
বিকালবেলা বিত্ত’র ঘরে ঢুকে জমা হওয়া কফির মগগুলো আনতে গিয়ে দেখি সে ঘুমাচ্ছে। বিছানায় তার পাশেই খোলা প্যাকেটে পড়ে আছে বেশ খানিকটা পুটিন। সে পুটিনের শুধু মহা ভক্তই না, এডিক্টেড। স্কুল থেকে ফিরবার সময় প্রায়ই থ্রি ব্রাদার্স রেস্টুরেন্ট থেকে হালাল পুটিন নিয়ে আসে। তার মা বাসায় বানালে হাজারবার আই লাভ ইউ বলে কৃতজ্ঞতা জানাবে। সে শয়নে-স্বপনেও পুটিন খায়।
তার ঘুম ভাংতেই ডেকে বললাম, তোর বাকি পুতিন এনে ফ্রিজে রাখ। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সে ফ্রিজে তুলে রাখতেই বললাম- আব্বু, তোর পুতিন (আমি ‘পুতিন’ বলে ডাকি) কিন্তু আমরা খেয়ে ফেলবো!
– নো প্রব্লেম আব্বু, তোমরা খেলে আমি আরও খুশি হবো
– স্মার্ট এন্সার!
– লাভ ইউ আব্বু!
– লাভ ইউ ঠু!
তার পুটিন কেনার আরেকটা কারন হলো, বাঙালি খাবার যেন খেতে না হয়। তার সাফ কথা, ভাত খেতে হলে আমাদের মুখে তুলে খাইয়ে দিতে হবে।
রাত এগারোটায় দখিনা উপর থেকে ঘুমঘুম গলায় ডাক দিলো, বাবা!
– কী?
– আসো?
– ফিফটিন মিনিটস!
গার্বেজ বিন, রিসাইকল বিনের ময়লা বাইরে বাসার সামনে রাস্তার ধারে রেখে আসলাম। কালকে ময়লার ট্রাক সকাল সাতটার পরপরই চলে আসবে। অফিস যাবার আগে সময় পাবো না। তারপর চট করে বেইজমেন্টে গিয়ে লন্ড্রি ওয়াশার থেকে কাপড়গুলো বের করে মেলে দিতে থাকি।
মেয়েটাও নেমে এসে বিরক্ত আর অভিযোগের সুরে বলতে থাকে- বাবা, দুনিয়ার যাবতীয় কাজ তোমাকে এতো রাতে এখন করতে হবে? সারাদিন এগুলায় হাত দাওনি কেন? নাকি প্রতিদিন ইচ্ছা করে আমাকে কান্দানোর জন্য এগুলা করো বাবা?
তার চোখ দুটো ছলছল করছে।
আমি হেসে ফেলে বললাম, এইতো হয়ে গেছে
– আর কতক্ষণ?
– এই দশ মিনিট?
– আর কী কী করবা?
– তেমন কিছু না, বাথ্রুম সারবো, আর মিল্ক গরমে দিবো
– আর?
– আর এই কয়টা কাপ ধুয়ে রাখলেই হবে
– মা একটু আগে সব প্লেটস ধুয়ে গেল! আবার কোথা থেকে এইগুলা খুঁজে আনছো? এরপর?
– দরজা, জানালা, ওভেন বন্ধ আছে নাকি চেক করে, মিল্ক খেয়ে তোকে ঘুম পাড়াবো
– তারপর ঐ কাপ আবার ধুতে বসবা তাইতো!
আমার তেরো বছরের অভিমানী কিশোরী মেয়েটা বাবার কোল ছাড়া ঘুম আসে না। সে ঘুমিয়ে গেলে চুপি চুপি সাবধানে পালিয়ে আসি। সকালেও সে তার ট্যাবে এলার্ম দিয়ে রাখে বাবার কাছে আসার জন্য। দৌড়ে এসে আমার কোলে দশ-পনেরো মিনিট থাকবে। আমার গায়ে ঠ্যাং তুলে শক্ত করে এঁটে ধরে থাকবে দুই বছরের বাচ্চার মতো।
.
আমরা বড়োরা শুধু নিজেদের নিয়ে ভাবি; আর আহ্-উহ্ করে আফসোস করে বলি আত্মীয়-স্বজন, বাবা-মা, ভাই-বোন দেশে ফেলে এসে না জানি কতো কষ্টে আছি। ঘটনা যদিও সত্যি। তবে বিদেশে আসার আগে আমরা জীবনের বেশিরভাগ সময় তাদের সাথেই কাটিয়ে এসেছি। কিন্তু এরা? এখানে বাবা মা আর হাতে গোনা গুটিকয়েক আত্মীয় ছাড়া আর কে আছে তাদের? আমার ধারনা তাদের আশংকা, তাদের বাবা-মায়ের যদি কিছু হয়; তখন তারা কী করবে? কোথায় যাবে?
তারা দু:শ্চিন্তা করে কিন্তু প্রকাশ করে না।
.
আমরা মনে করি তারা কিছু পারে না। অথচ মেয়েটা স্কুলে ভলান্টিয়ার করে, খাবার স্ন্যাকস দেয় অন্য বাচ্চাদের। শুধু বাসায় এসে বাবা মায়ের কোলে চড়ে বসে থাকে বাচ্চাদের মতো। তাদের নিরাপত্তা, ভালবাসার জায়গা এই একটাই। এইটুকু আবদার যায়েজ।
.
মেয়েকে ঘুম পাড়াতে গেলাম। একটু পরেই বাবা দিবস শুরু হবে। দখিনা ঘুম জড়ানো গলায় বলল- বাবা, সরি তোমার গিফট এখন দিতে পারবো না
– সকালে দিস, না হয় আমি কাজ থেকে ফিরলে দিস?
– সিওর তুমি মাইন্ড করবা না?
– ধুর বোকা
– গিফটগুলা কম্প্লিট করতে পারিনি। বেশি রাত জাগলে তুমি রাগ করবা তাই
– কোন সমস্যা না
– বাবা, আই লাভ ইউ!
– আমিও মা!
অফিস থেকে ফিরে দেখি সে নিজ হাতে থ্রি ডি কার্ড বানিয়েছে। তার ভাই আর মাকে সাথে নিয়ে সুন্দর কথা লিখেছে ‘বাবা’ নিয়ে। কার্ড খুললেই কাগজের থ্রিডি বাড়ি, গাড়ি, ফুল বেরিয়ে আসছে। আর চমৎকার একটা টি-শার্ট। সাথে বেশ কিছু চকলেট।
সেগুলোর বেশিরভাগ অবশ্য সে নিজে খেয়েছে..
সে এতো বেশি আমাকে আই লাভ ইউ বলে যে, বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম- তোর এতোবার লাভ ইউ বলার কী দরকার? একবার বললেই তো হয়?
বিকালে বাড়ির পেছনে সবজি বাগানে কাজ করছিলাম। ফাজিলটা দোতলার জানালা খুলে টকটক আওয়াজ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। আমি উপরে তাকাতেই সে চিৎকার করে স্পষ্ট বাংলায় বলল, “বাবা, আমি তোমাকে ভালোবাসি!” সবকটা দাঁত বের করে হাসতে থাকে।
কিছুক্ষণ পর আবার টকটক আওয়াজ..
অটোয়া, কানাডা

