অন্টারিওজুড়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ও তুষারঝড়ে জনজীবনে বিপর্যয়

অন্টারিওজুড়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ও তুষারঝড়ে জনজীবনে বিপর্যয় - the Bengali Times
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে গ্রেটার টরন্টো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে

চলতি শীত মৌসুমে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলের মতো অন্টারিওতেও দেখা গেছে অস্বাভাবিক তীব্র শৈত্যপ্রবাহ, ভারী তুষারপাত এবং শক্তিশালী তুষারঝড়ের দাপট। বিশেষ করে অন্টারিও প্রদেশের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চল এই চরম আবহাওয়ার সবচেয়ে বেশি প্রভাবের মুখে পড়ে।

কানাডার সরকারি আবহাওয়া সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ কানাডার তথ্য অনুযায়ী, এ সময় তাপমাত্রা মৌসুমি স্বাভাবিকের তুলনায় গড়ে ১০ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কম ছিল। আবহাওয়াবিদরা একে “উল্লেখযোগ্য আর্টিক এয়ার মাস ইভেন্ট” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

- Advertisement -

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে গ্রেটার টরন্টো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তবে তীব্র বায়ুপ্রবাহের কারণে অনুভূত তাপমাত্রা (উইন্ডচিল) পৌঁছে যায় মাইনাস ২৮ ডিগ্রিতে। রাজধানী অটোয়া অঞ্চলে কিছু দিনে অনুভূত তাপমাত্রা মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়, যা উন্মুক্ত স্থানে কয়েক মিনিটের বেশি অবস্থান করাকেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্কটিক অঞ্চল থেকে নেমে আসা অত্যন্ত ঠান্ডা ও শুষ্ক বায়ুপ্রবাহ ধারাবাহিক নিম্নচাপের সঙ্গে মিলিত হয়ে এই তীব্র শৈত্য পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সংঘটিত শীতকালীন ঝড়ে দক্ষিণ অন্টারিওর বিস্তীর্ণ এলাকায় ২৫ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত তুষারপাত হয়। ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইতে থাকায় অনেক এলাকায় ‘ব্লিজার্ড কন্ডিশন’ তৈরি হয়। তুষার জমে ও বাতাসে উড়ে দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যে নেমে আসে, যা সড়ক যোগাযোগকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। প্রাদেশিক পুলিশ জানায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে মহাসড়কগুলোতে ৩০০টিরও বেশি সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা রিপোর্ট করা হয়। বহু যানবাহন তুষারে আটকে পড়ে এবং জরুরি উদ্ধারকারী দলকে রাতভর অভিযান চালাতে হয়।

অন্টারিওজুড়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ও তুষারঝড়ে জনজীবনে বিপর্যয় - the Bengali Times

চরম আবহাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিমান চলাচলেও। টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ এবং জানুয়ারির শুরুতে মিলিয়ে ৪০০টিরও বেশি ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয়। হাজার হাজার যাত্রীকে দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হয়। এছাড়া টরন্টোসহ আশপাশের অঞ্চলে গণপরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক বিলম্ব দেখা যায়। বহু বাস রুট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। রেল পরিষেবাতেও শিডিউল ব্যাহত হয়।

ভারী তুষারপাতের কারণে টরন্টো, পিল ও ইয়র্ক অঞ্চলের একাধিক স্কুল বোর্ড অন্তত ২ থেকে ৩ দিন সরাসরি ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অনলাইন ক্লাসের বিকল্প চালু করা হয় কিছু ক্ষেত্রে। তীব্র ঠান্ডার প্রভাবে গৃহহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় টরন্টো সিটি অতিরিক্ত উষ্ণতা কেন্দ্র চালু করে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ মানুষ এসব আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহার করেন বলে নগর কর্তৃপক্ষ জানায়।

শীতের তীব্রতায় গরম রাখার জন্য হিটার ব্যবহারের হার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। অন্টারিওর বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানায়, সর্বোচ্চ দিনে বিদ্যুতের ব্যবহার ২২ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করে যা মৌসুমের অন্যতম সর্বোচ্চ হিসেবে রেকর্ড হয়। যদিও গ্রিড স্থিতিশীল ছিল, তবু কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানায়।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এমন চরম শৈত্যপ্রবাহ ও ভারী তুষারঝড় ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়ার অস্থিরতা বাড়ছে কখনও অস্বাভাবিক উষ্ণতা, আবার কখনও তীব্র ঠান্ডা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্কটিক অঞ্চলের উষ্ণায়ন বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহের ধরণে পরিবর্তন আনছে, যার ফলেই মধ্য অক্ষাংশে চরম ঠান্ডার ঘটনা বাড়তে পারে। কর্তৃপক্ষ অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়ানো, পর্যাপ্ত শীত প্রতিরোধী পোশাক ব্যবহার এবং সরকারি আবহাওয়া সতর্কতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ডিসেম্বর ও জানুয়ারির শুরুতে এই তীব্র শীত ও তুষারঝড় অন্টারিওবাসীর জন্য চলতি মৌসুমের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, শীত এখনো শেষ হয়নি এ ধরনের আরও সিস্টেম আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ড্যানফোর্থ বাংলাটাউনের বাসিন্দা আমিরা হক বলেন, এই বছর সর্বোচ্চ পরিমাণ স্নো ক্লিনিং করেছি। গত ২৫ বছরে এতো স্নো দেখিনি।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles