বেশি আমাদের সবার ধারণা আছে। শয়তানের কাজ হচ্ছে মানুষকে কুপথে পরিচালিত করা, মানুষের ধর্ম নষ্ট করা। একজন ইমানদার মানুষের দায়িত্ব শয়তানের অসওয়াসা থেকে নিজেকে মুক্ত করা। পরিস্থিতির কারণে যদি সে পথভ্রষ্টও হয়, পাপের ভেতর পড়ে যায়-তখনো ইমান নষ্ট করা যাবে না।

হাদিসে রাসুল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ করার আদেশ দিয়েছেন এবং প্রতিবাদের ধরন অনুযায়ী ইমানের স্তর ঘোষণা করেছেন।

হাদিসে আছে, আবু সাঈদ রা. বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি, তোমাদের কেউ যদি অন্যায় কাজ দেখে, তাহলে সে যেন হাত দিয়ে এর সংশোধন করে দেয়। যদি এর ক্ষমতা না থাকে, তাহলে মুখ দিয়ে, যদি তাও সম্ভব না হয় তাহলে অন্তর দিয়ে (ওই কাজকে ঘৃণা করবে আর নির্মূলের ফিকির ও দোয়া করবে), আর এটিই ইমানের নিম্নতম স্তর। (মুসলিম-৮৩)।

‘মানুষরূপী শয়তানের’ শক্তির কাছে ব্যক্তি দুর্বল ও অসহায় হয়ে পড়তে পারে। শারীরিক শক্তিতে কুলিয়ে উঠতে না পারলে তখন, মুখ দিয়ে এর প্রতিবাদ জানানো তার ইমানি দায়িত্ব। সেই ইমানের পরীক্ষা আমরা নায়িকাদের দিতে দেখেছি বাংলা সিনেমায়। শত প্রলোভনেও নায়িকা তার সম্ভ্রম বিকায় না। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে খলনায়ক তার ওপর বলপ্রয়োগ করে। বলপ্রয়োগেও মনের দিক থেকে কাবু হয় না নায়িকা। সে তখন তীব্র বাণ ছুড়ে দেয়, চরম অবজ্ঞা প্রকাশ করে। খলনায়ককে বুঝিয়ে দিতে চায়, দেহ নয় মনই (ইমান) আসল। ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলেও সে তার ইমান ছাড়বে না। মন্দ বা খারাপের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ পায় এ সংলাপে।

দেহের পবিত্রতা নষ্ট হয়ে গেলেও মনের দিক থেকে নায়িকা যেন সফেদ থাকে, নিষ্কলুষ থাকে; সে পরীক্ষা তাকে দিতে দেখেছি বাংলা সিনেমায়।

যদিও বেশির ভাগ বাংলা সিনেমায় শয়তান শেষ পর্যন্ত দেহ পায় না। নায়ক এসে নায়িকাকে উদ্ধার করে। খলনায়ককে মেরে রক্তাক্ত করে ফেলে। আর মারামারি যখন শেষ হয়ে যায় তখন পর্দায় পুলিশের আবির্ভাব ঘটে। সিনেমার সুন্দর ও শরিয়তসম্মত পরিসমাপ্তি ঘটে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles