21.3 C
Toronto
রবিবার, জুন ১৬, ২০২৪

আইন নারীকে আলাদা ড্রেস কোড দেয়নি

আইন নারীকে আলাদা ড্রেস কোড দেয়নি
প্রতীকী ছবি

তরুণীর ছোট পোশাকই যদি শিলার আক্রমণের কারণ হয়, তবে তনুকে কেন মরতে হয়েছিল? পোশাক নিয়ে সবারই নিজস্ব ভাবনা থাকতে পারে। কিন্তু তা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, আমাদের সংবিধানে ব্যক্তির স্বাধীনতা নাগরিকদের একটি স্বীকৃত অধিকার।

নরসিংদী রেলস্টেশনে এ বছরের ১৮ মে শিলা নামে এক নারী ছোট পোশাক পরে গণপরিসরে আসার অজুহাতে এক তরুণীকে লাঞ্ছিত করেন। আক্রমণকারী নারী ছোট পোশাক পরে ছিলেন না, তিনি লম্বা পোশাকেই আবৃত ছিলেন। অসভ্যতার অজুহাতে তিনি অচেনা এক তরুণীকে কেবল নিজেই আক্রমণ করেননি, সঙ্গে ডেকে নিয়েছিলেন রেলস্টেশনে উপস্থিত আরও কয়েকজনকে। এ বিষয়ে একটি মামলার শুনানিতে মহামান্য হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ নারীর পোশাকের উপযুক্ততা এবং তার সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক বিষয়ে কিছু মন্তব্য করলে নারীবাদী কিছু সংস্থাসহ অন্যরা এ বিষয়ে উদ্বেগ জানায়। এ ছাড়া সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এর পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য দিচ্ছে।

- Advertisement -

পোশাক দিয়ে নারীকে বিচার কিংবা পোশাকের মাধ্যমে তার গণ্ডি নির্ধারণ করে দেওয়া একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রতিফলন। রেলস্টেশনের জন্য কোনো ড্রেস কোড নেই। তেমনিভাবে গণপরিসরের জন্য দেশের সংবিধান বা আইন নারীকে কোনো আলাদা ড্রেস কোড দেয়নি। দেওয়ার সুযোগও নেই। কারণ, নারী-পুরুষের সাম্য ও সমতাই হচ্ছে সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি। নরসিংদীর রেলস্টেশনে সেদিন নিশ্চয়ই অনেক পুরুষ যাত্রী ছিল। তাদের সবাই নিশ্চয়ই একই রকম পোশাক পরেনি। সেখানে টাই পরিহিত পুরুষ এবং শ্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য কি শিলা খুঁজেছিলেন? আমি নিশ্চিত, উত্তর হচ্ছে না। তবে তিনি আক্রান্ত তরুণীর পোশাকে ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি কেন খুঁজতে গেলেন? উত্তর হলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাঁকে নারীর পোশাকে শালীনতা, সংস্কৃতি ও ধর্ম খুঁজতে শিখিয়েছে।

এই আক্রমণের পেছনে ধর্ম কোনো ভূমিকা পালন করতে পারে না। কেননা, কোনো ধর্মেই সহিংসতার কোনো জায়গা নেই। শিলার এই নৈতিক পুলিশিংয়ের বিরুদ্ধে আক্রান্ত তরুণী আইনের দ্বারস্থ হলে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও শিলার মতো আক্রান্ত তরুণীর পোশাক নিয়ে মন্তব্য করেছেন, যা অনভিপ্রেত বিবেচনায় নারীবাদীদের সমালোচনার বিষয়বস্তু হয়েছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অবিচারের বিরুদ্ধে আদালতই অনেক সময় নারীদের শেষ ভরসার জায়গা। আদালত সংবিধান, আইনকানুন, ন্যায়পরায়ণতা এবং প্রগতিশীল মূল্যবোধের আলোকে বিচারকাজ পরিচালনা করবেন, সেটিই সব নাগরিকের প্রত্যাশা। সংবাদমাধ্যমগুলোতে মহামান্য আদালতের যেসব বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে, তা সঠিক হলে বিষয়টি উদ্বেগজনক। তবে কি আক্রান্ত তরুণী এখন থেকে শিলার মতো জামাকাপড় পরবেন? আমার ভাবতেই ভয় হচ্ছে যে সমাজে আরও অনেক শিলা তৈরি হবে, যাঁরা পোশাকের গ্রহণযোগ্যতার অজুহাতে অচেনা কাউকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করবে।

তরুণীর ছোট পোশাকই যদি শিলার আক্রমণের কারণ হয়, তবে তনুকে কেন মরতে হয়েছিল? পোশাক নিয়ে সবারই নিজস্ব ভাবনা থাকতে পারে। কিন্তু তা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, আমাদের সংবিধানে ব্যক্তির স্বাধীনতা নাগরিকদের একটি স্বীকৃত অধিকার। সমাজে সমাজে, দেশে দেশে যখন নারী জাগরণের বিপ্লব হচ্ছে, তখন পোশাকের কারণে কাউকে লাঞ্ছিত করার যৌক্তিকতা খোঁজা ইঙ্গিত দেয় যে নারীবাদের মূল্যবোধ এখনো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অন্তর্নিহিত নয়।

লজ্জাজনকভাবে নারী নির্যাতনের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৬১টি দেশে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। তাতে দেখা যায়, নারী নির্যাতনের দিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ কিরিবাতি, ফিজি, পাপুয়া নিউগিনির পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। এ দেশের ৫০ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি নারীকে মানসিকভাবে নির্যাতন করতে তার ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা এদেশে একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে।

পোশাকের বিষয়ে নারীর পছন্দ-অপছন্দ ও মতামত অস্বীকার করা পরিবার ও সমাজের অধিকার বলেই বিবেচিত হয় পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ। নেতিবাচক এই ধারা ভাঙতে দেশে প্রচলিত আইনের আলোকেই কাজ করে যাচ্ছে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কর্মরত সংগঠনগুলো। নারীর পোশাক নিয়ে মহামান্য আদালতের বক্তব্যে তাই তারা চরম অস্বস্তিতে। সমাজ ও সংস্কৃতির যে নেতিবাচক এবং নারীর প্রতি অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি শিলার আচরণে প্রকাশ পেয়েছে, তার ন্যূনতম সমর্থন কি সংবিধান ও দেশের আইন অনুযায়ী সম্ভব? অত্যন্ত গ্রহণযোগ্যভাবে বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী আধুনিক এই যুগে নারীর পোশাকের দৈর্ঘ্য নিয়ে আলোচনা না করতে সবাইকে আহ্বান করেছেন।

বলা বাহুল্য শিলার আচরণে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অনেকেই যুক্তি খুঁজে পেয়েছেন। এই যুক্তি ভ্রান্ত, সংবিধান, আইন ও নীতিবিরুদ্ধ। ভুল যুক্তি প্রগতিশীল মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে সংশোধন করা সম্ভব এবং সেখানে দেশের বিচারব্যবস্থা একটি বড় প্রত্যাশার জায়গা। সেখানে ব্যত্যয় ধ্যানধারণার কোনো সুযোগ নেই। আদালতের মন্তব্য, আদেশ ও রায় সমাজের সুবিচার প্রতিষ্ঠিত করবে। বৈষম্য দূর করবে, সহিংসতারোধ করবে এবং প্রগতিশীল মূল্যবোধকে শাণিত করবে। আমাদের হাইকোর্ট মানবাধিকার-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে কেবল ইতিবাচক রায়ই দেননি বরং সংবিধানের অনেক অনুচ্ছেদ ও আইনের প্রগতিশীল ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। হাইকোর্টের একটি রায়ের [29 BLD (HCD) 415; 14 BLC (2009) 694] কারণেই দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে জেন্ডার পলিসি রচিত হয়েছে। আশা করি, নারীর অধিকার রক্ষায় এবং পুরুষতান্ত্রিকতার শিকল ভাঙতে বিচার বিভাগ পিছপা হবে না। নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নে দেশের সংবিধান ও আইনের প্রয়োগে সামঞ্জস্য আনতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার জন্য বিচার বিভাগ ব্যবস্থা নিতে পারে।

লেখক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট
সূত্র : আজকের পত্রিকা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles