
জনপ্রিয় সংগীতবিষয়ক রিয়েলিটি শো ‘আমেরিকান আইডল’-এর সাবেক প্রতিযোগী ও গির্জার সংগীত যাজক ক্যালেব ফ্লিন নিজ স্ত্রীকে নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ডেইটনের উপকণ্ঠ টিপ সিটিতে নিজেদের বাড়িতে ঘুমন্ত স্ত্রী অ্যাশলি ফ্লিনের মাথার পেছনে দুটি গুলি চালিয়ে হত্যা করেন ৪০ বছর বয়সী ক্যালেব।
নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িতে দুর্বৃত্ত বা ডাকাত দল ঢুকে হামলা চালিয়েছে বলে ভুয়া দাবি করে আড়াল খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তবে আদালত ও জুরি বোর্ডের দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় তার বিরুদ্ধে আনীত জোরালো সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ায় এখন তাকে প্যারোলহীন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
আদালতে আট দিনব্যাপী দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মঙ্গলবার যুক্তিখণ্ডন পর্ব শেষ হয়। মাত্র তিন ঘণ্টারও কম সময় ধরে পর্যালোচনা ও চিন্তাভাবনার পর জুরি বোর্ড সর্বসম্মতিক্রমে তাদের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। রায় শুনানির সময় বিবাদী ক্যালেব ফ্লিনকে আদালতে অঝোরে কাঁদতে দেখা যায়। তার বিরুদ্ধে অ্যাগ্রাভেটেড মার্ডার বা নৃশংস হত্যা এবং আলামত ধ্বংস বা তামাদি করার অভিযোগসহ মোট ৯টি চার্জের প্রতিটিতেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। বিচার বিভাগীয় সমস্ত নথিপত্র এবং পেশ করা যাবতীয় তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আগামী ৫ অক্টোবর তার চূড়ান্ত দণ্ডাদেশ বা সাজা ঘোষণা করবেন আদালত।
বিচার চলাকালে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ওহাইওর টিপ সিটির সেই ঘরের অপরাধস্থলের বিবরণ, ওহাইও পুলিশ কর্মকর্তাদের বডি ক্যামেরার ফুটেজ এবং হত্যাকাণ্ডের সময় ক্যালেবের ব্যবহৃত আইফোন ও অ্যাপল ওয়াচের ডিজিটাল অ্যাক্টিভিটির বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে জানান, ক্যালেব দীর্ঘদিন ধরে তার গির্জার একজন শিক্ষানবিস কর্মী, ২৪ বছর বয়সী অ্যালেইগা বোটনারের সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন। তাদের দুজনের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া লক্ষাধিক টেক্সট মেসেজের মধ্য থেকে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর বার্তা আদালতে পড়ে শোনানো হয়।
২০২৫ সালের আগস্টে বোটনারকে পাঠানো এক বার্তায় ক্যালেব লিখেছিলেন, ‘আমি কাল রাত ৪টা পর্যন্ত কেঁদেছি আর ভেবেছি কীভাবে তাকে হত্যা করা যায় যেন জেলে যেতে না হয়।’ অন্য এক বার্তায় তিনি সরাসরি লেখেন, ‘আমি শুধু চাই সে মরে যাক এবং সব শেষ হয়ে যাক।’ মামলার প্রধান সাক্ষী হিসেবে আদালতে উপস্থিত হয়ে পরকীয়া প্রেমিকা বোটনার বলেন, ‘আমি এখন ক্যালেবকে ঘৃণা করি, কারণ আমি বিশ্বাস করি যে সে-ই তার স্ত্রীকে হত্যা করেছে।’
প্রসিকিউটিং অ্যাটর্নি পল ওয়াটকিন্স সমাপনী বক্তব্যে ক্যালেবের ওই টেক্সট মেসেজগুলোকে মূল হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরে বলেন, এগুলোই প্রমাণ করে স্ত্রীর প্রতি বিবাদীর চরম বিদ্বেষ ও ঘৃণা কতটা উগ্র ছিল। বিবাদী তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিলে কন্যাসন্তানদের কাস্টডি বা অভিভাবকত্ব হারানোর ভয় পাচ্ছিলেন এবং একই সঙ্গে স্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসা ও গির্জার চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে ছিলেন।
পল ওয়াটকিন্স জানান, ১৬ ফেব্রুয়ারি ভোরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে ক্যালেব দাবি করেছিলেন যে তিনি মেয়েকে ঘুমাতে দেওয়ার সময় গোলাগুলির শব্দ পান এবং পরে দেখতে পান তার ৩৭ বছর বয়সী স্ত্রী বেডরুমে মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন ও গ্যারেজের পাশের দরজাটি খোলা। কিন্তু পরবর্তীতে তদন্তকারীদের কাছে দেওয়া বক্তব্যে তিনি গ্যারেজে যাননি বলে দাবি করেন, যা তার আগের জবানবন্দির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
অন্যদিকে ক্যালেব ফ্লিনের ডিফেন্স আইনজীবী প্যাট্রিক মুলিগান আদালতে দাবি করেন যে এই হত্যাকাণ্ডে ক্যালেবের জড়িত থাকার কোনো সুনির্দিষ্ট বা শক্ত প্রমাণ নেই এবং কিছু অর্থহীন সূত্র জোড়া দিয়ে এই মামলার সমাধান করা যায় না। আইনজীবী মুলিগান বলেন, ক্যালেব তার স্কুলশিক্ষিকা ও ভলিবল কোচ স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন কি না তা বড় কথা নয়, আর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের প্রমাণ মানেই কিন্তু হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ নয়। এ ছাড়া বিবাদীর বিরুদ্ধে আলামত ধ্বংসের অভিযোগ তোলা হলেও ক্যালেবের ট্রাকের কনসোলে রাখা যে অস্ত্রটি দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে এসে কনসোলটি খোলা পেলেও এখন পর্যন্ত সেই আগ্নেয়াস্ত্রটিরই কোনো হদিস মেলেনি।
মামলায় ওহাইওর ব্যুরো অব ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশনসের বিশেষ এজেন্ট জোসেফ উইলহেম সাক্ষ্য দিয়ে জানান, ক্যালেবের স্ত্রী মারা যাওয়ার ঠিক আগেই তার ফোন থেকে ইনস্টাগ্রাম এবং একটি এআই সংগীত তৈরির অ্যাপসহ বেশ কয়েকটি অ্যাপ মুছে ফেলা হয়েছিল। এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা একটি বিশেষ গানও আদালতে শোনানো হয়, যা ক্যালেব তার প্রেমিকা বোটনারের উদ্দেশ্যে তৈরি করেছিলেন। আদালত কক্ষে সেই এআই গান শোনার সময় জুরিদের প্রতিক্রিয়া এবং হাসির দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়।
অভিযুক্ত ক্যালেব ফ্লিন ২০১৩ সালে বিখ্যাত প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘আমেরিকান আইডল’-এর ১২তম আসরে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে বিশ্বখ্যাত বিচারক মারায়া ক্যারে, নিকি মিনাজ এবং র্যান্ডি জ্যাকসনের সামনে গান গেয়ে অডিশনে ‘গোল্ডেন টিকিট’ জিতে হলিউড পর্বে যাওয়ার সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত মূল প্রতিযোগিতায় পৌঁছাতে পারেননি।
তখনকার অডিশনে ক্যালেব বলেছিলেন, সংগীতই আমার সবকিছু, গান গাইতেই আমি বেঁচে থাকি আর গাইতে ভীষণ ভালোবাসি—তাই অডিশন দিতে আসা। অবশ্য এ ক্ষেত্রে আমার স্ত্রীও হয়তো আমাকে কিছুটা তাগাদা দিয়েছিল।
গান আর স্ত্রীর প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করা সেই ক্যালেব ফ্লিনই শেষ পর্যন্ত আদালতে ঘাতক প্রমাণিত হলেন। এবার সাজা শোনার অপেক্ষায় সাবেক এই আমেরিকান আইডল প্রতিযোগী।

