21.9 C
Toronto
শনিবার, জুন ২২, ২০২৪

নারী কি আসলেই সুখে থাকলে লিপস্টিক লাগান?

নারী কি আসলেই সুখে থাকলে লিপস্টিক লাগান?

দেশে দ্রব্য মূল্যের দাম বাড়লেও নিজের এলাকার (রংপুর) মানুষ কষ্টে নেই বলে দাবি করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি বলেছেন, আমার এলাকার ‘নারীরা দিনে তিনবার লিপস্টিক লাগাচ্ছেন, চারবার স্যান্ডেল বদলাচ্ছেন।’

- Advertisement -

তিনি আরও বলেন, আমি খুব ভালো জানি, আমার এলাকার মানুষের কোনো সমস্যা নেই। আজ বুধবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি মনিটরিং ও রিভিউ কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে অনেকেই একমত নন। দেশের অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের আয়রোজগার কমে গেলে কম বিলাসী পণ্য কেনেন। তারা বিলাসী পণ্য কেনা বন্ধ করে দেন। বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, আর্থিক সংকটে মানুষ একটু বেশিই সাজগোজ করে থাকেন এবং কম বিলাসী পণ্য ব্যবহার করেন।

তার এ মন্তব্যের জবাবে উন্নয়ন ও অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক মাহা মির্জা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওনার কথা অর্থহীন। এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বা খাদ্য-দ্রব্যের যে লাগামহীন দাম এটা তো কেবল ঢাকা কেন্দ্রিক বাস্তবতা নয়। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যে কেবল গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে তা কিন্ত নয়। এর ফলে ঢাকা কিংবা উত্তর বঙ্গ বা দক্ষিণ সব এলাকার মানুষ ই সমানভাবে ভুক্তভোগী।

তিনি বলেন, আমার মনে হয় না বাণিজ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার কোন দরকার আছে। তাছাড়া সাধারণ মানুষ ও এখন তাদের কথা বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না।

মাহা মির্জা বলেন, মানুষ ন্যূনতম আমিষের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। আগে মানুষ মাছ, মাংস ডিম খেতে পারলেও এখন তা পারছে না। আর এই বাস্তবতা সমগ্র বাংলাদেশের। এখন মন্ত্রী নিজ এলাকা নিয়ে যে দাবী করলেন, তার সাথে কিন্ত বাস্তবতার কোন মিল নেই। কোন জরিপ বা গবেষণার ওপর ভিত্তি করে কিন্ত তিনি এসব কথা বলেননি। এইতো কিছুদিন আগে আমাদের পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান সাহেব বলেছিলেন; ‘ আমাদের টাকার কোন অভাব নেই’ বিষয়টা তখন গণমাধ্যমে বেশ প্রচারণা পায়। অথচ এর কিছুদিন পর এখন দেখা যাচ্ছে রিজার্ভ তলানিতে, অর্থনীতি সংকটে। তার মানে এসব অর্থহীন কথা ওনারা বলেন, চলমান সংকট থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে নেওয়া যায়।

অর্থনীতিবিষয়ক এই গবেষক বলেন, তাছাড়া টিকতে না পেরে প্রতিদিন ই কিছু না কিছু মানুষ ঢাকা ছাড়ছে। আবার প্রতিদিন গ্রাম ছেড়ে কিছু মানুষ শহরে পারি জমাচ্ছেন। ফলে গ্রাম কিংবা শহর নয় সংকট সর্বত্র। গ্রামে যেহেতু কৃষি কাজ সংকুচিত হচ্ছে, খামার করে তরুণরা নিঃস্ব হচ্ছে ফলে তারা শহরে পারি জমাচ্ছে। অন্যদিকে শহরের যান্ত্রিক জীবনের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে সংসার খরচ সামলাতে না পেরে অনেকেই গ্রামে যাচ্ছেন অর্থাৎ সংকট কিন্ত উভমুখী। শহর কিংবা গ্রাম কোন অর্থনীতিই মানুষকে স্বস্তি দিচ্ছে না।

অতীত ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায়, মন্ত্রী লিপস্টিক নিয়ে যে দাবি করেছেন তার উল্টো ঘটনা ঘটেছিল আমেরিকায়। আমেরিকান বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে ২০০১ সালের মন্দায় দেশটির নারীদের লিপস্টিক কেনার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল। মন্দা শুরু হলেও লিপস্টিকের বিক্রি কমেনি। এমনকি ১৯২৯ ও ১৯৩৩ সালের মহামন্দার সময়ও নারীদের এই প্রবণতা ছিল বলে দাবী দেশটির গবেষকদের।

মন্দায় লিপস্টিক বিক্রি বৃদ্ধির বিষয়টিকে দেশটির বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘লিপস্টিক এফেক্ট’। এই তথ্য অনুযায়ী, মানুষের আয় কমে গেলে তারা বিলাসী পণ্য কেনা বন্ধ করে দেয়। মানুষ তার আর্থিক কষ্ট বা আর্থিক সমস্যার কথা ভুলে থাকতে সাজগোজের মাধ্যমে নিজের পরিপাটি রাখার মধ্য দিয়ে কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করেন। এ কারণে লিপস্টিকের চাহিদা বেড়ে যায় ।

মন্ত্রী টিপু মুনশি যে দাবী করছেন তারসাথে রংপুর এলাকা কিংবা দেশের অর্থনীতির বাস্তবতার কোন মিল নেই। আবার আমাদের দেশের চলমান যে অর্থনৈতিক সংকট এর সাথেও আমেরিকার ১৯২৯ ও ১৯৩৩ সাল কিংবা ২০০১ সালের মঙ্গা পরিস্থিতির কোনো মিল নেই।

এদিকে মন্ত্রী যে রংপুরের নারীদের আর্থিক স্বচ্ছলতার কথা বলছেন তার উল্টো চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের দেওয়া তথ্য থেকে। তার দাবী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে সবচেয়ে গরিব ১০টি জেলার ৬টিই রংপুর বিভাগে। (সূত্র: জাগোনিউজ২৪.কম ১১ মার্চ ২০২২)।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুসারে, দেশের ৮ বিভাগের মধ্যে দারিদ্র-প্রবণ উত্তর অঞ্চলের রংপুর বিভাগের মানুষেরা সম্পদের দিক দিয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে। এই বিভাগের ৪৪ শতাংশ পরিবারই দরিদ্র। এরপরেই রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ। (সূত্র: ইত্তেফাক অনলাইন, ২৬ এপ্রিল, ২০২৩)।

তিনি বলেন, এখন দেখেন, মানুষ কিন্ত লিপস্টিক বা সেন্ডেল প্রতিদিন কিনে না। এটা দিয়ে আপনি কোনোভাবেই বলতে পারেন না যে মানুষ খুব সুখে আছে তার জীবনে কোন সংকট নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. সায়েমা হক বিদিশা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রী হয়তো দেশের অর্থনীতির যে একটা সার্বিক পরিবর্তন হয়েছে সেটা বুঝাতে গিয়ে এই কথা বলেছেন। দেশের অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে সেটা যেমন সত্য তেমনি বর্তমানে একটা অর্থনৈতিক সংকট চলছে এটাও কিন্ত সত্য।

লিপস্টিক লাগানো কিংবা স্যান্ডেল বদলানোর বিষয়ে তিনি বলেন, দেখুন আমি নিজেই কিন্ত দিনে তিনবার লিপস্টিক লাগাই না কিংবা চারবার স্যান্ডেল বদলাই না। মন্ত্রীর এই বক্তব্যের সাথে আমি একমত নয়।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles