
কোভিড-১৯ মহামারি শুধু সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়নি, বরং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলেছে। এরই একটি উদাহরণ হলো স্থুলতা বা ওবেসিটি, যা মহামারির আগেই কানাডায় এক ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছিল। তবে মহামারির সময় এই প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়ে আজ দেশের জন্য নতুন এক জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির নেতৃত্বে পরিচালিত নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, গত ১৫ বছরে প্রায় সাড়ে সাত লাখ কানাডিয়ানের স্বাস্থ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে—মহামারির বছরগুলোতে স্থুলতার হার অন্যান্য সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ হারে বেড়েছে।
গবেষণায় স্থুলতা নির্ধারণে বডি মাস ইনডেক্স (BMI) ব্যবহৃত হয়েছে। দেখা যায়, ২০০৯ সালে কানাডার প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ২৫ শতাংশ স্থুলতায় ভুগছিল। সময়ের ব্যবধানে এই হার ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে ২০২৩ সালে দাঁড়িয়েছে ৩৩ শতাংশে।
তবে বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, মহামারির বছরগুলোতে এই বৃদ্ধির গতি ছিল সবচেয়ে বেশি। শুধু তাই নয়, গুরুতর স্থুলতা—অর্থাৎ যাদের বিএমআই ৪০ বা তার বেশি তাদের হারও দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতা এমনকি বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
গবেষণার সহ-লেখক ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ আর্থার সুইটম্যান বলেন, “এটা নিছক পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি কঠোর স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা।”
তাঁর মতে, মহামারির সময় জীবনযাত্রায় যে পরিবর্তন এসেছে, সেটিই স্থুলতা বৃদ্ধির মূল কারণ। লকডাউন, দীর্ঘ সময় ঘরে বসে কাজ করা, জিম ও ক্রীড়া কেন্দ্র বন্ধ থাকা, বাইরে চলাফেরা ও সামাজিক মেলামেশায় সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়ে শারীরিক কার্যকলাপ নাটকীয়ভাবে কমে যায়। পাশাপাশি মানসিক চাপ, নিঃসঙ্গতা এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস মানুষের শরীরে বাড়তি ওজন চাপিয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও তরুণদের মধ্যে স্থুলতার হার তুলনামূলকভাবে বেশি বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মহামারিজনিত সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ এবং জীবনযাত্রার অস্থিরতা এই দুই শ্রেণিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে।
অন্যদিকে আশ্চর্যের বিষয় হলো, একই সময়ে অতিরিক্ত কম ওজনের (আন্ডারওয়েট) মানুষের সংখ্যাও কিছুটা বেড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সংকটকে আরও জটিল করেছে একদিকে অতিরিক্ত স্থুলতা, অন্যদিকে অতিরিক্ত কম ওজন, দুটিই দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
গবেষকদের মনে প্রশ্ন রয়ে গেছে স্থুলতার এই বৃদ্ধি কি সাময়িক, নাকি এটি এক দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে?
সুইটম্যান বলেন, “শুধু কেন বাড়ল সেটাই জানা যথেষ্ট নয়, বরং এখন এটি কমতে শুরু করেছে কি না সেটিও বুঝতে হবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, গবেষণার সময়কালে ওবেসিটি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওষুধ যেমন ওয়েগোভি (Wegovy) ততটা জনপ্রিয় হয়নি। বর্তমানে এই ধরনের ওষুধের ব্যবহার বাড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে স্থুলতার হার কিছুটা হলেও কমতে শুরু করেছে বলে ধারণা করা যায়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, স্থুলতা কানাডার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করবে। চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে, কর্মক্ষমতা কমবে, জীবনমানের অবনতি ঘটবে অর্থাৎ, মহামারির মতো তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকি কেটে গেলেও এর ছাপ দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নেবে।
কোভিড-১৯ মহামারি কানাডার জনস্বাস্থ্যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। স্থুলতা বৃদ্ধির প্রবণতা শুধু যে একটি পরিসংখ্যান তা নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এক কঠিন সতর্কবার্তা। এই সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্যনীতি, জীবনযাত্রার সংস্কার এবং সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
মহামারির ক্ষণস্থায়ী প্রভাবের বাইরে গিয়ে স্থুলতা কানাডার স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী মহামারিতে রূপ নিতে পারে।
This article was written by Sohely Ahmed Sweety as part of the LJI.

