3.4 C
Toronto
বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ৮, ২০২২

ভৌতিক বিষন্ন পথ

ভৌতিক বিষন্ন পথ
ফাইল ছবি

যখন কাজ ফুরাল বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম তখন সাড়ে বারোটা বাজে। নভেম্বর মাস শুরু হওয়ার মাত্র আধঘন্টা সময় পার হয়েছে।
বাড়ি পৌঁছাতে সময় লাগবে এক ঘন্টা পনের মিনিট। যেতে হবে প্রায় একশ কিলোমিটার।

আগের দিনটি ছিল অসম্ভব সুন্দর, উত্তাপ, আলো রঙমাখা ঝলমলে।

- Advertisement -

কিন্তু রাত থেকে শুরু হয়েছিল বৃষ্টি। যদিও উত্তাপ কমেনি। নয়তো সারা রাতের বৃষ্টিতে ফ্রোজেন হয়ে যেত সব। সারাদিন গোমড়ামুখ আকাশ কাঁদছিল ক্ষণেক্ষণে। এর মধ্যেই আমাকে বেরিয়ে পরতে হলো কাজে যাওয়ার জন্য। যেতে হবে কিচেনার এরিনায়। কয়েকদিন ধরে সেখানেই আসা যাওয়া করছি।
আগেরদিন যে রাস্তায় অসম্ভব সুন্দর, রঙিনপাতার রূপকথা দেখাচ্ছিল। ব্যাস্ততা বাতাসের সাথে পাতা উড়াউড়ি আর আর পাখিদের কলোতানে ছিল আনন্দমাখা। আজ সেখানে নিঝুমপুরী বৃষ্টি ভেজা কাহিল আর বিষন্নতা যেনঘুম ঘুম দিন।
সকালের ব্রেকফাস্ট সেরে চায়ের মগ নিয়েই পথে নামলাম। বৃষ্টি ভেজা পথে যেতে মনে হচিছল বারবার,এমন বাদল দিনে বাহিরে কে যায়রে। রাস্তা একদম শুনশান। কেউ আজ পথে নামেনি।

আগের দিনে ধুয়ে আনা গাড়ি আর সারারাতের বৃষ্টিতে ধোঁয়া পরিচ্ছন্ন গাড়ির গায়ে লাগছে কাদা মাটির পরত। যেতেু আমাকে অনেকটা পথ মাটি, পাথর ঢাকা পথে চলতে হচ্ছে।

যতদূর গেলাম সকালে উঠে বৃষ্টিও গেলো সাথে সাথে। মেঘলা আকাশ বৃষ্টির ফোটায় মাখামাখি পথ চলেছিলাম। কুয়াশা ঘন হয়ে নেমে এসেছিল পথে। মাঝেমাঝেই দিনের আলোয়ও পথ চলা ছিল কঠিন । খানিক দূরে সব কিছুই ঝাপসা ধোঁয়া ধোঁয়া। পথ আঁকাবাঁকা উঁচু নিচু। উপর থেকে নিচে বা নিচে থেকে উপরে, বা বাঁকের পরে সামনে কি আছে এমনিতেই দেখা যায় না আর এমন ঘনঘোর বাদল দিনে সেই আঁধার জমা পরিবেশ আরো ঢেকে দিয়েছে দৃষ্টি দূরের।
কাজে পৌঁছে বাইরের খবর তেমন নেয়া হয়নি। কাজ আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা হুল্লোরে সময় কেটেছে।
তবে মেঘ বৃষ্টি আছে দু একবার বাইরের তাজা বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলার জন্য বাইরে গিয়ে জেনেছি।
যখন বাড়ি ফেরার জন্য পথে নামলাম। তখনও অতটা অনুধাবন করিনি। সামনে কেমন অবস্থা অপেক্ষা করছে। জিপি এস দেখাল একই রকম সময় লাগবে ফিরতে। তবে রাস্তা গুলো এত অন্ধকার থাকবে শহর ছাড়ালে জি পি এস না থাকলে অচেনা পথে চলা খুব মুশকিলের বিষয়। ভাবলে অবাক হই আগে কি ভাবে চলতাম জি পি এস ছাড়া।

বাড়িগুলোর সামনে রঙিন বাতির আলোয় ভুতুরে পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। হ্যালোইনের রাতটা আমার বেশ ভালোলাগে। বেশ অনেকদিন ধরে বাড়ি ঘর সাজানো ভুতের বাড়ির মতন। পথে যেতে মাঝে সাঝেই দেখা হয়ে যায় বাচ্চা ভুত দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। কখনো পেত্নী হি হি করে হেসে উঠে। আর বাড়ির উঠানগুলো যেন কবরখানা। আর দোকনে কত রকমের ভৌতিক জিনিস পত্র সাজ সজ্জার উপকরণ। কাছে চলে গেলে রক্তচক্ষে তাকায় বা চাকু ধরা হাত বাড়িয়ে দেয়। কখনো মনে হয় মাকড়শার জালে বুঝি আটকা পরে যাব।
তবে এ বছর হ্যালোয়িন উপলক্ষে বাড়ি ঘরের সাজ অনেক কম দেখলাম ।

হঠাৎ দুচারটা বাড়িই সেজেছে। বেশির ভাগ বাড়িতে কিছু নেই। আগে লাইন ধরে প্রতিটি বাড়ি যেন সাজের প্রতিযোগীতায় মেতে উঠত। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার প্রভাব যেন এই সাজের মাঝে পরেছে। বোঝা যায় বাহুল্য করার অবস্থা অনেকের নেই এখন। হিমসিম অবস্থা প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটাতে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি মানুষকে শখ আনন্দ করার সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে।

সন্ধা না নামতেই বাচ্চাদের ট্রিক অর ট্রিট হাঁকডাক নানা রকম সাজপোষাক আর অজস্র চকলেট সংগ্রহের আনন্দের উচ্ছাস দেখতে, আমার বেশ ভালোলাগে। নিজে বাড়ি না সাজালেও নিজেকে অদ্ভুত সাজে সাজিয়ে ফেসবুকে একটা ছবি দেই অনেক বছর। এ বছর সেটাও করা হলো না।
তবে এবার দুটো খবর হ্যালোইনেকে কেন্দ্র করে প্রচার হয়েছে। সউদি আরবে হ্যালোইন উৎসব, অনেকের মধ্যে নানা রকম প্রভাব বিস্তার করেছে। আর সউথ কোরিয়ায় সিউলে প্রায় দুশ মানুষের মৃত্যু উৎসবের ভিড়ে। এমন মৃত্যু আগে হয়েছে কিনা মনে পরে না। একবার মনে হয় কোন খেলার মাঠে অনেকে মারা গিয়ে ছিল। সেই সাথে বাংলাদেশে হ্যালোইনের উৎসব হয়েছে, খুব আযোজন করে অনেক জায়গায়। যা আগে তেমন শোনা যেত না।

রাত বারোটার পর কিছু কিছু বাড়ি তখনও ভৌতিক সাঝে আছে আগামীকাল সব সরিয়ে ফেলা হবে। হয়তো দুচারদিন বেশি থাকবে কোথাও। বেশির ভাগ বাড়ির আলো নিভানো।

খানিক যেতেই আমি হাইওয়েতে উঠে পরলাম। অল্প পরেই হাইওয়ে থেকে নেমে পরলাম ছোট গ্রামীণ পথে। দিনে যেতে বেশ গাড়ি এবং ফার্ম ল্যাণ্ডে ব্যবহৃত ধীরগতির যন্ত্রপাতির সাথে দেখা হয়। গরু, ছাগল ঘোড়া আর বন্য প্রাণীরাও থাকে আসেপাশে। আজ যদিও তেমন কিছু ছিল না তবে দু চারটা ট্রাক এবং গাড়ির সাথে দেখা হয়েছিল।

কিন্তু আজ রাত এত অন্ধকার। যত অন্ধকার তারচেয়ে বেশি যেন দেখাচ্ছে। গাড়ির হেড লাইটের সবচে বেশি শক্তি প্রয়োগ করে আরো বেশি মরীচিকাময় হয়ে উঠছে সামনে। ঠিক জানি না কোথায় যাচ্ছি। দূরে আলোর বল যেন খেলছে। আর রাস্তার টানা সাদা লাইনটাই সম্বল করে চলছি। অন্ধকারে একটা আলোর বল নিশানা করে ছুটছি। একশ কিলো পথে মাত্র দুটো গাড়ি পেলাম। প্রথমে একটা ট্রাক আমার সামনে ছিল তার পিছে যেতে ভালোই লাগছিল সামনে কিছু হলে সে আগে থামবে আমি সচেতন হওয়ার সুযোগ পাবো। কিন্তু একটা বাঁক ঘুরে উঠার পর তাকে আর দেথলাম না। সে অন্য দিকে চলে গেছে। বেশ ক্ষানিক পর আরেকটা গাড়ি অনেকক্ষণ, প্রায় বিশ কিলোমিটার আমাকে ফলো করছিল। তবু একটা সঙ্গী আছে ভাবছিলাম, যদিও মাঝে মধ্যে মনে হচ্ছিল এই গাড়ি থেকেই যদি কোন অঘটন ঘটে। এমনটা যদিও হবার কথা নয়। তবে বর্তমান সময়ে অভাবনীয় অনেক কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু একটা বাঁকে এসে অন্য দিকে চলে গেলো সে গাড়িটাও।
জিপি এসে দেখছি, পথের আঁকাবাঁকা এবং সোজা চলার দিক নির্দেশনা। পথের পাশের চিহ্নগুলো চোখে পরছে না, ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকায়। ফোনটাই এক মাত্র সঙ্গী কথা বলে মাঝে মধ্যে দিক নির্দেশনা দিচ্ছে।

নিস্তব্ধতার সৌন্দর্য উপভোগ করতে গান বাজাতেও ইচ্ছা করছে না। কোন বাড়তি শব্দ যেন মানায় না এই প্রকৃতির মাঝে। দু একবার রেডিও বাজাতে গিয়েও হাত সরিয়ে নিলাম। এই নিরব ভৌতিক পরিবেশটা এভাবেই উপভোগ করি মনে হলো।
রাস্তায় সোজা চলার পথট আমার, জানি বলেই নিবিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছি গাড়ি। সামনে কিছু চলে এলে সমস্যা হবে। ধাক্কা খাব তার সাথে ঘটবে অঘটন। এমন পথে হরিন, শিয়াল, কায়টি নিদেন কাটবেড়ালি বা রেকুন আসতে পারে। কিছুদিন আগে একটা খরগোশ লাফিয়ে এসেছিল আত্মহত্যা করার জন্য । তাই যতটা জোড়ে যাওয়া দরকার সে ভাবে চলতে পারছি না, নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে।
দিনের বেলা কিছুটা দেখা যাওয়ায় মাটির রাস্তাগুলো এ্যাভয়েড করে গেছি। কিন্তু রাতে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। দুই হাত দূরে কি আছে তাই দেখতে পাচ্ছি না। অনেক সময় মাটির রাস্তার খানাখন্দকের ভিতর পরে লাফিয়ে উঠছি।

অন্ধকার পথ দীর্ঘ ভৌতিক রাতের ভুতগুলো যদি লাইন দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় কেমন হবে ভেবে একটু ভয় পাওয়ার চেষ্টা করছি।
এমন একা রাস্তায় নাকি হঠাৎ কোন মানুষ সাহায্য চায় তারপর ঘাড় মটকে দেয় । অথবা ঘাড়ে বসে থাকে। বাড়ি ফিরলাম আমি কিন্তু আমার ঘাড়ে বসে এলো আরেক জন, যে মাঝে মধ্যেই আমাকে অন্য কিছু করিয়ে নিচ্ছে। প্রথমে কেউ বুঝতে পাছে না কি হচ্ছে আমিও বলতে পারছি না কাউকে কিছু। এমন হলে কি হবে।
এমন কাহিনীগুলো মনে আসছে। কাঁচের জানালায় হঠাৎ রক্ত লেগে যায় অথবা যদি দেখি একটা অদ্ভুত মুখ চেয়ে আছে আমার দিকে অন্ধকারের ভিতর থেকে, এমন ভাবনাগুলো কেন আসছে কিলবিল করে বুঝলাম না কিন্তু ভয় পাওয়ার চেয়ে এই দীর্ঘ একা পথে, একা চলার রোমাঞ্চে বরং মন ভরে উঠছে। এমন পথ মাঝে মাঝেই পাড়ি দিতে হয় আমাকে তবে হ্যালোইনের রাতে বৃষ্টি আর কুয়াশা মিলে আরো বেশি ভৌতিক করে তুলেছিল চলা।

অবশেষে সে পথ শেষ হলো জিপি এসে দেখানো সময়ের আরো আধঘন্টা পরে। বাড়ি পৌঁছে অনেকক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে উপভোগ করলাম অসাধারন অন্ধকারের রূপ কায়টি গুলো ডেকে উঠে জানান দিল রাত দ্বিপ্রহর ।

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles