-5.5 C
Toronto
রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৪

সেই সময়

সেই সময়
ফাইল ছবি

সব সময় আমরা কাজে থাকিনা যখন কাজ থাকেনা তখন সময় পার হয় কোন কিছুর স্ক্রীনের উপর সেটা টিভির হউক বা টেলিফোনের হউক। এর বাইরে কিছু সময় স্মৃতি উকি দেয় মনের কোনে। আমরা যারা লিখি তারা লিখি যারা লিখতে পারেনা তারা শুধু কল্পনা করে ভার্চুয়াল জগতে ফিরে যাই। মাঝে মাঝে মনে হয় এগুলো লিখি কেন? লিখে কি হয়? কোন উত্তর নেই। মনে হয় এটিও জীবনের টনিক যদিও তা অনেকের বোধগম্য নয়।

অনেক পুরানো দিনের কথা মনে পড়ে যা হয়তো অনেকের মনে নেই। এ রকম এক সময় ১৯৭৬ সালের কথা মনে পড়ে। আমি তখন ২য় বর্ষ এইচ এস সি এর ছাত্র। প্রথম বর্ষ কিভাবে পেরিয়ে গেছে তা অনুভবে নেই, মনের কোনে ভয় ফাইনাল পরীক্ষা আসছে ধেয়ে। সেটা ছিলো ৭৬ এর মার্চ এপ্রিলের কথা বড় বোনকে পাঠাতে হবে লিবিয়ায় ডাক্তার দুলাভাই এর কাছে। আমার প্রিয় শহীদ মসিয়ূর রহমান কলেজেকে পিছু ফেলে ঢাকায় এলাম বড় বোন আর আমি। প্রায় একমাস পর তার তিন কন্যা সহ তাকে ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজে্র ফ্লাইটে উঠিয়ে দিয়ে বাড়ীতে ফিরে এলাম। কলেজে যাওয়া শুরু করলাম, যে শিক্ষকরা আমাকে স্নেহ করতেন তারা দেখলাম দূরে দূরে। বুঝলাম দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতিতে তাদের কাছে আমার মূল্যায়ন অন্যভাবে হচ্ছে।

- Advertisement -

কিছুদিন পর আব্বা ডাকলেন। আব্বা অনেক স্নেহ করতেন তার কোন কথা আমি ফেলতে পারতাম না বা না করতামনা আব্বা মেজ বোনকে সাথে নিয়ে ঢাকায় যেতে বললেন। বোন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারভিউ দিতে যাবে। পড়ালেখা বা ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্ত্ততির কথা ভেবে না করলাম। আব্বা একটু রেগে বললেন- লোক ভাড়া করে আনবো? এ কথা শোনার পর কেউ আর না বলতে পারেনা। বোনকে নিয়ে ঢাকায় রওনা হলাম।

সে সময় ৩-২ সিটের কোচ ভাড়া ছিলো ৩৩ টাকা। ৪০০ টাকা নিয়ে দু-ভাই বোন ঢাকা এসে এক মামার বাসায় উঠলাম। মামা আপন নন তবে তার যত্ন আপন থেকেও আরো বেশী মনে হতো। তার বাসা একটা সরাই খানার মতো । দুটো রুম আর প্রকান্ড একটা ড্রইং রুম যেখানে একটা টিভি চলতো সকাল সন্ধা। আমি আর মামার ৩ শ্যালক সেখানেই রাত কাটাতাম।

ঢাকায় আসবার সময় আমি একটা বই সাথে নিয়ে এসেছিলাম সেটা Organic Chemistry। ছোট্ট একটি বই। বিকাল বেলা সবাই যখন টিভি দেখতে মসগুল তখন বইটা হাতে আমি বাইরে বেরিয়ে কাছেই রাখা একটি মটর সাইকেলের উপর বসে পড়তাম। আমার স্বভাব ছিলো শব্দ করে পড়া এখানে তা হারিয়ে গেল। এই বইটিই ছিলো দীর্ঘ লেখা পড়া বিচ্ছেদের শান্তনা।

একেবারে ঢাকা মেডিকেলের ইনটারভিউ শেষে বোনকে সাথে নিয়ে বাড়ী ফিরলাম। সেটা জুলাই/৭৬ এর শেষ। ডিসেম্বরের ৮ তারিখ আমার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু। তিন মাসের পড়লেখার প্লান করছি এমন সময় আবার ডাক পড়লো বোনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করানোর জন্য যেতে হবে। এবার আবার না করলাম। আব্বা মেনে নিলেন।

আমার হাতে Chemistry 1&2 পার্ট, Physics 1&2 পার্ট, Biology 1&2 পার্ট, Math 1&2 পার্ট । Math ও Bangla, English (1&2 পার্ট) বাদে Che, Phy, Bio পড়া শুরু করলাম। প্রতিটি পার্ট এর জন্য ১৫ দিন করে পুরা বই পড়তে হবে তাই মনে থাকুক আর নাইবা থাকুক। বাংলা, ইংরাজী মাত্র ৮ দিন পড়ে ডিসেম্বরের ৮ তারিখে পরীক্ষা দেওয়া শুরু করলাম। পরীক্ষার দু দিনের মধ্যে জ্বরে আক্রান্ত হলাম। তখন জ্বর হলে ডাক্তার শুধু টাইফয়েডের ঔষুধ দিতেন। এই অবস্থায় পরীক্ষা শেষ হলো। আমার কলেজের শিক্ষকরা আমার উপর তাদের আশা ভরসা এক রকম ছেড়ে দিয়েছেন তাই আমি তাদের দেখলে দূরে চলে যেতাম। একদিন দুই শিক্ষকের সাথে পথে দেখা তাদের একজন বললেন-এই ফার্ষ্ট ডিভিশন পাবিন তো? বললাম-আপনারা দোয়া করলে কোন কিছু অসম্ভবনা। স্যার কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন।
পরীক্ষার ফলাফলের সময় নিকটে। আমার মন খারাপ, মনে হয় নিজের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলছি তাই একদিন বাড়ী ছেড়ে কাউকে না বলে কুষ্টিয়ায় বড় বোনের শ্বশুর বাড়ী চলে এলাম। এই এলাকায় যাওয়া আসার একটিই মাত্র বাহন তখন ছিলো আর সেটি হ’ল ট্রেন।

আমি যেখানে ছিলাম তার আশপাশে বেশ কয়েকজন পরীক্ষার্থী ছিলো। একদিন খবর এলো তারা কেউ কৃতকার্য হয়নি। দুপুরের ট্রেন আসার পর মনে হ’ল ষ্টেশন থেকে কয়েকজন হৈচৈ করে আসছে। তারা আমাকে খুজছে। আমাকে জানানো হলো আমি প্রথম বিভাগে পাশ করেছি এবং আমি যেন দ্রুত বাড়ী চলে যাই। সেই পরীক্ষায় আমরা মাত্র ৪ জন আমাদের কলেজ হতে প্রথম বিভাগ পাই। ৩ জন আমরা ডাক্তার আর একজন ইন্জিনিয়ার এখন।

আমার এই লেখা শুধুই লেখা নয় একটা দলিল হিসাবে রাখতে চাই। আমরা অনেক কাজ করি কিন্ত্ত তার মূল্যায়ন হয় শুধুমাত্র নিজের পকেটের অর্থ দিয়ে যে কাজ করি তার। যে বয়সে আমার শুধুমাত্র বই এর পাতায় দৃষ্টি আবদ্ধ থাকার কথা ছিলো সে সময় আব্বার কষ্ট আর সবার প্রয়োজনে আমাকেও সামিল হতে হয়েছে একজন দায়িত্ববানের মতো। সংসারে যারা নিজেদের দায়িত্ববান মনে করে তারা এক সময় অন্যের করা এক সব কাজ এর কথা ভুলে যায় ।

ইনুভিক, ইস্টেভ্যান, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles