
আর কখনো তার সাথে কথা বলা হবে না, এটা ভাবতেই আমি ভেঙ্গে চুরে যাই।
এই ব্যাপারটা আজ সারাদিন মাথা থেকে যায়নি। কেন জানি না, হয়তো আজকের দিনটাই ছিল তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত দিন, একজন বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া মানুষের জন্মদিন।
নীরবতার ভেতর একটা অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতা আছে। কেন যেন মনে হয়, তার সাথে আর কখনো কথা না বলা অনেক বেশি অন্তরঙ্গ তাকে শুভ জন্মদিন বলে উইশ করবার চেয়েও। আজ সেই মানুষটির বয়স বেড়ে গেলো এক বছর । সেটা আমি জানি, আমরা এখন আর কথা বলি বলে নয় বরং আমার মাথা একটা ভুতুড়ে আর্কাইভ, যেখানে এমন সব অপ্রয়োজনীয় মানুষের তথ্য জমে থাকে, যারা আমার মনের ভাঁজে খোঁচাখুঁচি শেষ করেই সঙ্গে সঙ্গে নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
এই মানুষটার সঙ্গে আমার বিচ্ছেদ হয় এমন সব কারণে যা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আমি তাকে পছন্দ করি, মিস করি, বা প্রায়ই ভাবি, তার চেয়ে ও বড়ো ব্যাপার আমি অনুভব করি, সে আমার খুব কাছের । অদ্ভুতভাবে খুব কাছাকাছি। সেই প্রাক্তনীর চেয়ে ও বেশি , যে মানুষের সামনে এসে কেমন অস্বস্তির মধ্যে পড়ে যেত , পরিচিত সেই আধা হাসি, যেন সে তার পুরোনো মানুষটিকে নয় , ভূত দেখছে, যার সাথে তার একসময় সব বিষয়েই দেনাপাওনা ছিল । কিংবা তাদের চেয়েও বেশি, যাদের সঙ্গে বেড়ে উঠেছি , আবার স্বাভাবিকভাবেই দূরে সরে গেছি, যাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল, ভেঙেছে পারস্পরিক বোঝাপড়ায়। ব্যাপারটা অদ্ভুত। এই মানুষটার সঙ্গে আমার শেষটা ভালো ছিল না । এতটাই এলোমেলো যে ঠিক কোথায় সব ভুল হলো, সেটাও চিহ্নিত করতে পারি না। তবু ও , আমার অনুভবে ওর সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক অন্য কারো সাথে তুলনা করা যায় না ।
এখন যখন ওকে অনুসরণ করার মতো কোনো সোশ্যাল মিডিয়া নেই, কোনো কমন বন্ধু নেই যাদের জিজ্ঞেস করা যায়, কোনো ছোটখাটো ইশারা নেই ধরার মতো, তখনই যেন আমি ওর আরও কাছে চলে আসি । মনে হয়, এই মুহূর্তে আমার জীবনে ওর চেয়ে কাছের কেউ নেই। এমন একজনকে ছেড়ে দেয়া, জীবন থেকে মুছে ফেলা, আর কখনও তার সাথে কথা না বলার সিদ্ধান্ত এই সবকিছু একসাথে এমনভাবে আমাকে বেঁধে জড়ায় , শব্দ বুনে বুনে সেটা বোঝানো আমার পক্ষে অসম্ভব প্রায়।
এই নীরবতার ভেতর আছে শুদ্ধতা, এই জন্য যে আমরা দুজনই একই স্মৃতিগুলো বহন করছি অলিখিত, অধরা একটা অদ্ভুত টাইম ক্যাপসুলের মতো, যেটা আমরা মাটির নিচে পুঁতে রেখেছি আর কখনও খুঁড়ব না বলে ঠিক করেছি। এটাই আসল অন্তরঙ্গতা। পরীক্ষামূলক নতুন করে কিছু শুরু করা নয়, নয় অনেক ছবির কোলাজ করে কোনো স্মৃতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢেলে দেয়া । শুধু ভাগ করা নীরবতা, ভীষণ ভারী ।
তবু, এটা যখন লিখছি ,মনে মনে ভাবছি , জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি কি আমাকে ভাবো?’ কিন্তু অল্প কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ভাবনাটা ঝেড়ে ফেলি, এই ভয়ে যদি ও কোনোভাবে টের পেয়ে যায় । যেন নীরবতার সেই অলিখিত শপথ আমি ভেঙে ফেলছি। আমি জানতে চাই না কারণ নীরবতাই অনেক সরব আজ । নীরবতা দিয়ে এমন এক বন্ধন আমরা তৈরী করেছি যা টেক্সট , ভয়েস নোট বা হাসির চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। জানার ব্যাপার নয় কিন্তু অনুভবের। হয়তো এটিই আমাদের বন্ধনের সবচেয়ে শুদ্ধ উপায়। আমি ওভাবেই ওটাকে রেখে দিতে চাই , নীরব কিন্তু অন্তরঙ্গ।
কখনও কখনও মনে হয়, একসময় নীরবতা আরো শান্ত ছিল, ছিল আরো নিরুপোদ্রব । আরো আগে সোশ্যাল মিডিয়া তখনো শুরু হয় নি , কারো আপডেট দেখবার সুযোগ ছিল না , না সুযোগ ছিল কারো একগাদা ছবি দেখা , বা এমনকি একজন আরেকজনের মেসেঞ্জার বা হোয়াটসআপ টেক্সট দেখেছে , সেই রসিদ অথবা ইনস্টাগ্রাম স্টোরি , যেগুলো বলে দেয় কেউ বেঁচে আছে, এমনকি সে আর আপনার জীবনে না থাকলেও । তখন নীরবতা মানে ছিল দুস্তর ব্যবধান । আর এখন সেটা স্ট্যাটিক , মনে হয় থেমে আছে । যে পিংটা আসার কথা ছিল, কিন্তু আসেনি। যে প্রোফাইলটা চাইলে দেখা যেত, কিন্তু দেখা হয় না। এই খবরটিও যে, সে কোথাও আছে, আপনার দেখার অগোচরে অন্য এক জীবন যাপন করছে , অথচ তার সম্পর্কে আর জানা হয় না । এই ব্যাপারটা মনের মধ্যে বেশ কষ্ট হয়ে বাজে । কারণ সে আপনার ফিড, ফোন, বা কক্ষপথ থেকে উধাও হলেও তার অস্তিত্ব তো আছে । তাকে শুধু দেখা যায় না , এই যা । আর এটা অস্বাভাবিক লাগে এই জেনে যে কেউ কোথাও শ্বাস নিচ্ছে, হাসছে, জন্মদিনের কেক খাচ্ছে আর আপনি কিছুই জানেন না। কোনো ছবি নয় , নয় কোনো স্ট্যাটাস । কোনো ট্যাগ করা লোকেশন নয় । শুধু নির্মম দূরত্ব , যেখানে একসময় কেউ একজন ছিল।
আমার কাছে তার কোনো ছবি নেই, নেই কোনো মেসেজ । এমনকি বিনা উদ্দেশ্যে খবর নেয়ার মতো কোনো কমন বন্ধুও নেই। তাতে নীরবতা হালকা হবার বদলে আরো ভারী হয়ে ওঠে। আমরা শুধু একে অপরকে হারাইনি। আমরা একে অপরকে মুছে ফেলেছি। কিন্তু ভূতটা রয়ে গেছে।
আমি বুঝতে পারি , আমি আবার কল্পনা করছি, ও এখন কেমন দেখতে, এখনও কি আগের মতো কথাগুলো বলে , আমার সাথে যেসব শব্দচয়ন , এখনও কি চুল খোঁপায় বেঁধে রান্না করতে গিয়ে ঘেমে যায়, কি লাজুকতা ঢাকতে এখনও রসিকতা করে। বানিয়ে বানিয়ে এমন অসংখ্য নারী তৈরি করি আমি, যাদের সঙ্গে আর কখনও কথা হবে না। সেটাই কি তবে সত্যিকারের অন্তরঙ্গতা। কল্পনার সেসব অনুভূতি । নীরব, অথচ হাস্যকর এক বিশ্বাস যে আপনি এখনও তাকে চেনেন, যদিও বাস্তবে আর চেনেন না।
এটার মধ্যে একধরণের উৎপীড়ণও আছে যেভাবে কেউ ঘরের সবচেয়ে পরিচিত মানুষ থেকে সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে যায়। যে কণ্ঠস্বরটা প্রতিদিন শুনতেন, তার গঠন, আকৃতি কিছুই আর মনে পড়ে না। আপনি জানতেন দুপুরে খাবারে ও ঠিক কী অর্ডার করবে , আর আজ জানেন না, সে এমনকি কোন শহরে থাকে। বিভ্রান্তিকর এক অবস্থা। এই ক্ষতিতে কোনো শোক নেই, নেই কোনো বিদায় । এটা শুধু ঘটে যায়। একদিন সে একান্তই কাছের । পরদিন সমাধির নীরবতা, যেটা আপনি বয়ে বেড়ান।
ও কি আমাকে ভাবে, এই ভাবনাটি একেবারে মন থেকে মুছে দিতে পারি না অথচ ব্যাপারটি সবচেয়ে খারাপ নিজের জন্য , আগবাড়িয়ে বলতেও কুন্ঠা হয় । নাকি এই নীরবতাকে শুধু আমিই পুজো করছি ? যদি সত্যিটা এমন হয় , ও আমার জন্মদিন ভুলে গেছে ? যদি আর কোনোদিন আমাদের কোনো মুহূর্ত ওর স্মৃতিতে ভেসে না উঠে , যেমনটা আমি হাতড়াই স্মৃতির ডালা খুলে মাঝে মাঝে নিজের অজান্তেই , একটা স্ক্র্যাচ পরা রেকর্ডের মতো? যদি ওর কাছে আমি শুধু যাত্রাপথের একটা ছোট্ট বিরতি অথবা শুধু একটা অধ্যায়, যেটা সে কেবল পাতা উল্টিয়ে চলে যায় অথচ কখনও আর পড়ে দেখে নি ?
এই এক অহংবোধ থেকে মুক্তি মেলে না , ভাবছেন , আপনার অনুপস্থিতি অন্যের জগতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে , যেমনটা হচ্ছে অন্যের অনুপস্থিতি আপনার জগতে । কিন্তু যখন আপনি নীরবতাকে তীর্থ বানিয়ে রেখেছেন , অথচ অন্য দিক থেকে তার ছিটেফোঁটাও নেই , আপনার মনে হবে, আপনার বিশ্বাসে প্রতারণা করেছে । আমার দরকার নেই , ও আমাকে মিস করুক। আমি শুধু বিশ্বাস করতে চাই যে, আমার রেখে যাওয়া জায়গাটা ওর চোখে পড়েছিল। এই ফাঁকা জায়গাটা চোখ এড়িয়ে যেতে পারে না, যে আমিও ছিলাম । আর হয়তো সেটাই আসল দুঃখ, সম্পর্কের শেষ নয়, বরং বিচ্ছেদের পরের সময়টার অসম দায় । এই আশংকা যে আপনি এমন একটা ভার বহন করছেন, যেটা ও আগেই নামিয়ে রেখেছে।
আমি ওকে ফিরে চাই না। চাই না কোনো কথা, পুনর্মিলন, বা চূড়ান্ত কোনো আলাপ। আমি অপেক্ষা করছি না । কিন্তু আমি বুঝতে চাই নীরবতা কেন এত যন্ত্রনায় ভরা মনে হয় । কেন যা কিছু কাছে নেই , সেটাই বারবার সমুখে চলে আসে । কেন নীরবতা প্রস্থানের চেয়েও জোরে বাজে ।
এটা বিরহ নয়। এটা বুঝতে পারা যে, দূরত্বে থেকেও, মুছে ফেলার পরেও, কিছু একটা থেকে যায়। ভালোবাসা নয়। শোক নয়। শুধু উপস্থিতি, যা এখন ঝুলে রয়েছে । সময় আর স্মৃতির তৈরি এক ভূত।
আমি মানুষটাকে ছেড়ে এসেছি । যেটা ছাড়াতে পারিনি , সেটা হলো ওর রেখে যাওয়া ছাপ। আমার জীবনে ওর জায়গাটা আর নেই । কিন্তু তার ছকটা রয়ে গেছে যেন আসবাব সরিয়ে ফেলা হয়েছে, তবুও কার্পেটে থেকে গেছে আসবাবের দাগ। না, আমি ওকে মিস করি না। ভাবিও না তেমন । কিন্তু কখনও কখনও, অনুভব থেকে সরাতে পারি না তার আকারটা । আর হয়তো এটাই কারণ নীরবতা এত অন্তরঙ্গ লাগে। কারণ সম্পর্ক আসলে কখনও পুরোপুরি চলে যায় না। হয়তো আর কখনও কথা না বলাই ছিল দুজনের মধ্যে সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বিষয় ।
অনেক কথা যাও যে ব’লে কোনো কথা না বলি।

