
পিঠে দুধের শিশুকে বেঁধে কাদামাখা পথে হেঁটে চলছে এক বালক। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ, শরীরজুড়ে কাদা। চারপাশের পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, থামছে না তার পথচলা। খুঁজছে মা-বাবাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন একটি ভিডিও ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র আবেগ ও উদ্বেগ। ভিডিওটি নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের বলে দাবি করা হলেও এর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত রোববার (৩০ আগস্ট) থেকে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, এক বালক তার ছোট বোনকে পিঠে বেঁধে নিয়ে কাদামাখা পথে হাঁটছে। পিঠে থাকা শিশুটিকে দুধের শিশু বলেই মনে হচ্ছে। তাকে কাঁদতেও দেখা যায়। তবে ক্ষুধা, ভয়, অসুস্থতা নাকি অন্য কোনো কারণে সে কাঁদছিল, তা ভিডিও দেখে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বালকটির মুখ ও শরীরে কাদা লেগে রয়েছে। দীর্ঘক্ষণ হাঁটার কারণে তাকে ক্লান্ত মনে হলেও ছোট ছোট পায়ে সে এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে চারপাশে তাকাচ্ছে। তার চলার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, ভিড়ের মধ্যে কিংবা কোনো ধ্বংসস্তূপের পাশে হয়তো মা-বাবাকে খুঁজে পাওয়ার আশায় পথ চলছে সে।
এখন পর্যন্ত ওই দুই শিশুর নাম-পরিচয় জানা যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি প্রকাশ করে একজন ব্যবহারকারী দাবি করেছেন, এটি নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের হৃদয়বিদারক দৃশ্য। তার দাবি, ছোট্ট ছেলেটি বোনকে পিঠে নিয়ে মা-বাবার সন্ধানে ঘুরছে।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়েছেন। দুই শিশুর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে। তারা দ্রুত শিশু দুটির মা-বাবার সন্ধান পাওয়ার আশাও প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ শিশুটির সাহস ও দায়িত্ববোধের প্রশংসাও করেছেন।
তবে ভিডিওটি সত্যিই নেপালের সাম্প্রতিক কোনো বিপর্যয়ের দৃশ্য কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ভিডিওটির স্থান ও সময় এবং শিশু দুটির পরিচয়ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যকে যাচাই ছাড়া সত্য ধরে না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
নাগাসাকির সেই ছবির স্মৃতি
ভিডিওটির দৃশ্য দেখে অনেকের মনে পড়ে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের নাগাসাকিতে তোলা একটি ঐতিহাসিক ছবির কথা। পারমাণবিক বোমা হামলার পর মার্কিন সেনা কর্মকর্তা জো ও’ডনেল একটি ছবি ধারণ করেছিলেন। সেখানে এক খুদে বালককে পিঠে তার মৃত ছোট বোনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে ছবিটি যুদ্ধের ভয়াবহতা ও শিশুদের ওপর এর নির্মম প্রভাবের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নেপালের ভিডিওটির শিশুটির পরিস্থিতি নাগাসাকির সেই বালকের ঘটনার সঙ্গে এক নয়। পিঠে ছোট বোনকে নিয়ে এক শিশুর অসহায় পথচলার দৃশ্যই শুধু অনেকের মনে সেই ঐতিহাসিক ছবির স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।
‘গ্রেভ অব দ্য ফায়ারফ্লাইজ’-এর কথাও বলছেন অনেকে
ভিডিওটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে জাপানের অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ‘গ্রেভ অব দ্য ফায়ারফ্লাইজ’-এর কথাও উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দুই ভাইবোন সেতা ও সেতসুকোর জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।
নেপালের ভিডিওতে দেখা দুই শিশুর অসহায় অবস্থার সঙ্গে ওই চলচ্চিত্রের কিছু দৃশ্য ও গল্পের আবহের মিল খুঁজে পেয়েছেন অনেকে। তবে এটি নিছক দর্শকদের আবেগঘন তুলনা; ভিডিওটির সঙ্গে চলচ্চিত্রটির কোনো সরাসরি সম্পর্কের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভিডিওটির সত্যতা এখনো নিশ্চিত না হলেও পিঠে ছোট বোনকে নিয়ে পথ চলা শিশুটির ক্লান্ত মুখ, কাদামাখা শরীর এবং অনিশ্চিত গন্তব্যের দৃশ্য মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। মা-বাবাকে খুঁজে পাওয়ার সেই আকুলতা যেন বিপর্যয়ের সময়ে শিশুদের অসহায়ত্বেরই এক মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

