
১৯৬৯ সালের ৮ আগস্ট রাত। লস অ্যাঞ্জেলেসের ১০০৫০ সিয়েলো ড্রাইভের সেই বাড়িতে ফিরেছিলেন ২৬ বছর বয়সী অভিনেত্রী শ্যারন টেট। তখন তিনি সাড়ে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামী চলচ্চিত্র নির্মাতা রোমান পোলানস্কি ইউরোপে থাকায় তার ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন টেট। কিন্তু রাত পেরিয়ে ভোর হওয়ার আগেই সেই বাড়ি পরিণত হয় ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের মঞ্চে।
সেদিন রাতে শ্যারন টেটের সঙ্গে বাড়িতে ছিলেন তার তিন বন্ধু—হেয়ার স্টাইলিস্ট জে সেব্রিং, লেখক ওজসিক ফ্রাইকোভস্কি এবং কফি ব্যবসায়ী পরিবারের উত্তরাধিকারী অ্যাবিগেইল ফলগার। রাত পেরিয়ে চার্লস ম্যানসনের অনুসারী চারজন সেখানে প্রবেশ করে। প্রথমে বাড়ির টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ।
হত্যাকারীদের হাতে প্রাণ হারান টেট ও তার তিন অতিথি। বাড়ির বাইরে গাড়িতে থাকা ১৮ বছর বয়সী স্টিভেন প্যারেন্টও হত্যার শিকার হন। শ্যারন টেট তখন নিজের অনাগত সন্তানের প্রাণভিক্ষা করেছিলেন বলে পরে তদন্তে উঠে আসে। কিন্তু তাতেও রক্ষা হয়নি তার জীবন।
সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা ঘটে হত্যাকাণ্ডের পর। ঘাতকেরা টেটের রক্ত ব্যবহার করে বাড়ির সামনের দরজায় লিখে রেখে যায় ‘পিআইজি’—অর্থাৎ ‘শুয়োর’।
তবে আশ্চর্যের বিষয়, এই হত্যাকাণ্ডের মূল লক্ষ্য ছিলেন না শ্যারন টেট। বাড়িটির সঙ্গে আগে থেকেই যুক্ত ছিল অন্য এক ব্যক্তির নাম—সংগীত প্রযোজক টেরি মেলচার। সংগীতশিল্পী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর চার্লস ম্যানসন একসময় মেলচারের কাছে সুযোগ চেয়েছিলেন। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তার মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
মেলচার বাড়িটি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর সেখানে বসবাস শুরু করেন টেট ও পোলানস্কি। কিন্তু ঠিকানাটি ম্যানসনের মনে রয়ে যায়। পরবর্তীতে তার অনুসারীদের নিয়ে গড়ে ওঠা গোষ্ঠী ‘হেল্টার স্কেল্টার’ নামে একটি বর্ণবাদী সংঘাতের কল্পিত তত্ত্ব প্রচার করতে থাকে। সেই উন্মত্ততারই ভয়াবহ পরিণতি ঘটে সিয়েলো ড্রাইভের বাড়িতে।
পরদিন সকালে পরিচ্ছন্নতাকর্মী উইনিফ্রেড চ্যাপম্যান বাড়িতে এসে প্রথমে স্টিভেন প্যারেন্টের মরদেহ দেখতে পান। পরে ভেতরের দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো হলিউডে নেমে আসে আতঙ্ক।
এর মাত্র দুদিন পর ম্যানসনের অনুসারীরা লেনো লাবিয়াঙ্কা ও তার স্ত্রী রোজমেরিকেও তাদের বাড়িতে হত্যা করে। পরবর্তী তদন্তে পুলিশ ধীরে ধীরে ম্যানসন ও তার অনুসারীদের কাছে পৌঁছায়। সহযোগী সুসান অ্যাটকিন্সের দেওয়া তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৭১ সালে আদালত চার্লস ম্যানসন ও তার সহযোগীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরে ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত্যুদণ্ড বাতিল হলে তা আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হয়। ২০১৭ সালে কারাগারেই মারা যান ম্যানসন।
শ্যারন টেটকে ম্যানসন ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না। অন্য একজনের প্রতি তার ক্ষোভ ও ব্যর্থতার প্রতিশোধে শেষ পর্যন্ত বলি হতে হয়েছিল তরুণ এই অভিনেত্রীকে। হলিউডের ঝলমলে জগতের এক তারকার জীবন এভাবেই পরিণত হয় আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অপরাধের করুণ অধ্যায়ে।

