
তানিম নূর পরিচালিত “উৎসব” বাংলা সিনেমায় এক অনন্য পরীক্ষা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস। এই চলচ্চিত্রটি শুধু একটি গল্প নয়—এটি একটি দর্শন, যা দর্শককে কেবল আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি ও মননের মাধ্যমে অনুধাবনের আহ্বান জানায়। পরিচালক এখানে বার্টোল্ট ব্রেখটের বিখ্যাত “Alienation Theory” বা বিচ্ছিন্নতা তত্ত্বকে সুস্পষ্টভাবে কাজে লাগিয়েছেন, যার ফলে দর্শক ও গল্পের মধ্যে একটি সমালোচনামূলক দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্ব আবেগের অন্তরঙ্গতাকে ভাঙে এবং দর্শককে গল্প ও চরিত্র বিশ্লেষণে বাধ্য করে।
ব্রেখটের থিয়েটার দর্শনে মূল কথা ছিল—দর্শক যেন কেবল কাঁদে বা হাসে না, বরং চিন্তা করে, প্রশ্ন করে। তানিম নূর সেই নীতিই অনুসরণ করেছেন উৎসব–এ। সিনেমার চরিত্ররা, বিশেষত “ভূতেরা”, গল্পের বাইরে দাঁড়িয়ে আবার গল্পের ভেতর থেকেও কথা বলেন। তারা যেন সময় ও বাস্তবতার বাইরের কণ্ঠস্বর—যারা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের আয়নায় মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন মূল চরিত্রকে। এই ‘গোস্টদের’ ব্যবহার একদিকে দর্শকের চিন্তাভাবনায় বিঘ্ন ঘটায়, অন্যদিকে ঘটনাপ্রবাহের ব্যাখ্যাকারীর ভূমিকাও নেয়।
এই উপায়টি পুরোপুরি ব্রেখটীয়—যেখানে নাটকের চরিত্র তার নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে দর্শককে, নাটককে “অভিনয়” হিসেবে চিহ্নিত করে এবং এর ফলে দর্শকের আবেগ নয়, বোধ নির্মাণ হয়।
উৎসবের প্লট মূলত চার্লস ডিকেন্স-এর ক্লাসিক নভেলা A Christmas Carol-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। তবে তানিম নূর অত্যন্ত কৌশলে গল্পটিকে বাংলাদেশি মুসলিম সমাজের প্রেক্ষাপটে রূপান্তর করেছেন। মূল চরিত্রটি এখানে কোনও ইউরোপীয় ধনীর প্রতিচ্ছবি নয়; বরং এক আত্মকেন্দ্রিক, পুঁজিবাদী, মধ্যবিত্ত বাঙালি পুরুষ। আত্মসমালোচনা ও প্রাত্যহিক জীবনের নৈতিকতা-অনৈতিকতা এই গল্পে স্পষ্টভাবে স্থান পায়। ভূতেরা এখানে কেবল অতীতের ছায়া নয়—তারা সমাজ, সময় ও আত্মার গভীর অনুশোচনার ভাষ্যকার।
সিনেমায় আবেগের অতিরিক্ত মাত্রা বা “সিনেম্যাটিক রোমান্টিসিজম” নেই। বরং দৃশ্যগুলোর বিন্যাস, সংলাপের কাঠামো এবং দৃশ্যরীতি (mise-en-scène) সবই ব্রেখটীয় বিচ্ছিন্নতা বজায় রেখে নির্মিত। ক্যামেরা নির্বিচারে চরিত্রদের অনুসরণ না করে অনেক সময় দূর থেকে দেখে, স্থির থাকে, অথবা হঠাৎ আবেগহীনভাবে কাট করে দেয়। এতে করে দর্শক প্রতিটি মুহূর্তে ভাবতে বাধ্য হয়—এই চরিত্র কী করছে, কেন করছে, এবং তার সমাজতাত্ত্বিক তাৎপর্য কী?
এই দূরত্বই উৎসব-এর প্রাণ—এটি কোনও মেলোড্রামা নয়, এটি এক আত্মপ্রকাশ ও আত্মসমালোচনার রূপক, যা সিনেমাকে নাট্যরূপে পরিণত করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্ম একটি গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। উৎসব–এ ধর্মীয় অনুষঙ্গ রয়েছে, কিন্তু তা প্রচলিত ধার্মিকতার পুনরাবৃত্তি নয়—বরং একটি আত্মপ্রশ্নের আয়না। ধর্ম এখানে ভয় দেখায় না, বরং জবাব চায়। এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হয় মূল চরিত্র, আর সেই মুখোমুখি হওয়াটাই হয়ে ওঠে সিনেমার আত্মা।
সমসাময়িক মধ্যবিত্তের উৎসবপ্রেম, আত্মমগ্নতা, শ্রেণি বৈষম্য, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা—সবই চিত্রিত হয়েছে আত্মদর্শনের প্রেক্ষাপটে। এটা যেন শুধুই একজন মানুষের নয়, বরং সমগ্র সমাজের একটি “ghostly reflection”।
তানিম নূরের উৎসব বাংলা সিনেমায় এক অভিনব সংযোজন। এটি আবারো প্রমাণ করে যে দর্শন ও কল্পনার সমন্বয়ে একটি জনপ্রিয় মাধ্যমকে গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও আত্মিক পর্যালোচনার মাধ্যম বানানো সম্ভব। ব্রেখটের বিচ্ছিন্নতা তত্ত্বকে তিনি কেবল প্রয়োগ করেননি—তিনি তা আত্মস্থ করেছেন, পরিপূর্ণভাবে সিনেমার ভাষায় অনুবাদ করেছেন।
এ সিনেমা দেখার পর দর্শক হয়তো কাঁদবে না, হাসবেও না হয়তো। কিন্তু চিন্তা করবে, প্রশ্ন তুলবে, এবং হয়তো নিজের মধ্যেই এক নতুন আলো জ্বালাবে।
এটাই উৎসব-এর বিজয়।

