কানাডায় জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক

কানাডায় জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক - the Bengali Times
কানাডার রাজনৈতিক অঙ্গনে জনসংখ্যা ও অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে উত্তপ্ত বিতর্ক শুরু হয়েছে

কানাডার রাজনৈতিক অঙ্গনে জনসংখ্যা ও অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে উত্তপ্ত বিতর্ক শুরু হয়েছে। কনজার্ভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভর সোমবার অটোয়ায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর দল ক্ষমতায় এলে আগামী দুই বছরে নতুন অভিবাসী আনার পরিবর্তে দেশের ভেতর থেকে মানুষকে অন্য দেশে পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেবেন। তাঁর ভাষায়, “আমাদের দেশে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির ওপর কঠোর সীমা আরোপ করতে হবে। আগামী বছর দু’য়েক কানাডায় লোকের আসার চেয়ে কানাডা ত্যাগকারী মানুষের সংখ্যাই বাড়াতে হবে।”

পয়লিয়েভরের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ নিলে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ কমবে। তবে কীভাবে তিনি কানাডাবাসীদের প্রবাসে যেতে উৎসাহিত করবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা তিনি উপস্থাপন করেননি। বরং বরাবরের মতোই তিনি আবারও সমালোচনা করেছেন জাস্টিন ট্রুডোর লিবারেল সরকারের অভিবাসন নীতি নিয়ে।

- Advertisement -

পয়লিয়েভরের অভিযোগ, ট্রুডো সরকারের আমলে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ নতুন অভিবাসী কানাডায় প্রবেশ করেছে। অথচ একই সময়ে নতুন আবাসন নির্মাণ হয়েছে মাত্র দুই লাখ, যা প্রবল বৈষম্য তৈরি করেছে। তাঁর দাবি, চাকরির বাজার প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে এবং বড় বড় প্রতিষ্ঠান কম মজুরির অস্থায়ী বিদেশি কর্মীদের ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভর করছে।

আবাসন নিয়ে উদ্বেগ কানাডায় নতুন নয়। কানাডা মর্টগেজ অ্যান্ড হাউজিং কর্পোরেশন (সিএমএইচসি)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে স্থিতি ফিরিয়ে আনতে প্রতিবছর অন্তত ৪ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার নতুন বাড়ি নির্মাণ করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে নির্মাণের হার সেই লক্ষ্যের অনেক নিচে। এর ফলে ভাড়া বেড়েছে লাগামছাড়া হারে, বাড়ির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে চাকরির বাজারও আশানুরূপ নয়। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, আগস্ট মাসে কানাডার সার্বিক বেকারত্বের হার ছিল ৬.৯ শতাংশ। যদিও এটি আগের মাসের তুলনায় সামান্য কম, তবু তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৪.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা মহামারির সময়ের চেয়েও বেশি। গত দুই দশকের মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ। এর ফলে যুবসমাজের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২২ সালে প্রায় ৫ লাখ নতুন অভিবাসী কানাডায় এসেছিলেন যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবাহ। যদিও পরবর্তী দুই বছরে এই সংখ্যা কিছুটা কমেছে, তবু কানাডা এখনো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অভিবাসী গ্রহণকারী দেশ।

অপরদিকে দেশত্যাগকারীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৬৫ জন কানাডা ত্যাগ করেছেন, যা গত দশকের প্রথমার্ধের তুলনায় অনেক বেশি। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দেশীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় মানুষকে প্রবাসের পথে ঠেলে দিচ্ছে।

পয়লিয়েভরের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক মহলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাঁদের মতে, অভিবাসন সীমিত করা হলে শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি তৈরি হবে। ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তি খাতে কর্মীর অভাব রয়েছে এই অবস্থায় নতুন মানুষ আসা বন্ধ হলে সংকট আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, সরকার যদি সরাসরি দেশত্যাগে উৎসাহিত করে, তবে তা আন্তর্জাতিক মহলে মানবাধিকার ইস্যুতে নতুন বিতর্ক তৈরি করবে। কারণ কোনো দেশই তার নাগরিককে জোর করে প্রবাসে পাঠানোর পদক্ষেপকে বৈধতা দেয় না।

সব মিলিয়ে কানাডায় অভিবাসন ও জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধি এখন আর কেবল রাজনৈতিক কৌশলের বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে জাতীয় অর্থনীতি, সমাজ ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামোর মূল বিতর্ক। আগামী নির্বাচনে এই ইস্যুই জনমতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

এখন দেখার বিষয়, ট্রুডো সরকার কীভাবে এই সমালোচনার জবাব দেয় এবং পয়লিয়েভরের বিতর্কিত প্রস্তাব কতটা সাধারণ মানুষের সমর্থন পায়। জনমতের পালাবদলই ঠিক করবে কানাডার অভিবাসন নীতি কোন পথে এগোবে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles