
কানাডার রাজনীতিতে ফের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্ন। অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা বলছে, ২০২৫ সালের নির্বাচনে লিবারেল পার্টিকে ভোট দেওয়া প্রতি ছয়জনের মধ্যে প্রায় একজন এখন নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এনডিপিকে সমর্থন করার কথা ভাবছেন। আর এই ভোটারদের দলবদলের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তন। সমীক্ষার ফলাফল এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন কানাডার বিভিন্ন অংশে দাবানলের মরসুম ফের পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন আর শুধু দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না; ক্রমশ তা ভোটারদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠছে।
অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় স্তরে ২১ শতাংশ কানাডীয় মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনই বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। মাত্র চার মাস আগে একই প্রশ্নের উত্তরে এই মত দিয়েছিলেন ১৪ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন এমন ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। ৪৫ বছরের কম বয়সী কানাডীয়দের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে চিন্তার মাত্রা উল্লেখযোগ্য। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী উত্তরদাতাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ জানিয়েছেন, দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে তারা জলবায়ু পরিবর্তনকেই দেখছেন। এই প্রবণতা রাজনৈতিক দলগুলির জন্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ সাধারণত পরিবেশ, সামাজিক বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি পরিষেবার মতো বিষয়কে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। ফলে জলবায়ু ইস্যুতে ভোটারদের অবস্থানের পরিবর্তন আগামী দিনে দলগুলির ভোটের অঙ্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
অ্যাঙ্গাস রিডের সমীক্ষার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলির একটি হল লিবারেল ভোটারদের মধ্যে এনডিপির প্রতি বাড়তে থাকা আগ্রহ। ২০২৫ সালের নির্বাচনে লিবারেল পার্টিকে ভোট দেওয়া ভোটারদের একটি অংশ এখন এনডিপিকে সমর্থন করার কথা বলছেন। হিসাব অনুযায়ী, লিবারেলদের ভোট দেওয়া প্রতি ছয়জনের মধ্যে প্রায় একজন বর্তমানে এনডিপির দিকে ঝুঁকছেন। এই ভোটারদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, এনডিপির দিকে ঝুঁকে পড়া এই ভোটাররা সামগ্রিক লিবারেল ভোটারদের তুলনায় অসমতা নিয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি উদ্বিগ্ন। অর্থাৎ শুধু পরিবেশ নয়, সামাজিক ন্যায়, আয়বৈষম্য এবং সুযোগের অসম বণ্টনের মতো বিষয়ও লিবারেল ভোটারদের একটি অংশকে আরও বামঘেঁষা রাজনৈতিক অবস্থানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এনডিপি নেতা আভি লুইসও এই পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। মঙ্গলবার ‘দ্য কানাডিয়ান প্রেস’-কে তিনি জানান, মন্ট্রিয়লের লিবারেল ভোটারদের একটি অংশ যে এখন এনডিপিকে সমর্থন করার কথা ভাবছেন, সে খবর তিনি পাচ্ছেন। লুইসের বক্তব্য, লিবারেলদের মধ্যে এমন বহু প্রগতিশীল ভোটার রয়েছেন, যারা এনডিপিকে ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। তাঁর মতে, আগামী নির্বাচনে এই ভোটের পরিবর্তন কয়েকটি আসনের ফলাফলকে প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই বদলে দিতে পারে। রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কানাডার মতো সংসদীয় ব্যবস্থায় জাতীয় ভোটের শতাংশের পাশাপাশি নির্দিষ্ট নির্বাচনী কেন্দ্রের ফলাফল সরকার গঠনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সামগ্রিকভাবে ভোটের ব্যবধান খুব বেশি না হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাইডিংয়ে ভোটের সামান্য পরিবর্তনও আসনসংখ্যায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে মন্ট্রিয়লে রয়েছেন আভি লুইস। সেখানে তিনি ফরাসি ভাষায় ইমারশন কোর্স করছেন। এই সময়টিকে রাজনৈতিকভাবেও কাজে লাগাচ্ছেন এনডিপি নেতা। মন্ট্রিয়লের দুটি রাইডিংয়ে সম্ভাব্য উপনির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি দলীয় প্রার্থীদের সঙ্গে প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। সাবেক লিবারেল মন্ত্রী স্টিভেন গাইলবল্ট এবং সাবেক এনডিপি এমপি আলেক্সান্ডার বোলেরিচের সম্ভাব্য পদত্যাগের পর ওই দুটি আসনে উপনির্বাচন হতে পারে। বোলেরিচ কুইবেকের প্রাদেশিক রাজনীতিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পদত্যাগ করতে চলেছেন বলে জানা যাচ্ছে। ফলে এই আসনগুলিতে সম্ভাব্য উপনির্বাচন এনডিপির জন্য নিজেদের অবস্থান যাচাইয়ের পাশাপাশি লিবারেল ভোটব্যাঙ্কে কতটা প্রভাব তৈরি করা সম্ভব, তা দেখারও একটি সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
অ্যাঙ্গাস রিডের মডেল অনুযায়ী, বর্তমানে লিবারেল পার্টিকে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা। ফেব্রুয়ারির তুলনায় এই হার পাঁচ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। অন্যদিকে এনডিপির সমর্থন বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যেখানে ১০ শতাংশ কানাডীয় এনডিপিকে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন, এখন সেই হার বেড়ে হয়েছে ১৩ শতাংশ। কনজার্ভেটিভ পার্টির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। অ্যাঙ্গাস রিডের হিসাবে, প্রায় ৩৬ শতাংশ উত্তরদাতা কনজার্ভেটিভদের ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ লিবারেলদের সমর্থন কমার বিপরীতে এনডিপির সমর্থন কিছুটা বাড়লেও কনজার্ভেটিভদের অবস্থানে বড় পরিবর্তন এখনও দেখা যাচ্ছে না।
সমীক্ষার ফলাফলকে সরাসরি নির্বাচনের ফলাফলের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তবে রাজনৈতিক প্রবণতার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে লিবারেলদের প্রগতিশীল ভোটারদের একটি অংশ যদি পরিবেশ, সামাজিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক ন্যায়ের প্রশ্নে এনডিপির দিকে স্থায়ীভাবে সরে যায়, তাহলে কানাডার বিরোধী রাজনীতির সমীকরণে পরিবর্তন আসতে পারে। এখানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দাবানল, তাপপ্রবাহ এবং পরিবেশগত বিপর্যয় ক্রমশ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে। ফলে তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের কাছে পরিবেশনীতি আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে লিবারেলদের জন্য চ্যালেঞ্জ হল যে তাদের যে ভোটাররা ঐতিহাসিকভাবে দলটির দিকে ঝুঁকেছেন, তাঁদের একটি অংশ যদি এনডিপির দিকে চলে যান, তাহলে সেই ভোট ফেরানো কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে শহুরে ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে এই প্রবণতা শক্তিশালী হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাইডিংগুলিতে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
অ্যাঙ্গাস রিডের এই সমীক্ষা তাই শুধু লিবারেল ও এনডিপির জনপ্রিয়তার ব্যবধানের হিসাব নয়। এর মধ্যে কানাডার ভোটারদের অগ্রাধিকারে পরিবর্তনের একটি ছবিও ধরা পড়ছে যেখানে জলবায়ু, বৈষম্য এবং সামাজিক ন্যায়ের মতো বিষয় ক্রমশ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে চলে আসছে। ২৫ থেকে ২৭ জুলাই মোট ১,৭৭০ জন প্রাপ্তবয়স্ক কানাডীয়কে নিয়ে এই সমীক্ষা চালানো হয়। এখন দেখার বিষয়, এই মুহূর্তের প্রবণতা সাময়িক রাজনৈতিক অসন্তোষ হিসেবেই থেকে যায়, নাকি আগামী নির্বাচনের আগে লিবারেলদের ভোটব্যাঙ্কে আরও বড় ধরনের পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।

