‘নুন-পান্তা খেয়েও ছেলের সঙ্গে থাকতে চাই’, তবু মায়ের ঠাঁই হলো না ছেলের ঘরে

‘নুন-পান্তা খেয়েও ছেলের সঙ্গে থাকতে চাই’, তবু মায়ের ঠাঁই হলো না ছেলের ঘরে - the Bengali Times
হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত বৃদ্ধা মায়ের শেষ আশ্রয় বলতে একমাত্র ছেলে

স্বামী নেই, মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত বৃদ্ধা মায়ের শেষ আশ্রয় বলতে একমাত্র ছেলে। সেই ছেলের কাছেই থাকার আকুতি জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দ্বারস্থ হয়েছেন পাবনার মুন্নি খাতুন। কিন্তু মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে নারাজ ছেলে সাগর হোসেন। শুনানিতে ছেলের সাফ কথা—‘মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব।’

জীবনের শেষ বয়সে মায়ের চাওয়া খুব বেশি ছিল না। ছিল না অর্থ-সম্পদ, ছিল না বিলাসী জীবন। শুধু চেয়েছিলেন ছেলের ঘরে একটু আশ্রয়। অসুস্থ শরীর নিয়ে ছেলের সঙ্গে নুন-পান্তা খেয়েও বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি।

- Advertisement -

কিন্তু সেই সামান্য চাওয়াটুকুও পূরণ হচ্ছে না।

ছেলের কাছ থেকে আশ্রয় ও ভরণপোষণ পাওয়ার আশায় শেষ পর্যন্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বৃদ্ধা মুন্নি খাতুন।

অভিযোগের শুনানিতে এসে তার ছেলে সাগর হোসেন জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে পারবেন না।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে শুনানির সময় ইউএনও সেলিম আহমেদ মাকে সঙ্গে রেখে দেখাশোনার বিষয়ে সাগরকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।

তবে তাতে রাজি হননি তিনি।

একপর্যায়ে সাগর বলেন, ‘মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব। আমি মাকে সঙ্গে রাখতে পারব না। স্যার, আপনি বলে দেন, আমি মাকে মাসে কত টাকা দেব।’

ছেলের এমন কথায় অসহায় হয়ে পড়েন বৃদ্ধা মা।

শেষ বয়সে শুধু ছেলের আশ্রয় চান মা

মুন্নি খাতুনের স্বামী সিরাজুল ইসলাম অনেক আগেই মারা গেছেন। দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে সাগর হোসেন ও এক মেয়ে রয়েছেন। মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে।

ফলে স্বামীহারা ও অসুস্থ মুন্নি খাতুনের বৃদ্ধ বয়সের প্রধান অবলম্বন এখন একমাত্র ছেলে।

মুন্নির অভিযোগ, ছেলের বিয়ের পর থেকেই তার সঙ্গে পারিবারিক বিরোধ শুরু হয়। একপর্যায়ে ছেলে তার ভরণপোষণ দেওয়া বন্ধ করে দেন। এমনকি নিজের সঙ্গে রাখতেও অনীহা প্রকাশ করেন।

ছেলের কাছ থেকে আশ্রয় ও ভরণপোষণ পাওয়ার আশায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছেও একাধিকবার গিয়েছেন তিনি। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।

শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন বৃদ্ধা।

‘আমি টাকা-পয়সা চাই না’

শুনানির পর মুন্নি খাতুনের কণ্ঠে ছিল অসহায় আকুতি।

তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী অনেক আগেই মারা গেছে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। আমি অসুস্থ মানুষ, হার্টের রোগী। আমার এখন ছেলেকে ছাড়া আর কে আছে?’

ছেলের কাছে অর্থ-সম্পদ নয়, শুধু আশ্রয় চান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ছেলের কাছে টাকা-পয়সা চাই না। নুন-পান্তা খেয়েও যদি ছেলের সঙ্গে থাকতে পারি, তাহলে বাকি জীবনটা পার করে দিতে পারব।’

তার কথায় আরও ফুটে ওঠে মায়ের শেষ বয়সের একেবারে সাধারণ চাওয়া।

‘আমি তো মায়ের অধিকার নিয়ে ছেলের ঘরে থাকতে চাই। শেষ বয়সে সন্তানের কাছে একটু আশ্রয় চাইছি। এর বেশি আমার কোনো চাওয়া নেই।’

স্থানীয়ভাবেও হয়নি সমাধান

নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম জানান, মা-ছেলের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ছেলে রাজি না হওয়ায় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে ব্যর্থ হওয়ার পরই মুন্নি খাতুন ইউএনওর কাছে অভিযোগ করেন।

ছেলেকে কয়েক দিনের সময় ইউএনওর

শুনানিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ।

বৃদ্ধ ও অসুস্থ মায়ের শেষ বয়সের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে সাগরকে মাকে নিজের সঙ্গে রেখে দেখাশোনার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেন তিনি। বিষয়টি মানবিকভাবে সমাধানের জন্যও অনুরোধ করা হয়।

তবে মাকে নিজের সঙ্গে রাখার বিষয়ে সাগর অনড় থাকেন।

পরে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সাগরকে কয়েক দিনের সময় দেন ইউএনও। এই সময়ের মধ্যে মায়ের ভরণপোষণ ও দেখাশোনার বিষয়ে একটি সমাধানে আসতে বলা হয়েছে।

ইউএনও সেলিম আহমেদ বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে ডেকে শুনানি করা হয়েছে। একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ মা তার সন্তানের কাছে আশ্রয় ও ভরণপোষণ প্রত্যাশা করছেন। আমরা ছেলেকে বিষয়টি মানবিকভাবে দেখার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেছি।’

তিনি জানান, পরিবারের বিষয়টি যাতে আরও জটিল না হয় এবং বৃদ্ধা মায়ের কষ্টও যাতে কমে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সমাধানের চেষ্টা চলছে।

শেষ বয়সে মায়ের চাওয়া ছিল শুধু একটি ঘর, যেখানে সন্তানের পাশে থেকে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাবেন। সেই আশ্রয়ের জন্যই এখন তাকে দ্বারস্থ হতে হয়েছে প্রশাসনের। আর মায়ের এই আকুতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সন্তানের ঘরে কি শেষ পর্যন্ত জায়গা হবে এই অসহায় বৃদ্ধার?

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles