
ষোলতলার উপর থেকে রাতের শহর টা কেমন যেন অদ্ভুত দেখায়, কফি মগে চুমুক দিতে দিতে ভাবতে থাকে তৃণা। তার সাদা রঙের টপস টা হাওয়ায় হালকা উড়ছে। এমন সময় ঘরে প্রবেশ করলেন বাবা আহসান সাহেব এবং মা রুবি। তৃণা নিজেই মাকে বলে রেখেছিল বাবা যত রাতেই আসুক না কেন যেন তার সাথে দেখা করে। বাবাকে দেখে কোন রকম ভনিতা ছাড়াই তৃণা বলে উঠলো,
-বাবা আমি আশরাফকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করব না। যদি তোমার পছন্দ না হয় তাহলে হয় পালিয়ে যাব নয়তো এখান থেকে ঝাঁপ দেব, এখন সিদ্ধান্ত তোমার। আমি এখন ঘুমাবো, গুড নাইট।
নিজেদের ঘরে ফিরে এসে কথা বলছিলেন আহসান-রুবি দম্পতি।
-আরো লাই দাও মেয়েকে, বলেছিলাম এত বাড় বাড়তে দিও না । দেখছো তো কেমন বদরাগী, একরোখা আর জেদি হয়েছে।
-এসব বলে কি লাভ হবে রুবি? ছোটবেলা থেকেই সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নিয়েছে। চোখ খুলেই বহুতল বিল্ডিং, গাড়ি, এসি, বিলাসবহুল যা যা দরকার সব পেয়েছে। হয়তো আমাদের প্যারেন্টিং এ কোথাও ভুল ছিল।
-তুমি ওই ছেলেকে মেনে নেবে ?
-আগে সন্দেহ হওয়াতে খোঁজ নিয়েছিলাম। ছেলেটা মেধাবী, ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ কমপ্লিট করে এখন একটা বেশ ভালো কোম্পানিতে চাকরি করছে। দেখতে শুনতেও ঠিকঠাক। তবে আমার ভয় ছেলেটার শিকড়, মানুষ যতই চেষ্টা করুক শিকড়ের টান ছিঁড়তে পারে না, অবহেলা করতে পারে না সেখানে একটা অস্তিত্ব গেথেই থাকে। একেবারেই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা গ্রামের ছেলে ।
-তাহলে ?
-দেখা যাক, এখন ঘুমাও।
পরদিন নাস্তার টেবিলে সন্ধ্যায় আশরাফকে নিয়ে আসতে বললেন আহসান সাহেব।
কথামতো আশরাফ এলো, কথাবার্তা হলো, ডিনার হলো সবকিছু খুব সুন্দরভাবেই সম্পন্ন হলো।
আশরাফকে এগিয়ে দিয়ে এসেই তৃণার কৌতূহলী জিজ্ঞাসা
-তোমাদের কেমন লাগলো ওকে?
-কাছে এসে বসো মা, ছেলেটা ভালো, আমার পছন্দ হয়েছে কিন্তু মামনি তোমাকে একটা কথা বলি তুমি হয়তো ছেলের মেধা, বাচনভঙ্গি, পার্সোনালিটি দেখে মুগ্ধ হয়েছো এবং সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু জানো কি শিকড় ভিন্ন জিনিস
-মানে ?
-মানে হচ্ছে এখন সে শহরে বসবাস করছে ,এখানকার আদব-কায়দা শিখেছে। একটা মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেটা সে নিজেও জানে না কিন্তু সে বড় হয়েছে একটা অজপাড়া গাঁয়ে। ছোটবেলা থেকেই তার মনের মধ্যে গেঁথে আছে বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার, ভূত পেত্নি, তাবিজ কবজ, মেয়েদের প্রতি অবমূল্যায়ন সহ আরো নানান কিছু ।
-বাবা তুমি ভুল করছো, ও একেবারে সেরকম না ।
-আচ্ছা মা আর বলবো না । কিন্তু ও তো আমাদের বাড়িতে এলো, তোমার শখের বাগান ঘুরে দেখল, ছাদে গেল ,তোমার একুরিয়ামের মাছগুলোকে খাওয়ালো। তোমার এখন উচিত ওদের বাড়িতে যাওয়া, ওর পছন্দগুলো কেউ তো তোমার প্রাধান্য দিতে হবে।
– একেবারে ঠিক বলেছ বাবা, এদিকটা তো ভেবে দেখিনি।
-আরে কি বলছো! তোমার কি মাথা খারাপ? আমাদের বাড়িতে যাবে মানে! শোনো বিয়ের আগে মেয়েদের শ্বশুর বাড়িতে যেতে নেই বরং আমার বাবা-মা প্রস্তাব নিয়ে তোমার বাড়িতে যাবে, ফোনে একটানা কথাগুলো বলে চলছিল আশরাফ। কিন্তু তৃণার জেদের কাছে হার মানতে হলো।
যেদিন তৃণা ওদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছালো সেদিন তার নিজেকে চিড়িয়াখানার প্রাণীর মতো মনে হচ্ছিল। সবাই তাকে দেখার জন্য ভিড় জমিয়েছে। কি অদ্ভুত! আসলে কিন্তু বিষয়টা একেবারেই অদ্ভুত না এটা তৃণার কাছে অদ্ভুত কারণ তৃণা এমন একটা সোসাইটি থেকে উঠে এসেছে যেখানে সবাই খুব স্বাধীনচেতা , অন্যের ব্যাপারে কৌতুহল নেই, নিজেদের কাজ করার পরে আর কোন সময় থাকে না। কিন্তু এখানকার পরিস্থিতি ভিন্ন। আশরাফের মা দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে ঘরের ভিতর ঢুকিয়ে নিল।
-শোন মা, এইটা গ্রামের বাড়ি। এইখানে বাড়ির বউদের এইসব পোশাক চলবো না, তোমারে শাড়ি ব্লাউজ চুড়ি দিয়া যাইতেছি, পইরা বাইরে আসো ।
তৃণা অবাক হয়ে গেল। সে সুন্দর একটা ফুলহাতা সালোয়ার কামিজ পরে এসেছে , টপস জিন্স নয়, এমনকি হাইহিলও না। শাড়িই কেন পরতে হবে তাছাড়া সে শাড়ি পরতে জানে না । আশরাফ কে ফোন করে বলতেই সে বললো,
– এটা গ্রামের বাড়ি, তোমাকে বুঝতে হবে । মা যা বলছে তাই করো আর শোনো মাথায় ঘোমটা দিও। এর আগে আশরাফ এতটা ডমিনেট করে তার সাথে কথা বলে নি কোনদিন। তাকে শাড়ি পরতে সাহায্য করলো সাহায্য করলো আশরাফের ছোট বোন। তৃণা খুবই আনকম্ফোর্ট ফিল করছিল, শাড়ি থেকে কেমন একটা বাজে গন্ধ আসছে, মনে হচ্ছে বহুদিন ধরে আলমারিতে তুলে রাখা হয়েছিল । কেমন লাল রঙের একটা ক্যাটক্যাটা শাড়ি, তার নিজেকে কেমন গাবরের মতো লাগছে।
-ও মেয়ে তুমি চুল ছেড়ে রাখছো কেন, চুল বাধো। আমি আশরাফের ফুফু হই, আসো সালাম করো।
“শাড়ি পড়তে পারে না এইডা ক্যামন মাইয়া”
“এত বড় মাইয়া এহনো রানতে পারে না”
“শইল্লে দেহি এক ছটাগ মাংস নাই, না খাইয়া থাহে নি”
“বেসরম মাইয়া বিয়ার আগেই শ্বশুরবাড়ি চইলা আসছে” চারপাশ থেকে এরকম অপ্রীতিকর কথা কানে আসতে লাগলো তৃণার।
আশরাফ নিজেও শুনছে, সে কোন প্রকার প্রতিবাদ তো দূরের কথা বরং তৃণা যে জোর করে এসেছে এজন্য এগুলোকে সে মনে হয় উপভোগ করছে।
দুপুরে খেতে বসে প্রচন্ড ঝালে তৃণার চোখে পানি চলে এলো, এত স্পাইসি খাবার সে কখনো খায় না।
আশরাফ খুব তৃপ্তি করে খাচ্ছিল, আসলে ছোটবেলা থেকেই এরকম ভাবে খেয়ে তার অভ্যাস। তার দিকে তৃণা তাকাতে পারছিল না। কি বিচ্ছিরি ভাবে লুঙ্গি পড়ে খালি গায়ে খেতে বসেছে। তার ওপর যে জায়গায় তারা পাটি পেতে খেতে বসেছে তার থেকে একটু দূরেই লাঠির মধ্যে গোবর দিয়ে কেন যেন শুকাচ্ছে গন্ধে তৃণার গা গুলিয়ে উঠছে অথচ আশরাফ দিব্যি তৃপ্তি করে খেয়ে যাচ্ছে। খাওয়ার পর আশরাফ আবার পান খেলো অনেক জোড়াজুড়ির পরেও তৃণা পান খেতে অস্বীকৃতি জানালো। আশরাফের মা যে বিরক্ত তা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।
খাওয়া-দাওয়ার পরে প্রায় ঘন্টা দেড়েক আশরাফের কি কি খাবার পছন্দ, কেমন ভাবে থাকতে সে পছন্দ করে, তাদের বাড়ির কি কি নিয়ম কানুন, সকালে কয়টায় উঠতে হয়, বউদেরকে কেমন করে থাকতে হয়, মা চাচি ফুপু বোন সবাই মিলে তাকে বলতে লাগলো অথচ কেউ তার পছন্দ অপছন্দ কিছুই জানতে চাইলো না।
তারা বিকেল বিকেল রওনা দেয়, গাড়িতে বসে আশরাফকে তৃণা তার সেশন পর্ব সম্পর্কে জানায়। সে ভেবেছিল আশরাফ হয়তো বলবে” ওইসব নিয়ে তুমি ভেবোনা ”
তাকে অবাক করে দিয়ে আশরাফ বললো
-বড়রা তো এসব কথা বলবেই আর এগুলোই তো আমাদের সমাজের প্রচলিত নিয়ম । বিয়ের পর তুমি আমার সাথে থাকবে, পাশে থাকবে, আমার খাওয়া দাওয়া পছন্দ অপছন্দের প্রতি খেয়াল রাখবে, যত্ন করবে এটাই তো স্বাভাবিক।
-অবশ্যই আমি করবো কিন্তু তোমার কি কোন দায়িত্ব থাকবে না? আমার পছন্দ অপছন্দের বিষয়টা তুমি খেয়াল রাখবে না? কাজ শেষ করে আমি যখন বাড়ি ফিরবো তখন আমারও তো ইচ্ছে হতে পারে একটু বিশ্রাম নেবার।
-তোমার কাজ করার দরকার কি, তোমার বাবার অনেক টাকা আর আমি এমনিতেই মেয়েদের কাজ করা পছন্দ করি না। তাছাড়াও আমার পরিবার চাকরি করা বউ মেনে নেবে না । তুমি তো দেখলেই আমার মা চাচী ফুফু সবাই গৃহস্থালির কাজকর্ম করে।
-আমি কি ওনাদের মতো!
-না ,তুমি বিরাট রসগোল্লা , অসহ্য, প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে বলে আশরাফ। মা যে এত করে বলল তখন একটা পান মুখে নিতে কি এমন সমস্যা হয়েছিল তোমার? আর তাছাড়া আসার সময় তুমি মায়ের দেয়া শাড়িটা পরে এলে না কেন? কোন রান্নাবান্না জানো না , আমার মাথা নিচু করে দিয়েছো দুপুরে খাবার সময় সিনক্রিয়েট করলে যেন এরকম খাবার কখনো খাওনা। মানলাম তোমরা বিরাট বড়লোক তাই বলে সামান্য কার্টেসিবোধ থাকবে না, এই ধরনের অহংকারী আচরণ আর কখনো করবে না।
তৃণা চুপ করে থাকলো বাড়ি ফিরে তাকে একটা লম্বা শাওয়ার নিতে হবে।
ডিনারের টেবিলে তৃণা বাবাকে বলল,
-বাবা তোমার ওই ফোন বন্ধুর ছেলে কার কথা যেন বলছিলে তার সাথে মিট করতে চাই আর হ্যাঁ অবশ্যই ওর বাড়িতেও যেতে চাই, ওর পরিবারের সাথেও দেখা করব। বাবা-মা একে অপরের মুখ চাওয়াচাও করলেন তারা বুঝে গেছেন আজ সারাদিন মেয়ের উপর দিয়ে কি পরিমান ধকল গেছে।
রাতে তৃণা শুয়ে যাওয়ার পরে আহসান সাহেব এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।
তৃণা খানিকটা ডুকরে কেঁদে উঠলো,
– বাবা তুমি একেবারে ঠিক বলেছিলে , আশরাফ একেবারে ভালো ছেলে না।
– ভুল কথা বললে মা। ও অবশ্যই ভালো ছেলে কিন্তু তোমাকেও মনে রাখতে হবে ও কোন পরিবেশে বড় হয়েছে ওর শিকড় টা কোথায়? তুমি আর ও একই জগতে বসবাস করলেও বড় হওয়ার পরিবেশটা সম্পূর্ণ ভিন্ন তাই ওকে তোমার খারাপ মনে হচ্ছে ।একইভাবে আজ সারাদিন ওরও তোমাকে অনেক খারাপ মনে হয়েছে। আসলে বিয়ের মত পবিত্র বন্ধনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগে সমতাটা খুব প্রয়োজন। তুমিও এক সময় তোমার দাম্পত্য জীবনে নিশ্চয়ই সুখী হবে আর আশরাফও। যদি তোমরা নিজেদের লেভেল অনুযায়ী বিয়ে করো। ওর অনেক কিছুই তোমার কাছে অদ্ভুত বিরক্তিকর অসহ্য লেগেছে কারণ তুমি এগুলো দেখে অভ্যস্ত না ঠিক একইভাবে ওরও মনে হয়েছে একটা মেয়ে কিভাবে এত ইমপার্ফেক্ট হতে পারে! কারণ তোমাদের দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তৃণা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো, যেন সে বিষয়টা অনুধাবন করার চেষ্টা করছে।

